সারা দেশ যখন করোনা আতঙ্কে কাঁপছে, নিম্নবর্গীয়রা কর্মহীন হয়ে অনাহার-অর্ধাহারের সম্মুখীন, তখন সরকারি ত্রাণব্যবস্থা আরেক সমস্যার সম্মুখীন। আর তা হলো ত্রাণসামগ্রী, বিশেষত চাল আত্মসাৎ, অবশ্য ক্ষেত্রবিশেষে এক কথায় ত্রাণ বিতরণে ও সুলভমূল্যে নির্ধারিত সরকারি চাল নিয়ে নয়ছয় একশ্রেণির অসাধু জনপ্রতিনিধির। করোনার ভয়াবহতা তাদের যথারীতি দায়িত্ব পালনে ও নীতিনৈতিকতা রক্ষায় প্রণোদিত করেনি। অবৈধ পন্থায়, দুর্নীতিতে অর্থ সংগ্রহই তাদের কাছে বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
করোনার আক্রমণে বহু কারখানার পোশাক-শ্রমিকসহ দিনমজুর ও মেহনতি মানুষ যখন কর্মহীনতায় সমস্যাপীড়িত, তখন সরকারি ত্রাণ ব্যবস্থাপনার শুরুতে একাধিকবার উচ্চারিত প্রধানমন্ত্রীর সতর্কবাণী এবং সম্প্রতি সে কথার পুনরুক্তি সত্ত্বেও ওই বিশেষ শ্রেণি তাদের কালো হাত গুটিয়ে নেয়নি। দৈনিক পত্রিকায় একাধিক খবরই তার প্রমাণ।
এই সামাজিক ব্যাধি অবশ্য আজকের নয়, নতুন কিছু নয়। দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধের সময় বঙ্গদেশে মজুদদারি, মুনাফাবাজি, কালোবাজারি প্রভৃতি শব্দগুলো সমাজে ও সাহিত্য-সংস্কৃতি জগতে খুবই পরিচিতি পেয়েছিল। সেই সঙ্গে দুর্নীতি। চাল নিয়ে দুর্নীতির কারণে লাখ লাখ দরিদ্র গ্রামীণ নর-নারী-শিশুর মৃত্যু এক ঐতিহাসিক ঘটনা। বিনিময়ে অর্থে-বিত্তে ফুলে-ফেঁপে ওঠে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী। তখনো ‘ত্রাণ চুরি’ শব্দটি খুব একটা সামাজিক পরিচিতি পায়নি, পেয়েছে আরও পরে, দেশি-বিদেশি শাসন থেকে মুক্তির পর। প্রাকৃতিক দুর্যোগে-দুর্ভোগে ত্রাণব্যবস্থায় সমাজের কর্তাব্যক্তি বা জনপ্রধানদের কালো হাত প্রসারের কারণে। সামাজিক দুর্নীতির রাজনৈতিক চরিত্র অর্জন এবং তা একশ্রেণির অসৎ জনপ্রতিনিধির রাজনৈতিক অঙ্গন দূষিত করার কারণে। এই দুর্নীতি কমে নানা স্তরে, নানা মাত্রায় ছড়িয়ে পড়েছে কেন্দ্র থেকে অধিক মাত্রায় প্রান্তিক জনপদে। দুর্নীতির এই সামাজিক বিস্তার, ব্যাধি-চরিত্র অর্জন ইতিহাস রচনার তাৎপর্য বহন করে সেই পাকিস্তানি আমল থেকে। পরে বাংলাদেশে সরকারি সংস্থা টিসিবিতে তার থাবা বিস্তার বহুল আলোচিত ঘটনা। নিত্যপণ্য, খাদ্যপণ্য, ভোগ্যপণ্যের ঘাটতির মতো সামাজিক সমস্যায় এই ব্যাধির সর্বাধিক স্বরূপে আত্মপ্রকাশ। ফলে অনেক সরকারি প্রচেষ্টা কালিমাচিহ্নিত হয়েছে।
দুই. গৌরবদীপ্ত স্বাধীনতাযুদ্ধের পরও বাংলাদেশের সমাজ দুর্ভাগ্যক্রমে পূর্বোক্ত এবং বহু আলোচিত এই ব্যাধি থেকে মুক্ত হতে পারেনি, যা বিশেষ করে দেখা গেছে প্রাকৃতিক দুর্যোগে বা দুর্ভিক্ষে ত্রাণ বিতরণের ক্ষেত্রে। অবাক হওয়ার মতো ঘটনা যে করোনার মতো শ্রেণি-নির্বিশেষে (নিম্নবিত্ত থেকে মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত) একটি ঘাতক ব্যাধির ভয়াবহ আক্রমণ ও বিস্তারের মুখেও পূর্বোক্ত সামাজিক ব্যাধির প্রকাশ অর্থাৎ কর্মহীন নিম্নবর্গীয়দের মধ্যে ত্রাণ বিতরণে অসাধুতার প্রকাশ খোলামেলা ভাষায় ‘ত্রাণ চুরি, চাল চুরি’ বন্ধ হয়নি।
জাতীয় সংকটে এমন ঘটনা অনাকাক্সিক্ষতই ছিল, যদিও এ সমাজের জন্য তা অস্বাভাবিক কিছু নয়। অসাধু না-শোনে নীতিবচন। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বিস্তারের পরিপেক্সিক্ষতে অবরোধ ঘোষণার ফলে সৃষ্ট নিম্নবর্গীয়দের সমস্যা ঠেকাতে যখন ত্রাণ বিতরণের ব্যবস্থা হলো, তখন থেকেই প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা ‘ত্রাণ দুর্নীতিতে জড়িত থাকলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে’। এ ঘোষণা বারবার। তা সত্ত্বেও দেখা গেল, দুর্নীতি বড় শক্তিমান আকর্ষণ সে কারও সদোপদেশ বা সতর্কবার্তা মানে না। তাই ত্রাণ দুর্নীতি-চাল দুর্নীতি ঠিকই শুরু হয়ে যায়। বেশ কয়েকজনের জেল-জরিমানা শাস্তি সত্ত্বেও সে দুর্নিবার। উল্লিখিত সতর্কবাণীর মধ্যেই একই সময়ে একটি দৈনিকে তিন কলামে প্রকাশিত একটি খবরের শিরোনাম : ‘২ হাজার ২৫৭ বস্তা চাল উদ্ধার’। অর্থাৎ ত্রাণের চাল উদ্ধার চোরের হাত থেকে। এ উপলক্ষে ঘটনার সংক্ষিপ্তসার ‘১২ জন গ্রেপ্তার। চার ইউপি চেয়ারম্যান ও পাঁচ সদস্য সাময়িক বরখাস্ত। ডিএসসিসির ১৭ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর সালাউদ্দিন ঢালী আটক’। ভাবতে কষ্ট হয়, করোনা দুর্যোগের আবহে জনপ্রতিনিধিদের এবংবিধ অসাধু আচরণ! কোথায় তারা নিজ স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে দারিদ্র্যপীড়িত, অনাহার-ক্লিষ্ট মানুষের সেবার দায়িত্ব পালনে এগিয়ে যাবেন, তা নয়; তারাই ভক্ষক। তারাই গরিবের চাল চুরিতে বিবেকহীন, দায়িত্ব পালন তো দূরের কথা।
‘গরিবের চাল সহায়তার’ এই দুরবস্থা, তাও জনপ্রতিনিধিদের হাতে, লক্ষ করে উল্লিখিত শিরোনামের প্রতিবেদনের গুরুত্বপূর্ণ সূচনাবাক্যটি হচ্ছে ‘খাদ্যবান্ধব কর্মসূচিসহ বিভিন্ন সহায়তার চাল আত্মসাতের ঘটনা কমছে না’। এ ঘটনার আমরা বিস্তারিত বিবরণে যাচ্ছি না। কারণ ঘটনা আরও অনেক, সেখানে রয়েছে তাৎপর্যপূর্ণ ব্যক্তিদের উপস্থিতি।
একই দিনে (১৬ এপ্রিল, ২০২০) অন্য একটি দৈনিকের প্রথম পাতায় মোটা হরফে প্রধান শিরোনাম : ‘নজরদারিতে চেয়ারম্যান-মেম্বাররা’। ‘দুই দিনে ৩ মেম্বারসহ ৫ জনের কারাদণ্ড/আ.লীগ নেতাসহ গ্রেপ্তার ১৭’। ‘চাল ও ত্রাণ আত্মসাৎ ঠেকাতে মাঠে সরকারি একাধিক সংস্থা।/তিন দিনে ১২ ইউপি চেয়ারম্যান-মেম্বার বরখাস্ত’। ঘটনা অভাবিতই নয়, তা যে বেপরোয়া, পরবর্তী খবরে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান।
ত্রাণ পাচ্ছে না, চাল পাচ্ছে না তাই অনাহারীর ‘৩৩৩ নম্বরে ফোন দিয়ে চাল চাওয়ার জের’ চমকপ্রদই বটে। কিছুদিন আগে একটি দৈনিকের সংবাদে পড়েছিলাম ত্রাণ বিতরণে সরকার এখন হার্ডলাইনে। তার কিছু নমুনা দেখা সত্ত্বেও ওই চাল চাওয়ার কারণে ‘কৃষককে পিটিয়ে জখম করলেন ইউপি চেয়ারম্যান’। ঘটনা নাটোরের অর্জুনপুর বামনহাটির। চেয়ারম্যান সাহেবের নাম আবদুস সাত্তার। তিনি স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা। বলতে হয় দুঃসাহসী নেতা।
একই সংবাদের পাশে প্রকাশিত প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা ‘রিলিফ দুর্নীতির সঙ্গে যেই জড়িত তার বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা’। কিন্তু সমাজ ও রাজনীতির সর্বাঙ্গে দুর্নীতির এত ক্ষত যে মলম লাগানোর জায়গা নেই। প্রধানমন্ত্রীর সতর্কবার্তা তারই দলের অসাধুদের পথে আনতে পারছে না। ত্রাণের চাল বড় মধু; একি ছাড়া যায়? তাই অবাঞ্ছিত ঘটনাগুলো একে একে ঘটে যাচ্ছে জেল-জরিমানা অগ্রাহ্য করে। আমরা আগেও বলেছি, করোনাপর্বেও দরকার দুর্নীতিবাজদের কঠোর শাস্তি এবং তা প্রয়োজনে বিশেষ আইনি ব্যবস্থায়।
কারণ একটাই। এই তাবৎ দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন খাতে দুর্নীতির ধীর-সুস্থির বিস্তার এতটাই ডালপালা মেলেছে যে, তাতে দুর্নীতি একটি শক্তিমান উপসর্গে পরিণত হয়েছে। আর এজন্যই জনপ্রতিনিধিদের এত রোয়াব, এত বেপরোয়া অবস্থান ও ভূমিকা যে, ত্রাণ চাওয়ায়
কৃষককে পিটিয়ে বেহাল দশা করতে বিন্দুমাত্র ভয়-ভাবনা নেই ইউপি চেয়ারম্যানের। একাধিক দৈনিক পত্রিকায় অনুরূপ বিভিন্ন খবর জড়ো করলে এমন কিছু একটাই মনে হবে।
তিন. করোনার আক্রমণ এ পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, ‘সারা দেশকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ ঘোষণা করা হয়েছে (১৭.৪.২০২০)। এ অবস্থায় স্বল্প আয়ের মানুষ এবং নিম্নবর্গীয়দের অর্থনৈতিক সংকট বাড়তে থাকবে, যা ক্রমে জাতীয় সংকটে পরিণত হবে। এ অবস্থা মোকাবিলায় আমরা আগেও লিখেছি, জাতীয় পর্যায়ে সর্বাত্মক উদ্যোগ, সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণই সঠিক পন্থা জাতীয় সংকট বলে কথা।
কিন্তু বড় সমস্যা হলো, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশিত পথে হাঁটছেন না প্রতাপশালী, প্রভাবশালী কর্তাব্যক্তিরা। হয়তো তাই সরকারবিরোধী নয়, এমন একটি দৈনিকে অভাবিত সংবাদ শিরোনাম : ‘জনগণের পাশে নেই বেশির ভাগ পৌর মেয়র’। আমাদের প্রশ্ন : তারা তো জনগণের ভোটে নির্বাচিত এবং তাদের নির্বাচনকালীন ইশতেহারে ছিল অনেক মিষ্টি-মধুর প্রতিশ্রুতি। ক্ষমতা কি তাদের অন্ধ করে দিয়েছে? কিন্তু ‘অন্ধ হলে তো প্রলয় বন্ধ থাকে না’। তারা কি দেখতে পাচ্ছেন না সারা দেশে ভুখা মানুষের অতিপ্রয়োজনীয় ত্রাণের দাবি? ওই দৈনিকেরই একটি সংবাদ শিরোনাম : ‘ত্রাণের দাবিতে সারা দেশে শ্রমজীবীদের বিক্ষোভ’। এক ধরনের নৈরাজ্য তথা বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে সমাজে করোনা সংক্রমণ উপলক্ষে। পোশাক কারখানা মালিক সমিতির নমনীয় হওয়ার আহ্বানে বড় একটা সাড়া দিচ্ছে না অধিকাংশ কারখানা মালিক শ্রমিকদের সহায়তা দানের ক্ষেত্রে। অন্যদিকে পৌর মেয়র সাহেবরা প্রয়োজনের দিনে, সংকট মোচনের চেষ্টায় ত্রাণ বিতরণে দল-নির্বিশেষ সর্বজনীন পরিস্থিতি সৃষ্টির জন্য মাঠে নামছেন না। ত্রাণ যাতে যথাস্থানে সঠিকভাবে পৌঁছায়, তেমন তদারকি বা তত্ত্বাবধান তাদের দায়িত্ব। সেই সঙ্গে এটাও দেখা যাতে জনপ্রতিনিধিদের কারও হাত দুর্নীতিতে প্রসারিত না হয়।
প্রধানমন্ত্রীর হুঁশিয়ারি সত্ত্বেও ঘটনা বিপরীত দিকে চলার প্রবণতাই দেখাচ্ছে বেশি। ত্রাণ চুরি-চালু চুরির অভিযোগে জেল-জরিমানার সংখ্যা তার প্রমাণ। এ অবস্থায় তাদের কর্তব্য জনবান্ধব ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া এবং দুর্নীতির আগ্রাসন বন্ধ করা। করোনা-দুর্যোগে আপাতত এটাই আমাদেরও বক্তব্য। ক্ষমতাসীন দলের কর্তাব্যক্তিদের কর্তব্য প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণাকে বাস্তবায়িত করা ‘দলীয় পরিচয় দেখে ত্রাণ বিতরণ নয়’। ত্রাণ যাবে যোগ্য ব্যক্তির হাতে।
লেখক
ভাষাসংগ্রামী, গবেষক ও প্রাবন্ধিক