রাজধানীর হাতিরপুল কাঁচাবাজার। জটলা করে ক্রেতাদের কেউ কিনছেন মাছ, আবার কেউবা কিনছেন শাক-সবজি ও ফলমূল। ক্রেতাদের বেশিরভাগের মুখে মাস্ক থাকলেও অধিকাংশ বিক্রেতারই নেই করোনাভাইরাস থেকে রক্ষা পাওয়ার মতো কোনো সুরক্ষা সরঞ্জাম। গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে অনেকটা গাদাগাদি করেই চলছে কেনাবেচা। এরইমধ্যে পাশ দিয়ে যাওয়া পুলিশের একটি পিক-আপ ভ্যান থেকে ভেসে আসে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখাসহ নানা সতর্কবার্তা। তবে এতে যেন কর্ণপাতই করলেন না কোনো ক্রেতা-বিক্রেতা। গতকাল শনিবার দুপুরের চিত্র এটি। আর শুধুমাত্র হাতিরপুল কাঁচাবাজারই নয়, এমন অবস্থা রাজধানীর প্রায় সব কাঁচাবাজারেরই। এসব বাজারে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত মানুষের জটলা লেগেই থাকছে। এদিকে করোনাভাইরাসের প্রার্দুভাবের প্রেক্ষাপটে সরকারের পক্ষ থেকে ফাঁকা মাঠে কাঁচাবাজার স্থানান্তরের নির্দেশনা দেওয়া হলেও তা বাস্তবায়নে খুব একটা মাথাব্যথা নেই ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের। কাঁচাবাজারগুলোতে ক্রেতা-বিক্রেতাদের মধ্যে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত খুব একটা সচেতনামূলক ব্যবস্থাও নেওয়া হয়নি। এ পরিস্থিতিতে এসব কাঁচাবাজার ব্যবস্থাপনা কমিটির পক্ষ থেকে ব্যবসায়ীদের নামমাত্র কিছু নির্দেশনা দিয়েই দায় সারা হয়েছে। ডিএনসিসি কর্মকর্তারা জানান, তাদের আওতাধীন মোট ১৫টি কাঁচাবাজার আছে। এর বাইরে অলিগলিতে রয়েছে আরও একশ’র মতো। এরমধ্যে কারওয়ান বাজার, মোহাম্মদপুর, মহাখালী, গুলশান-১, ২, বনানী এবং মিরপুর ১, ১১ অন্যতম। এসব বাজারে প্রতিদিন শত শত মানুষ বাজার করতে আসেন। ফাঁকা জায়গা না পাওয়ায় বাজারগুলোতে সরু গলিতে দাঁড়িয়ে μেতারা কেনাকাটার কাজ সারেন।
মিরপুর ৬ নম্বর সেকশনের বাসিন্দা আব্দুল হালিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাসা থেকে মাস্ক ও হ্যান্ড স্যানিটাইজার নিয়ে বাজারে যাই। কিন্তু সেখানে গিয়ে পরিবেশ দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়ি। মানুষের গা ঘেঁষে না দাঁড়িয়ে আসলে বাজার করার মতো কোনো পরিবেশ নেই। তাই বাধ্য হয়ে ভিড়ের মধ্যে ঢুকেই বাজার করি। এতে সবসময় মনের মধ্যে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার শঙ্কা কাজ করতে থাকে।’
প্রায় একইরকম কথা বলেন ইস্কাটন স্টাফ কোয়ার্টারের বাসিন্দা মো. সিরাজ উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘বাসায় বাজার শেষ হয়ে যাওয়ায় গত বৃহস্পতিবার সকালে কারওয়ান বাজারে গিয়েছিলাম। সেখানে গিয়ে এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা হলো। বাজারের দৃশ্য দেখে মনে হলো না আমাদের শহরে কোনো লকডাউন আছে। মানুষের ভিড়ে একশ’ গজ জায়গা পার হতে সময় লাগে ১০ মিনিট। এরই মধ্যে সামান্য কিছু কেনাকাটা করে দ্রুত সরে এসেছি। বাজার ব্যবস্থাপনায় এখনই উদ্যোগ না নিলে কারওয়ান বাজার থেকেই দৈনিক শত শত মানুষের মধ্যে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়বে।’
সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী কাঁচাবাজার ফাঁকা জায়গায় সরিয়ে নেওয়ার অগ্রগতির বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএনসিসির প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা আব্দুল হামিদ মিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে বাজার কমিটির নেতাদের বলা হয়েছে, তারা সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার ব্যবস্থা করবে। বনানী কাঁচাবাজার সরিয়ে বনানী মাঠে নেওয়া হয়েছে। তবে অন্য বাজারগুলো জায়গার অভাবে সরানো সম্ভব হচ্ছে না। আর এই খাতে কোনো ফান্ডও নেই। এছাড়া আমাদের ৬ জন বাজার সুপারভাইজারের পদ থাকলেও তার সবগুলোই শূন্য। তবে আমাদের অন্য পদের লোক দিয়ে কাজ করছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘সমস্যা হচ্ছে কারওয়ান বাজার নিয়ে। এখানে জায়গা নেই। এরপরও আমরা ফার্মগেটের রাজধানী উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে স্থানান্তর করার উদ্যোগ নিয়েছিলাম। কিন্তু ব্যবসায়ীরা এ প্রস্তাবে রাজি হয় না।’
করোনাভাইরাসের প্রার্দুভাবের কারণে ডিএসসিসির মালিকানাধীন ৬৫টি মার্কেট বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সিটি করপোরেশন মার্কেট ফেডারেশন। তবে এ ফেডারেশনের আওতাধীন ১৩টি কাঁচাবাজার খোলা আছে। এরমধ্যে যেসব কাঁচাবাজার খোলা রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে সেখানে সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কয়েকটি বাজারে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে দাগ দেওয়া হলেও তা নিজেদের উদ্যোগে। সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের জীবাণুনাশকও ছিটানো হয়নি।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ডিএসসিসির প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা মো. ইউসুফ আলী সরদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ডিএসসিসির কাঁচাবাজারের মধ্যে নিউমার্কেট, বনলতা, খিলগাঁও রেলওয়ে কাঁচাবাজার, ঠাঁটারীবাজার কাঁচাবাজার ও নয়াবাজার অন্যতম। এসব কাঁচাবাজারের ব্যবসায়ী সমিতির পক্ষ থেকে নানা উদ্যোগ নিয়েছে। এজন্য করপোরেশন থেকে কোনো ধরনের অর্থ বরাদ্দ বা সহযোগিতা করতে হয়নি। এছাড়া স্থানীয় সরকার বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী ফাঁকা মাঠে বাজার স্থানান্তরের কাজটিও করছেন আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট।’