দেশের জেলাগুলোতে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব যাতে না বাড়ে, এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে স্থানীয় সরকার ও প্রশাসনকে নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এজন্য জেলা প্রশাসনের সঙ্গে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের একযোগে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। এছাড়া পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে রোজার মধ্যে কিছু কিছু শিল্পকারখানা চালু করা যেতে পারে বলে মত দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। গতকাল সোমবার ঢাকা বিভাগের চার জেলা ও ময়মনসিংহ বিভাগের সব জেলা প্রশাসকের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সে মতবিনিময়কালে এসব কথা বলেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘করোনাভাইরাস আক্রান্তের সংখ্যা যাতে না বাড়ে, তার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হবে। নিজেদের সুরক্ষার পাশাপাশি জেলার মানুষদের সুরক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে।’
শেখ হাসিনা ঢাকা বিভাগের মানিকগঞ্জ, গাজীপুর, টাঙ্গাইল ও কিশোরগঞ্জ এবং ময়মনসিংহ বিভাগের শেরপুর, জামালপুর, নেত্রকোনা ও ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসকের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। এসব জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, স্বাস্থ্য বিভাগসহ প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট সব বিভাগ, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও জনপ্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। করোনাভাইরাস পরিস্থিতির কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এটা কতদিন চলবে তা বলা যায় না। বিশ্বব্যাপী অর্থনীতি স্থবির। জাতিসংঘসহ সবাই বলছে, সারা বিশ্বে একটি অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দেবে। সে কারণে আমরা তিন বছর মেয়াদি প্রণোদনা দিয়েছি।
রোজার মধ্যে কিছু কারখানা চালু করা যেতে পারে
কয়েক দফা সময় বাড়িয়ে লকডাউনের মেয়াদ নেওয়া হয়েছে আগামী ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত। সেই সময়সীমা শেষ হলে কিছু কারখানা চালু করার জন্য ময়মনসিংহ, সিরাজগঞ্জ, পাবনা, মানিকগঞ্জ, রংপুর ও বগুড়া অঞ্চলের শ্রমিকদের নিরাপদে কর্মস্থলে নিয়ে আসতে পরিবহনের ব্যবস্থা করতে বিআরটিসির চেয়ারম্যানকে চিঠি লিখেছিলেন বিজিএমইএ সভাপতি রুবানা হক। সে পরিপ্রেক্ষিতে মতবিনিময় সভায় গাজীপুরের জেলা প্রশাসক এস এম তরিকুল ইসলাম প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। এ সময় শেখ হাসিনা বলেন, ‘একটা কাজ করতে পারেন, যদি ইন্ডাস্ট্রি তারা খুলতেও চায় বা কাজ করতে চায়, সেখানে স্বাস্থ্য নির্দেশিকা মেনে কীভাবে শ্রমিকদের দিয়ে কাজ করানো যেতে পারেৃ । পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের স্বাস্থ্য নির্দেশিকা কঠোরভাবে মেনে শ্রমিকদের সুরক্ষার ব্যবস্থা করতে পারলে রোজার মাসের মধ্যে সীমিত আকারে কিছু গার্মেন্টস ও শিল্পকারখানা চালু করা যেতে পারে।’ তিনি বলেছেন, ‘সামনে রোজা, আমরা সবাইকে একেবারে বন্ধ করে রাখতে পারব না। আমাদের কিছু কিছু জায়গা আস্তে আস্তে উন্মুক্ত করতেই হবে।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তাদের (শ্রমিকদের) সুরক্ষিত রেখে বা তাদের থাকার জায়গাগুলো... এখানে যদি কোনো ফাঁকা জায়গা থাকেৃ সেখানে যদি তাদের থাকার ব্যবস্থা করা যায়, যেখানে তারা সম্পূর্ণভাবে সুরক্ষিত থাকবে... বা ইন্ডাস্ট্রিগুলো তাদের নিজস্ব জায়গা অনেকের আছে, সেখানেও তারা একটা ব্যবস্থা করতে পারে। সেভাবে যদি তারা করতে পারে, তাহলে কিছু কিছু ইন্ডাস্ট্রি তো চালু করতেই হবে।’ কভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীদের স্বার্থে ওষুধশিল্পের পাশাপাশি চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য পিপিই ও মাস্ক তৈরিকারী প্রতিষ্ঠানগুলো খোলা রাখতে হচ্ছে বলে জানান শেখ হাসিনা।
জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় সরকারের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ
মতবিনিময় সভায় ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসকের উদ্দেশে শেখ হাসিনা বলেন, ‘এ পর্যন্ত এই জেলায় ২১ জন শনাক্ত হয়েছে। এটি একটি বড় জেলা। রোগী আর যাতে না বাড়ে সেদিকে সবাইকে নজর দিতে হবে।’ শেরপুর জেলা প্রশাসকের সঙ্গে মতবিনিময়কালে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এ জেলাটিতে করোনা রোগীর সংখ্যা মোটামুটি কম আছে। রোগী আর যাতে না বাড়ে এই বিষয়টি খেয়াল রাখতে হবে। ব্যবস্থা নিতে হবে।’ প্রসঙ্গত, শেরপুর জেলায় এ পর্যন্ত ১৭ জন সংক্রমিত হয়েছে।
নেত্রকোনা জেলা প্রশাসনের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি বলেন, ‘ওএমএসের চাল দেওয়ার জন্য আমরা যে তালিকা করার নির্দেশ দিয়েছি, সেই তালিকাটা যেন যথাযথ হয়। যারা দুস্থ ও যাদের প্রয়োজন তারা যেন পায়। যারা বয়স্কভাতা, বিধবাভাতাসহ সামাজিক সুরক্ষার অন্যান্য ভাতা পাচ্ছে, তাদের নাম তালিকায় থাকবে না। করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব যাতে না বাড়ে, সে ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে।’ কিশোরগঞ্জে করোনা রোগীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি উল্লেখ করে ভিডিও কনফারেন্সে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এই ভাইরাসটা যাতে আর না ছড়ায় সেটা দেখতে হবে। প্রত্যেককে নিজেদের সুরক্ষিত রাখতে হবে। জনপ্রতিনিধিদের বলব যার যার নিজের এলাকা সুরক্ষিত করার ব্যবস্থা নেবেন।’
ওএমএস কার্যক্রম চলমান আছে উল্লেখ করে কিশোরগঞ্জ জেলা প্রশাসনের সঙ্গে মতবিনিময়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘ওএমএস বন্ধ হয়নি। ওএমএস চলছে। কেবলমাত্র অতিরিক্ত যেটা দেওয়ার কথা তার তালিকা করার জন্য বলা হয়েছে। তালিকাটা এখনো হয়নি। এটা নিয়ে নানা সমস্যা দেখা দেওয়ায় আমরা তালিকা করার নির্দেশ দিয়েছি।
এর আগে জেলার করোনা পরিস্থিতি তুলে ধরে কিশোরগঞ্জ জেলা প্রশাসক সারওয়ার জাহান মুর্শিদ জানান, আমাদের এখানে বিদেশ থেকে প্রবাসীরা এলেও তাদের মাধ্যমে এখানে করোনাভাইরাস ছড়ায়নি। অতি সম্প্রতি ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ থেকে আসা রোগীদের মাধ্যমে এটি ছড়িয়েছে। খাদ্য উদ্বৃত্ত এ জেলার চলতি বোরো মৌসুমের ধান কাটার সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরে জেলা প্রশাসক বলেন, ‘ধান কাটার জন্য অন্য জেলার পাঁচ হাজার ৩৩২ জন শ্রমিক জেলায় কাজ করছে। স্থানীয় শ্রমিক ৫৫ হাজার ৭৬৮ জন, যারা করোনা পরিস্থিতির জন্য বেকার হয়ে গেছে। তাদের এবং সংসদ সদস্যের নেতৃত্বে ছাত্রলীগের ছেলেরা কাজ করছে। আশা করছি, বিআর ২৮ ধান ৩০ এপ্রিলের মধ্যে কাটা সম্পন্ন করতে পারব।
কিশোরগঞ্জে ওএমএসের চাল বাড়িয়ে দেওয়ার দাবি উঠলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের মানুষের প্রবণতা তো ভালো নয়। বরাদ্দ বাড়িয়ে দিলে পরে দেখা যাবে তারা কাজ করতে চাইবে না। বাড়িয়ে দেওয়া হলে ধান কাটার শ্রমিক পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। কারণ, মানুষ একবেলা খেতে পারলে পরের বেলার চিন্তা করে না। ফলে যখন রিলিফ পাবে আর কাজ করবে না বসে থাকবে।’
কিশোরগঞ্জ রাষ্ট্রপতির জেলা
কিশোরগঞ্জের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সে আলাপকালে ধান উৎপাদনে উদ্বৃত্ত এ জেলায় কোনো রাইস মিল আছে কি না তা জানতে চান প্রধানমন্ত্রী। জবাবে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়, এই জেলার যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো ছিল না। এখন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের কারণে জেলার যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হয়েছে। এখন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে।
জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কিশোরগঞ্জ আসলে কিশোরী থেকে গেল। এটি তো রাষ্ট্রপতির জেলা। এখানে স্বাধীনতার সময় উপরাষ্ট্রপতি ছিলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম। তিনি ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ জেলায় জিল্লুর রহমান রাষ্ট্রপতি ছিলেন। এখনো এ জেলায় (আবদুল হামিদ) রাষ্ট্রপতি রয়েছেন। এজন্য মনে হয় এ জেলার মানুষ মনে করে আমাদের আর কী লাগবে আমরা তো রাষ্ট্রপতির জেলা।’
দরিদ্রদের কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করা চ্যালেঞ্জ
দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য হোম কোয়ারেন্টাইন বা আইসোলেশন মেনে চলা খুবই কষ্টকর উল্লেখ করে টাঙ্গাইল জেলা প্রশাসক শহীদুল ইসলাম বলেন, ‘দেশের সব অঞ্চলের নিম্নআয়ের মানুষ একটি মাত্র কক্ষে রাত্রিযাপন করেন। তারা সবাই একটি মাত্র টয়লেট এবং একটি মাত্র গোসলখানা ব্যবহার করে। এসব পরিবারের কেউ আক্রান্ত হলে বা করোনার লক্ষণ দেখা দিলে, তারা সাধারণত তা গোপন করে রাখে। এই প্রেক্ষাপটে কীভাবে তারা হোম কোয়ারেন্টাইন আইসোলেশন মেনে চলবেন, কীভাবে সোশ্যাল ডিসট্যান্স, ফিজিক্যাল ডিসট্যান্স ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলবেনএ বিষয়ে সচেতনতামূলক প্রচার অভিযান আরও জোরদার করা প্রয়োজন।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের জন্য ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ এবং গাজীপুর জেলা ডেঞ্জার জোনে পরিণত হয়েছে। এসব জেলা থেকে আমাদের জেলার প্রবেশপথ কঠোরভাবে সিল করা হলে এবং মহাসড়কে চেকপোস্ট আরও জোরদার করা হলে করোনা বিস্তার রোধ করতে সক্ষম হব।’
জেলা প্রশাসক জানান, জেলা থেকে ৬৮২ জন কৃষি শ্রমিককে ধান কাটার জন্য নেত্রকোনা-কিশোরগঞ্জসহ বিভিন্ন জায়গায় পাঠানো হয়েছে। কালিহাতী উপজেলায় ডিজিটাল স্মার্টকার্ড ব্যবহার করে চাল বিতরণ শুরু হয়েছে। অন্যান্য উপজেলায় এটি শুরু করা হবে। এর ফলে এক ব্যক্তি একাধিকবার চাল নিতে পারবেন না। এই চাল বিতরণ কার্যক্রম অফিসে বসেই মনিটর করার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। টাঙ্গাইল জেলা প্রশাসনের সঙ্গে মতবিনিময়কালে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর কন্যা হিসেবে জাতির প্রতি আমার দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করছি। এছাড়া আমি আর কিছু নই এবং কিছু চাইও না। এই দুঃসময় থাকবে না, এই দুঃসময় আমরা একদিন কাটাতে পারব।’
টাঙ্গাইলে এক টিম
সোমবার ভিডিও কনফারেন্সে টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক তার জেলার করোনা রোগী সংক্রান্ত তথ্য উল্লেখ করেন। তিনি জানান, তার জেলায় বর্তমানে ১১ জন করোনা পজিটিভ শনাক্ত হয়েছে। এদের মধ্যে তিন জন ঢাকা থেকে, সাত জন নারায়ণগঞ্জ ও একজন গাজীপুর থেকে সংক্রমিত হয়েছে। তুলনামূলকভাবে রোগী কম থাকায় প্রধানমন্ত্রী সন্তোষ প্রকাশ করেন। রোগীর সংখ্যা ১১ জন হওয়ায় প্রধানমন্ত্রী ক্রিকেট টিমের সদস্য সংখ্যার দিকে ইঙ্গিত করে হাসির ছলে বলেন ‘আপনারা একটা টিমে রেখে দিয়েছেন।’ এটা যাতে আর না বাড়ে সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে।’
মানিকগঞ্জ সুস্থ আছে সুস্থ থাক
মানিকগঞ্জ জেলা প্রশাসনের ব্যবস্থাপনায় সন্তোষ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এটা খুবই ভালো যে নিজেরা ব্যবস্থা নিয়েছেন। ভালো অবস্থাটা ধরে রাখতে হবে। তবে মানিকগঞ্জের সমস্যাটা ওই পাটুরিয়া ঘাট, সে ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। মানিকগঞ্জকে সুরক্ষিত করতে পেরেছেন এজন্য সবাইকে ধন্যবাদ জানাই। মানিকগঞ্জ সুস্থ আছে, সুস্থ থাক।’
এ পর্যন্ত মানিকগঞ্জ জেলায় ৬ জন করোনাভাইরাস পজিটিভ বলে জেলা প্রশাসক জানান। প্রসঙ্গত, ঢাকার সঙ্গে সীমান্তবর্তী বা নিকটবর্তী জেলাগুলোতে তুলনামূলকভাবে করোনা প্রাদুর্ভাব বেশি। এদের মধ্যে নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। সেই হিসেবে ঢাকার কাছাকাছি জেলা হিসেবে মানিকগঞ্জে করোনা পজিটিভ সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম। মানিকগঞ্জ জেলা প্রশাসক জানান, নিম্ন-মধ্যবিত্তদের যারা হাত পেতে খাবার নিতে লজ্জা পাচ্ছেন, তাদের টেলিফোন বা এসএমএসে সাড়া দিয়ে তাদের বাড়িতে খাবার পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।