এই করোনাকাল অনেক অবহেলার শাস্তি দিচ্ছে আমাদের। স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রতি অবহেলা, ব্যবসাকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে কৃষি, শিক্ষা, গবেষণাকে অবহেলা করা, জয়লাভকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে যুক্তিকে অবহেলা করা, শক্তিশালী দুর্বৃত্তকে তোয়াজ করতে গিয়ে যুক্তিবাদীর বিনয়কে অবহেলা করা, তেলবাজকে গুরুত্ব দিয়ে নিষ্ঠাবানকে অবহেলা করা, মিথ্যা হলেও প্রশংসাকে গুরুত্ব দিয়ে সত্য কথাকে অবহেলা করা আর মুনাফাকে প্রধান করে মানুষকে অবহেলা করার ফল আজ আমরা প্রত্যক্ষ করছি। অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে প্রধান করে দেখে গুরুত্বহীন করে তোলা হয়েছিল নৈতিক মানকে, ফলে আজ যখন অর্থনৈতিক ধসের আশঙ্কায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে সেই সময় নৈতিক অবক্ষয়ের চূড়ান্ত অবনমন দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। তা না হলে ত্রাণের সামগ্রী চুরির খবরের পাশাপাশি করোনা মোকাবিলার লড়াইয়ে সম্মুখ সারির যোদ্ধা ডাক্তারদের জন্য সরবরাহ করা নিম্নমানের মাস্ক নিয়েও খবর দেখতে হয় আমাদের? এর আগে ভেজাল স্যানিটাইজার তৈরির খবর প্রকাশিত হয়েছিল। করোনায় কোনো মানুষ আক্রান্ত হলে যদি কোয়ারেন্টাইন না করা হয় তাহলে গড়ে সে নাকি ৪০৬ জনকে সংক্রমিত করতে পারে এটা জেনেও নিম্নমানের সুরক্ষা সামগ্রী দিয়ে প্রতারণা করতে পারে কোন মানসিকতায়? মুনাফার কাছে কি মনুষ্যত্ব হেরে যাবে? সারা পৃথিবী আজ যখন এক ভয়ংকর পরিস্থিতির মুখে দাঁড়িয়ে আছে তখন নতুন করে দেখতে হবে পুরনো অবহেলার চিত্র আর সতর্ক হতে হবে যেন বর্তমানে ও ভবিষ্যতে অবহেলা আর না হয়।
কানে শোনার চেয়ে চোখে দেখা অনেক গুরুত্বপূর্ণ সাধারণ মানুষের কাছে। কিন্তু মানুষ তার নিজের দুই চোখে আর কতটুকু দেখতে পারে? মানুষের দৃষ্টিসীমা কতদূর ছাড়িয়ে যেতে পারে? সে কারণেই চোখের দেখার চাইতে কানে শোনার গুরুত্ব বেড়ে গেল অনেক। আবার কানে যা শোনা হয় তার সব যে সঠিক হবে তারই বা বিশ্বাস কি! যেমন গোপাল ভাঁড়কে রাজা কৃষ্ণচন্দ্র জিজ্ঞেস করেছিলেন, বলো তো গোপাল, সত্য মিথ্যার দূরত্ব কত? গোপালের চটজলদি উত্তর, এ আর এমন কি, চোখ ও কানের মধ্যে যে দূরত্ব, সত্য ও মিথ্যার মধ্যেও ততখানি দূরত্ব। রাজা বললেন, বুঝিয়ে বলো? গোপাল বলল, মহারাজ, যা কানে শুনবেন তা যদি চাক্ষুষ প্রমাণ পান তাহলে তা সত্যি। আর যদি চাক্ষুষ প্রমাণ পাওয়া না যায় তাহলে তা মিথ্যা। সে জন্যই বলেছি চোখ ও কানের মধ্যে যে দূরত্ব সত্য ও মিথ্যার মধ্যে দূরত্বও ততখানি। কথাটার মধ্যে শিক্ষণীয় বিষয় হলো যে আমরা যা শুনব তা যাচাই না করে বিশ্বাস করব না। এখন তো রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের বা গোপাল ভাঁড়ের যুগ নেই। মানুষ বেড়েছে, রাষ্ট্রের সীমা বেড়েছে, বেড়েছে বৈচিত্র্য ও মানুষের জ্ঞানের পরিধি। ফলে এখন চোখ ও কানের স্থান দখল করেছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। তারা তথ্য সংগ্রহ করে, বিতরণ করে আবার যাচাই বাছাইয়ের কাজও করে। চরিত্রভেদে এটা কখনো পূর্বাভাস আবার কখনো হয়ে যায় গুজব। ক্ষমতাসীনদের পছন্দ না হলে শাস্তি আর ক্ষমতার বাইরে যারা আছে তাদের পছন্দ না হলে দালাল আখ্যা জোটে তথ্য প্রদানকারীর। কিন্তু পছন্দ হোক বা না হোক সত্যের একটা শক্তি আছে। তা প্রমাণ হবেই।
এ কথা বলা হচ্ছিল দীর্ঘদিন ধরেই যে বৈষম্যমূলক উন্নয়ন খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। এত উন্নয়নের জোয়ারের পরেও দেশের ১২ কোটি মানুষ দারিদ্র্য ঝুঁকির মধ্যে বসবাস করছে। বন্যা, খরাসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা বড় কোনো অসুস্থতা যে কোনো মুহূর্তে আপাত সচ্ছল মানুষগুলোকে দরিদ্র মানুষে পরিণত করে দিতে পারে। গার্মেন্টস নির্ভর রপ্তানি বাণিজ্য অনেকটা কচুর পাতার পানির মতো। বিদেশের বাজার বন্ধ তো দেশের কাজ বন্ধ। কৃষি ও শিল্পের মেলবন্ধন দরকার, কৃষি ও কৃষকের সুরক্ষা দরকার। কৃষি এখনো দেশের শ্রমশক্তির ৪৫ ভাগের বেশি লোকের কর্মসংস্থান করে। খাদ্য নিরাপত্তা বিপন্ন হলে অর্থনীতির অন্য সূচকগুলো হোঁচট খেতে সময় লাগবে না। কিন্তু কেই বা শোনে কার কথা! ৬ কোটি ৩৫ লক্ষ শ্রমশক্তির মধ্যে ৪০ লক্ষ গার্মেন্টস কর্মী। রপ্তানি আয়ের ৮৩ শতাংশ এই খাত থেকে আসে বলে এ খাতের মালিকদের প্রবল প্রতাপ। রাষ্ট্রের কাছে সহযোগিতা, সহায়তা আর প্রণোদনা পাওয়া সব কিছুতেই গার্মেন্টস মালিকদের প্রাধান্য। কিন্তু করোনা আক্রান্ত হবার পর এক মাস যেতে না যেতেই গার্মেন্টস মালিকদের আহাজারি দেখে এখন প্রমাণ হলো যে কত ক্ষণস্থায়ী এই উন্নয়নের বুদবুদ। শ্রমিকদের বেতন দেওয়ার জন্যই গার্মেন্টস খাতে সরকারকে ৫,০০০ কোটি টাকার সহায়তা প্যাকেজ ঘোষণা করতে হয়েছে, যা ২ শতাংশ সুদে পরিশোধযোগ্য। কিন্তু মার্চ মাসের বেতন নিয়ে শ্রমিকদের সঙ্গে যা করা হলো তাতে এপ্রিল, মে আর জুন মাসের বেতন নিয়ে বিড়ম্বনার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শ্রমিক ছাঁটাই আর কারখানা ‘লে অফ’ করার প্রবণতা। করোনা সংক্রমণ রোধে সারা দেশে সরকার ঘোষিত সাধারণ ছুটির মধ্যে মালিকরা শ্রম আইনের ১২ ও ১৬ ধারা দেখিয়ে ‘লে অফ’ করার কথা বলছে তা কতটা আইনসংগত আর কতটা নৈতিক সে প্রশ্ন উঠছে। সরকারের প্রণোদনা নিয়েও শ্রমিক ছাঁটাই করতে থাকলে যে বিস্ফোরণমূলক পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে তা কি বিবেচনা করা হচ্ছে না? না কি এই পরিস্থিতি তৈরি করে আরও সুবিধা নেওয়ার পাঁয়তারা কষছেন কেউ কেউ?
দেশের শ্রমশক্তির ৮৫ শতাংশের বেশি নিয়োজিত আছে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে এবং এরাই দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। কৃষি, পরিবহন, রিকশা, ব্যাটারিরিকশা, ইজিবাইক চালক, নির্মাণ, রি-রোলিং, হোটেল, রেস্তোরাঁ, গৃহকর্মী, সেলুন, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, হকার, দিনমজুরসহ কত খাতে যে তারা কাজ করে তার ইয়ত্তা নেই। প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি শ্রমজীবী বিভিন্ন পেশায় কাজ করে নিজেদের জীবন আর দেশের অর্থনীতি বাঁচিয়ে রাখে। এদের কাজ থাকলে সংসার চলে, কাজ নাই তো মজুরি নাই; সংক্ষেপে ‘কানা মনা’ বলে এদের। এরা দিনে গড়ে ৪০০ টাকা উপার্জন করলে দিনে ২০০০ কোটি টাকার অর্থনৈতিক লেনদেন করে তারা। বছরে গড়ে ৩০০ দিন কাজ করলে জিডিপিতে প্রায় ৬ লাখ কোটি টাকার যোগানদাতা এরা। সরল হিসেবে ভ্যাট দিলেও তো ৯০ হাজার কোটি টাকা রাষ্ট্রকে দেয় তারা। করোনা দুর্যোগে লক ডাউন করায় তারা কর্মহীন। এমন কোনো সঞ্চয় তাদের নেই যে কর্মহীন পরিস্থিতিতে তারা সংসার চালাতে পারবে। তাদের জন্য প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে ৭৬০ কোটি টাকার। দুর্নীতি না করে সুষম বণ্টন হলে প্রত্যেকে পাবেন ১৩৮ টাকা। কী হবে এতে আর কদিন চলবেন এই টাকায়?
দুর্যোগকে মুনাফা বাড়ানোর সুযোগ হিসেবে নিয়ে চাল, ডাল, তেলসহ নিত্যপণ্যের দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন রাষ্ট্রের সবধরনের অনুগ্রহপুষ্ট ব্যবসায়ীরা। সরকারের খাদ্য গুদামে ১৫ লাখ টনের বেশি খাদ্য মজুদ আছে, ব্যবসায়ীদের কাছে আছে এর চেয়েও বেশি খাদ্য। বোরো ধান পেকেছে, কাটা শুরু হয়েছে। তাহলে মোটা চালের দাম কেজিতে ৫ থেকে ৮ টাকা বাড়ল কেন? এই দুর্যোগে মানুষ তাদের সীমিত সামর্থ্য নিয়ে দাঁড়িয়েছে মানুষের পাশে। করোনা সংক্রমণ রোধে সারা দেশে সহায়তা, খাদ্য সরবরাহ করছে তরুণ-যুবকদের বিভিন্ন ছোট ছোট গ্রুপ। বরিশাল নতুন নতুন উদাহরণ তৈরি করছে, একই সময়ে একদল ব্যবসায়ী গুণছে মুনাফা, কেউ কেউ ত্রাণ সামগ্রী চুরির নতুন উদাহরণ সৃষ্টি করছে। করোনা তাদের মধ্যে নীতিবোধ না জাগালেও করুণা তো জাগাতে পারত! কিন্তু হায়! ক্ষমতা আর মুনাফার কাছে তারা হেরে যাচ্ছে এবং বারবার হেরে যাচ্ছে মূল্যবোধ।
এই দুর্যোগে মানুষকে বাঁচাবে খাদ্য আর চিকিৎসা। অসুস্থ হলে চিকিৎসা প্রয়োজন কিন্তু সুস্থ অসুস্থ সবার জন্য খাদ্য ও পুষ্টি নিশ্চিত করা না গেলে করোনাসৃষ্ট এবং করোনাপরবর্তী অনাহারে মৃত্যু রোধ করা যাবে না। খাদ্য উৎপাদনকারী কৃষকদের জন্য প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষিত হয়েছে ৫০০০ কোটি টাকার এবং তা ৫ শতাংশ সুদে। একদিকে খাদ্য উৎপাদকরা পণ্য বিক্রি করতে পারছেন না অন্যদিকে আয় না থাকায় সাধারণ মানুষ কিনে খেতে পারছেন না। এ এক উভয়সংকট। খাদ্য উৎপাদন খাতের সঙ্গে জড়িত লাখ লাখ শ্রমজীবীর কাজ হারানোর শঙ্কা আর মানুষের খাদ্যের পুষ্টিমান কমে যাওয়ার ঝুঁকি দুটোই বাড়ছে। ১ লাখ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজে এই সব মানুষের স্থান তো তেমন চোখে পড়ছে না।
শ্রমিকের কাঁধে ভর করে থাকা মালিক, ক্ষুদ্র উৎপাদকদের পণ্য নিয়ে মুনাফা করা বড় ব্যবসায়ী, বড় বড় শিল্পপতিদের জন্য ভাবনা চিন্তা হচ্ছে প্রচুর। কিন্তু দিন এনে দিন খাওয়া আর রাষ্ট্রকে ভ্যাট দেওয়া দিন মজুর আর ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে অধিক সুদ দেওয়া ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের দুঃখ আড়ালে থেকে যাচ্ছে এই দুঃসময়েও। কর্মহীন, খাদ্যহীন মানুষকে ত্রাণ দিয়ে মৃত্যুর মিছিল রোধ করা বর্তমান সময়ের দাবি। কিন্তু ভবিষ্যতের কথা ভাবলে যে ব্যবস্থা মানুষকে অসহায় করে তোলে, যে কোনো দুর্যোগের অসহায় শিকারে পরিণত করে তার হাত থেকে পরিত্রাণের পথটাও খুঁজে বের করতে হবে।
লেখক
রাজনৈতিক সংগঠক ও কলামনিস্ট
rratan.spb@gmail.com