চিকিৎসক-স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষায় আরও দায়িত্বশীল হতে হবে

বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ২০ লাখ ছাড়িয়েছে বুধবার। যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটির তথ্য বলছে ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত ১৮৫টি দেশ ও অঞ্চলে করোনা সংক্রমিত হয়েছে। এতে বিশ্বজুড়ে মারা গেছে ১ লাখ ২৮ হাজার ৭১ জন। তবে বিগত কয়েক দিনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নতুন সংক্রমণের হার খানিকটা কমে এলেও জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষকরা বলছেন বাংলাদেশ এখন করোনা সংক্রমণ আরও বিস্তারের ঝুঁকিতে আছে। সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান-আইইডিসিআরের তথ্যানুযায়ী বুধবার পর্যন্ত দেশে করোনাভাইরাস শনাক্ত হওয়া ব্যক্তির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২৩১ জন। আর বুধবার পর্যন্ত দেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ৫০ জন। সুস্থ হয়েছেন ৪৯ জন। করোনায় আক্রান্ত দেশের প্রথম চিকিৎসকও মারা যান বুধবার। তিনি সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজের সহকারী অধ্যাপক ডা. মঈন উদ্দিন। অন্যদিকে, দেশে চিকিৎসকদের মধ্যে প্রথম করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলেন ডেল্টা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সিনিয়র ইমার্জেন্সি মেডিকেল অফিসার ডা. আবু ফয়সাল মো. জাহাঙ্গীর আলম। ৩৫ বছর বয়সী এই চিকিৎসক এরই মধ্যে সুস্থ হয়ে উঠেছেন। করোনায় আক্রান্ত হওয়া ও সেরে ওঠার অভিজ্ঞতা নিয়ে দেশ রূপান্তরের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন দেশ রূপান্তরের সম্পাদকীয় বিভাগের আহমেদ মুনীরুদ্দিন

দেশ রূপান্তর : আমরা জানি আপনি বাংলাদেশের চিকিৎসকদের মধ্যে প্রথম করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হন এবং চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে ওঠেন। প্রথমে কীভাবে বুঝলেন যে আপনি সংক্রামিত? তারপর কী হলো? আপনার অভিজ্ঞতাটা শুনতে চাই।

আবু ফয়সাল মো. জাহাঙ্গীর আলম : আমি ডেল্টা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দায়িত্ব পালনকালে একজন রোগীকে চিকিৎসা দিচ্ছিলাম। তার উপসর্গ দেখে মনে হচ্ছিল তিনি করোনায় আক্রান্ত হতে পারেন। ১৯ মার্চ বিকেলে তার নমুনা সংগ্রহ করে আমরা আইইডিসিআরে পাঠাই। ২০ মার্চ বিকেলে আমরা ফোনে জানতে পারি তার করোনা শনাক্ত হয়েছে। সেদিন সকাল থেকেই আমার হালকা জ্বর ছিল। বিকেলে খবরটা শুনে আমি ভয় পেয়ে যাই, কারণ ওই রোগীকে আমি দেখেছিলাম। ২১ তারিখ সকালে আমি আইইডিসিআরের একজনকে বিষয়টি জানিয়ে আমার উদ্বেগের কথা বললে তিনি আমাকে দ্রুত নমুনা পরীক্ষা করাতে বলেন। সেদিন সকালেই আমি নমুনা পরীক্ষা করতে দিই এবং বিকেলেই জানতে পারি আমিও করোনায় সংক্রমিত হয়েছি। আমি শুরুতে বাসায় একটা আলাদা ঘরে পুরোপুরি আইসোলেশনে থাকা শুরু করি। পরদিন সন্ধ্যার দিকে আমার শ্বাসকষ্ট শুরু হলে আমি ভয় পেয়ে যাই। কারণ বাসায় থাকলে আমি শ্বাসকষ্ট দূর করতে অক্সিজেন ও অন্যান্য সহায়তা পাব না। আইইডিসিআর এ অবস্থায় আমাকে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দেয়।

দেশ রূপান্তর : আপনি কোন হাসপাতালে ভর্তি হলেন? প্রক্রিয়াটা কী ছিল? ভর্তি হতে গিয়ে কি কোনো সমস্যায় পড়েছিলেন? সেই সময় আপনার অভিজ্ঞতায় করোনা চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা কেমন দেখেছিলেন? আপনার পর্যবেক্ষণগুলো বলুন।

আবু ফয়সাল মো. জাহাঙ্গীর আলম : ২২ মার্চ রাতে আমি কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হই। তারাই নিজেদের অ্যাম্বুলেন্সে করে আমাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। তবে হ্যাঁ, এখানে একটা কথা বলতে চাই। ততদিনে সরকারিভাবে ছয়টি হাসপাতালকে করোনা চিকিৎসার জন্য প্রস্তুত বলে ঘোষণা করা হলেও আর কোনো হাসপাতাল কিন্তু আমাকে ভর্তি নিতে চায়নি। যেমন কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে আমি যোগাযোগ করেছি, কিন্তু তারা প্রস্তুত ছিল না। বাকিদেরও একই অবস্থা ছিল। কেন ভর্তি নিতে চায়নি সে বিষয়ে আমি যতটা বুঝেছি, তাদের আসলে কোনো প্রস্তুতি ছিল না। কুয়েত মৈত্রী হাসপাতাল আমাকে ভর্তি করে।

দেশ রূপান্তর : আমরা জানি করোনার চিকিৎসায় বিশেষায়িত কোনো ওষুধ এখনো আমাদের হাতে নেই। কোনো প্রতিষেধকও এখনো আবিষ্কার হয়নি। আপনার ক্ষেত্রে করোনার কী কী উপসর্গ ছিল? আপনার চিকিৎসা কীভাবে হলো? আপনি নিজে চিকিৎসক, তাই যখন করোনায় আক্রান্ত হয়ে নিজেই রোগী হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন তখনকার অভিজ্ঞতা বলুন।

আবু ফয়সাল মো. জাহাঙ্গীর আলম : প্রথমত শ্বাসকষ্ট দূর করার জন্য আমার তখন অক্সিজেন প্রয়োজন ছিল। হাসপাতালে আমাকে অক্সিজেন দেওয়া হয় এবং নেবুলাইজ করা হয়। প্রথম রাতটা ওভাবেই পার হয়। এছাড়া আমাকে সে সময় দুটো ড্রাগস বা ওষুধ দেওয়া হয়। একটা হলো এজিথ্রোমাইসিন, আরেকটা হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন। দ্বিতীয়টা মূলত ম্যালেরিয়ার চিকিৎসার জন্য পরিচিত ওষুধ। এছাড়া আমার সর্দি-কাশি-ঠাণ্ডার জন্য আরও কিছু ওষুধ দেওয়া হয়। পাশাপাশি অক্সিজেন ও নেবুলাইজ করা। মূলত এভাবেই আমার চিকিৎসা হয়েছে। এখনো বাকিদের ক্ষেত্রে এভাবেই চিকিৎসা হচ্ছে বলেই জানি। আর উপসর্গের কথা যদি বলি, আমার বেশ জ্বর ও গায়ে ব্যথা ছিল। সঙ্গে ডায়রিয়া ছিল। সর্দি-কাশিও ছিল। অর্থাৎ করোনার প্রায় সব উপসর্গই আমার ছিল।

দেশ রূপান্তর : আমরা শুনেছি করোনায় আক্রান্ত হয়ে যারা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন, এমন ১০ থেকে ১৫ ভাগকেই আইসিইউতে নেওয়ার এবং ভেন্টিলেটরের সহায়তা প্রয়োজন হয়। আপনার কি এমন হয়েছিল? আপনি কি মনোবল হারিয়ে ফেলেছিলেন?

আবু ফয়সাল মো. জাহাঙ্গীর আলম : না। আমার যেহেতু তীব্র শ্বাসকষ্টের সমস্যা হয়নি, তাই আমার ভেন্টিলেটর বা কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাসের প্রয়োজন হয়নি। আসলে যতটা বুঝেছি, করোনার ক্ষেত্রে রোগীর শারীরিক অবস্থা, তার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ইত্যাদির একটা ভূমিকা আছে। কেউ যদি আগে থেকেই অন্যান্য রোগে ভোগেন, শরীর দুর্বল থাকে, তাদের বেশি সমস্যা হয়। আমার বয়স যেহেতু পঁয়ত্রিশ এবং আমার তেমন কোনো জটিল রোগ নেই, তাই শারীরিক সক্ষমতা আমার সহায়ক হয়েছে। আর প্রথমে কিছুটা ভয় পেলেও হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর আমার আর ভয় লাগেনি। মনোবল না হারানোটা জরুরি। কেননা, যেকোনো রোগেই মনোবল হারিয়ে ফেললে রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটতে পারে। আমার তেমন কিছু হয়নি।

দেশ রূপান্তর : আপনাকে মোট কতদিন হাসপাতালে থাকতে হলো? প্রথম শনাক্ত হওয়ার পর আপনার আর কয়বার করোনা পরীক্ষা করা হয়?

আবু ফয়সাল মো. জাহাঙ্গীর আলম : আমাকে মোট ২১ দিন হাসপাতালে থাকতে হয়েছিল। ২২ মার্চ হাসপাতালে ভর্তির পর চিকিৎসারত অবস্থায় গত ৮ এপ্রিল ও ১০ এপ্রিল আবারও দুই দফায় আমার করোনা পরীক্ষা করা হয়। ওই দুটো পরীক্ষাতেই করোনা নেগেটিভ আসে। ফলে ১২ এপ্রিল আমাকে হাসপাতাল থেকে রিলিজ দেওয়া হয়। রিলিজের ৭ দিন পর অর্থাৎ ১৯ এপ্রিল আবার আমার পরীক্ষা করার কথা। কোনোভাবে পুনরায় সংক্রমণ হয়েছে কি না সেটা নিশ্চিত হওয়ার জন্য।

দেশ রূপান্তর : এবার করোনা মোকাবিলায় চিকিৎসকদের প্রসঙ্গে আসি। বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারীর এই মহাদুর্যোগে চিকিৎসক-নার্স-স্বাস্থ্যকর্মীরাই এখন সম্মুখ সমরের যোদ্ধা। চিকিৎসকদের মহান সেবাব্রতের ভূমিকার বিষয়টি এবার যেভাবে সামনে এলো, এর আগে মনে হয় সমাজে এটা এত জোরালোভাবে আর দেখা যায়নি। কিন্তু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, আক্রান্তদের চিকিৎসা দিতে গিয়ে এবং সামাজিক সংক্রমণে এ পর্যন্ত বিশ্বে প্রায় ২৩ হাজার স্বাস্থ্যকর্মী করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। বেশিরভাগ সুস্থ হলেও এদের মধ্যে এখন পর্যন্ত মারা গেছেন প্রায় পৌনে ছয়শ স্বাস্থ্যকর্মী। চিকিৎসকদের এই আত্মত্যাগকে কীভাবে দেখছেন?

আবু ফয়সাল মো. জাহাঙ্গীর আলম : প্রথমত, একজন চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকর্মী হিসেবে আমার দায়িত্ব রোগীর চিকিৎসা দেওয়া। সেটা যে পরিস্থিতিতেই হোক, যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ কিংবা মহামারী। সারা দুনিয়ার চিকিৎসকরাই এই দায়িত্ববোধ থেকেই কাজ করছেন। দায়িত্ব ছেড়ে আসার তো কোনো সুযোগ নেই। আপনি একজন সাংবাদিক। আপনারাও ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন। আমার সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন মানুষকে আমার অভিজ্ঞতা জানানোর জন্য। মানুষকে জানানোটা, সতর্ক করাটা আপনার কাজ। আমি মনে করি, চিকিৎসকরাও যার যার অবস্থান থেকে কাজ করছেন। আর বাকিটা আল্লাহর ইচ্ছা। আগে বা পরে সবাইকেই একদিন মরতে হবে। আমি ভাগ্যবান যে বেঁচে গেছি। বিভিন্ন দেশে অনেক চিকিৎসক মারা যাচ্ছেন। এখন আমাদের দেশেও আমাদের একজন সহকর্মী মারা গেলেন।

দেশ রূপান্তর : বাংলাদেশে চিকিৎসক, নার্স, সিভিল সার্জন ও উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তাসহ এ পর্যন্ত প্রায় অর্ধশত স্বাস্থ্যকর্মী করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। এক পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে আমাদের দেশে আক্রান্তদের মধ্যে শতকরা ১০ জনই স্বাস্থ্যকর্মী। এর মধ্যে বুধবার সকালে মারা গেছেন সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. মঈন উদ্দিন। বাংলাদেশে চিকিৎসক-নার্স-স্বাস্থ্যকর্মীদের ঝুঁকির বিষয়টাকে কীভাবে দেখছেন?

আবু ফয়সাল মো. জাহাঙ্গীর আলম : প্রথমত, আমি মনে করি চিকিৎসক-স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষায় আরও দায়িত্বশীল হতে হবে। সরকারি-বেসরকারি সব হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষকেও আরও দায়িত্বশীল হতে হবে। কেননা, শুরুর দিকে আমি যেটা দেখেছি, আমাদের কারোই আসলে কোনো প্রস্তুতি ছিল না। আমরা নিজের অজান্তেই আক্রান্ত হচ্ছি। আমার ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে। তখন চিকিৎসক-নার্সদের কারোই পিপিই বা অন্যান্য সুরক্ষার ব্যবস্থা ছিল না। এখন সেসব আছে বটে। কিন্তু আরও সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। আমার মনে হয়, যারা করোনা চিকিৎসা দিচ্ছেন এবং যারা সাধারণ রোগীদের সেবা দিচ্ছেন সবার জন্যই এই পরিস্থিতিতে বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। কেননা, অনেকে আসলে জানেনও না যে কীভাবে পিপিই খুলতে হয়, পরতে হয় বা ব্যবহারের পর সেটা কীভাবে জীবাণুমুক্ত করতে হয়।

আরেকটা বিষয় বলব, জনগণের কাছে অনুরোধ আপনারা কেউ রোগের উপসর্গ গোপন করে চিকিৎসা নিতে যাবেন না। এতে রোগী এবং চিকিৎসক-স্বাস্থ্যকর্মী উভয়পক্ষই বিপদগ্রস্ত হবে। এক্ষেত্রেও খুবই জরুরি হলো দ্রুত করোনা পরীক্ষার ব্যবস্থা করা। কোনো রোগী হাসপাতালে এলে তার সমস্যা শুনে, উপসর্গ দেখে প্রয়োজনে দ্রুত করোনা পরীক্ষা করা গেলে ওই রোগী যেমন উপকৃত হবেন; তেমনি হাসপাতালের চিকিৎসক-নার্স-স্বাস্থ্যকর্মীরাও নিরাপদ থাকবেন। আমি আশা করব, শিগগিরই দেশে দ্রুততার সঙ্গে বেশিসংখ্যক করোনা পরীক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা যাবে।

দেশ রূপান্তর : আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

আবু ফয়সাল মো. জাহাঙ্গীর আলম : দেশ রূপান্তরকেও অনেক ধন্যবাদ।