সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম মিররে প্রকাশিত এক কলামে বলা হয়েছে, জার্নালিজম বা সাংবাদিকতা না থাকলে করোনায় আরও বহু মানুষ প্রাণ হারাত। এ ক্ষেত্রে ম্যাক্সওয়েল ই ম্যাককমস এবং ডোনাল্ড এল শ’র ভাষায় বলতে হয়, ‘গণমাধ্যম যদি জনগণের মনোযোগ নির্দিষ্ট বিষয়ের দিকে চালিত করতে পারে, তাদের চিন্তাভাবনাকে প্রভাবিত করতে পারে, তাহলে ক্ষমতা কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করার ক্ষমতাও তাদের রয়েছে।’ কিছুদিন ধরে করোনা দুর্যোগের কারণে কাগজের সংবাদপত্রের প্রচার যে কমে গেছে, অনেক পত্রিকা ছাপা বন্ধ করে দিয়েছে, এ নিয়ে সংবাদপত্র সংশ্লিষ্ট অনেকের উদ্বেগ দেখেছি। মূলত সংবাদপত্র বা সংবাদমাধ্যম যেসব কারণে হুমকির মুখে পড়তে বাধ্য হয়, তার সব ধরনের উপাদানই আমাদের দেশে বিদ্যমান। তারপরও কয়েক দশক ধরে সংবাদমাধ্যমগুলো তাদের কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে পেরেছে। প্রায়ই নতুন নতুন পত্রিকা বা ওয়েব পোর্টালের অস্তিত্ব দেখা যাচ্ছে। কিন্তু এটা কীভাবে সম্ভব!
অনেকেই মনে করেন করপোরেটোক্রেসির যুগে গণমাধ্যম মূলত একটা ব্যবসায়িক মডেল। অন্য আর দশটা ভোগ্যপণ্যের মতো। গণতন্ত্রে সংবাদমাধ্যমকে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার প্রবণতা থাকলেও, এখন যেন সে কথা আর খাটে না। মূলত জনগণের অনুশাসন চলে গেছে করপোরেট শ্রেণির হাতে। গণতন্ত্রের খোল নলচেও পাল্টে গেছে। গণতন্ত্রের সংজ্ঞায় যখন পরিবর্তন আসে, তখন করপোরেট অনুশাসনে চলা গণমাধ্যম আর কতটা চতুর্থ স্তম্ভের দায়-দায়িত্ব পালন করতে পারে সে ক্ষেত্রে সন্দেহ রয়েই যায়। তার ওপর ‘চতুর্থ শিল্পবিপ্লব’-এর সময়কালে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কবলে গণমাধ্যমকে মোকাবিলা করতে হচ্ছে নতুন আরেক বাস্তবতা। আর তা হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। একে প্রযুক্তির এক নিষ্ঠুর রসিকতাই বলা যায়। তাহলে কি গণমাধ্যমের জায়গা দখল করে নিচ্ছে টেকনোলজি বা সামাজিক মাধ্যম আর সেখানেই তারা আতঙ্কিত! কিন্তু ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় সামাজিক মাধ্যম নতুন কিছু নয়। প্রাক-শিল্পবিপ্লব যুগে মানুষের মুখে মুখে খবর ছড়াত, হাট-বাজারে লোকরা নিজেদের মতো একটা মতপ্রকাশ করত এবং নিজেদের সামাজিক একটা পরিমণ্ডল তৈরি করে নিত।
শিল্পবিপ্লবের আগে জার্মানিতে মার্টিন লুথারের (১৫১১) ধর্মীয় প্রচার পুস্তিকা ষাট লক্ষাধিক কপি বিক্রি হয়েছিল। পুরো জার্মানিতে এই প্রচার পুস্তিকাগুলো বিক্রি হতে সময় লেগেছিল প্রায় দুই সপ্তাহের মতো। লুথারের সমর্থকরা এই পুস্তিকাগুলোর দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন। থমাস পেইনের প্রচার পুস্তিকা ‘কমন সেন্স’ (১৭৫৭) ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের উপনিবেশীকরণবিরোধী আলোচনা প্রচার করত। কিন্তু এর প্রচার সংখ্যা ছিল খুবই নগণ্য। হাজারখানেকের বেশি নয়। এত স্বল্পসংখ্যায় প্রচার হলেও তা জর্জ ওয়াশিংটনের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছিল। বর্তমানকালেও প্রযুক্তির মাধ্যমে জনগণ একই কাজ করছে। তবে পার্থক্য একটা আছে। তা হলো প্রাক-শিল্পযুগে সামাজিক মাধ্যম ছিল মানুষের সংযোগ স্থাপনের বিনাপয়সার উপায়। এখন প্রযুক্তির কল্যাণে যোগাযোগমাধ্যম গণমাধ্যমের জন্য হুমকি হয়ে ওঠার পাশাপাশি ভাগ বসাচ্ছে গণমাধ্যমের মুনাফায়ও। এ সম্পর্কে ক্রেগ নিউমার্ক বলেছেন, সোশ্যাল মিডিয়া নতুন কিছু নয়। জন লক, থমাস পেইন এবং বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিনকে তিনি আধুনিক ব্লগারদের সঙ্গে তুলনা করেছেন এবং তিনি বলেছেন, ২০২০ সালের মধ্যে মিডিয়া ও রাজনীতি হবে ভিন্নতর। কারণ ক্ষমতায় অভ্যস্ত ব্যক্তিরা বিভিন্ন ধরনের সামাজিক নেটওয়ার্কের দ্বারা পরিচালিত হবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা গোপন প্রচার-প্রচারণার মাধ্যম তার নিজ নিজ বলয়ে হয়তো শক্তিশালী হয়ে উঠবে, তাই বলে গণমাধ্যম তার আবেদন হারাবে বলে মনে হয় না। প্রথমত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে ধরনের নিউজ পাওয়া যায়, সেগুলোর নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে নানা ধরনের প্রশ্ন থাকে। সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেক সময় খবরের উৎস অস্পষ্ট থাকে। আর দ্বিতীয়ত, সোশ্যাল মিডিয়ায় যে খবর প্রচার হয়, সেগুলো পরে পর্যালোচনা করার মতো উপাত্ত থাকে না। আবার মূলধারার গণমাধ্যমে যতগুলো ইস্যু একসঙ্গে পাওয়া যায়, সোশ্যাল মিডিয়ায় কিন্তু তা পাওয়া যায় না। তবে সোশ্যাল মিডিয়ায় গুজব ও হালকা ধরনের খবর প্রচারের কারণে ব্যবহারকারীদের মধ্যে একটা বাজার তৈরি করেছে, যা গণমাধ্যমের প্রচারের ওপর তেমন একটা প্রভাব বিস্তার করতে পারে না। সম্পাদনা, বিশ্বাসযোগ্যতা, নানাবিধ কারণে সবশেষে মানুষ গণমাধ্যমের ওপরই বিশ্বাস করতে চায়। যে কারণে দেখা যায়, সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনো একটা খবর কেউ প্রচার করলে তার বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত হতে মানুষ পত্রিকার লিংক চায়। কারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্যগুলোর কোনো বৈধতা নেই। বস্তুনিষ্ঠতার জন্য মানুষ মূলত এটাকে ব্যবহার করে না। সোশ্যাল মিডিয়া মূলত সঠিক তথ্য পাওয়ার জন্য বা কোনো মতামতকে সংগঠিত করার জন্য ভালো।
হাফিংটন পোস্ট বা উইকিলিকসের উত্থানের পর তথ্যপ্রবাহের জগতে নিয়ন্ত্রিত সংবাদমাধ্যম হয়তো কিছুটা কোণঠাসা হয়ে পড়েছে কিন্তু সর্বোপরি সংবাদমাধ্যম এখনো তার আবেদন হারায়নি। তবে এ কথা সত্যি, সংবাদমাধ্যমে ইতিমধ্যে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। গত তিন দশকে গণমাধ্যমের ব্যবহারের ধারণায় বিপ্লব হয়েছে। মানুষ ডিজিটাল মাধ্যমের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। অনলাইন সংবাদপত্রের জনপ্রিয়তা বাড়ছে। জার্নালিজমের ধারায় প্রচলিত অনেক ধারণাই পাল্টে যাচ্ছে। বলা হচ্ছে সিটিজেন জার্নালিজম বা জনসাংবাদিকের কথা। জার্নালিজমের এ ধারাটা এখন স্বীকৃত। এই ধারায় যে কেউ সংবাদ কর্মী হয়ে উঠতে পারেন। সিটিজেন জার্নালিজম মূল জার্নালিজমের ক্ষেত্রটাকে কঠিন করে দিয়েছে। সিটিজেন জার্নালিজমে প্রথাগত চাকরির ধারণা থেকেও বেরিয়ে আসছে সাংবাদিকতা। ফ্রিল্যান্সিং এখন একটা আকর্ষণীয় বিষয়। এ ক্ষেত্রে একজন ফ্রিল্যান্সার নিজেই সংবাদ লিখছেন, ভিডিও করছেন, সম্পাদনা করছেন এবং তা গণমাধ্যমে বিক্রি করছেন।
অনলাইন জার্নালিজমের পর যে ক্ষেত্রটা আলোচিত হচ্ছে, তা হলো মাল্টিমিডিয়া জার্নালিজম, যা মূলত অনলাইন জার্নালিজমের একটা বর্ধিত অবয়ব। একসময়ে অনলাইন জার্নালিজম বলতে শুধু বোঝা তো নিউজ পোর্টালগুলোকে, সেখানে ইউটিউব বা অন্য মাধ্যমগুলো খুব একটা গুরুত্ব পেত না। অথচ ইউটিউব এখন তথ্যের জগতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। সাক্ষাৎকার, এক্সক্লুসিভ ক্লিপ থেকে ডেইলি ইভেন্টও উঠে আসছে ইউটিউবের মতো মাধ্যমে। এভাবে সাংবাদিকতায়ও একটা আমূল পরিবর্তন এসেছে। একসময় হয়তো প্রেস ব্রিফিংয়ের মতো বিষয়গুলো আর থাকবে না। ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান তাদের নিজস্ব ওয়েবসাইটে বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের মতামত প্রকাশ করবে।
তাই বলা যায়, কাগজের সংবাদপত্রের জগতে করোনা-উত্তর পৃথিবীতে হয়তো একটা পরিবর্তন আসতে পারে, যা দশ বছর পর আসত, তা হয়তো অনেকটা ত্বরান্বিত হবে। কিন্তু বস্তুনিষ্ঠ সংবাদমাধ্যমের আবেদন ফুরাবে না। তাই তো সামাজিক মাধ্যমের ব্যাপক উত্থানের পরও সংবাদপত্র মালিকের, করপোরেট লিডারদের ও রাজনৈতিক প্রভাবের দ্বারা পরিচালিত হলেও সংবাদমাধ্যম এখনো তার আবেদন হারায়নি। বরং সোশ্যাল মিডিয়ার উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে সংবাদমাধ্যমের গুরুত্ব আরও বেড়ে গেছে। ভবিষ্যতে হয়তো আরও বাড়বে।
লেখক : কথাসাহিত্যিক