করোনাভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে সাধারণ ব্যাংকিং সেবা সীমিত করায় গৃহবন্দি মানুষের লেনদেনের ক্ষেত্রে মোবাইল ব্যাংকিং বিকাশের ব্যবহার বেড়েছে। সেই সুযোগে ফের সক্রিয় হয়েছে ‘বিকাশ প্রতারক চক্র’। বিভিন্ন কৌশলে গ্রাহকের অ্যাকাউন্টের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে তারা। প্রতারিত হওয়ার পর বিকাশ কর্তৃপক্ষের সহায়তা না পাওয়ার অভিযোগও করছেন ভুক্তভোগীরা। পুলিশের একাধিক সদস্যের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সারা দেশেই এই চক্রের সদস্য রয়েছে। তাদের মূল টার্গেট সহজ-সরল মানুষ। এই চক্রের সঙ্গে বিকাশের কিছু অসাধু এজেন্টও জড়িত। তারা বিকাশের গ্রাহকের তথ্য অর্থের বিনিময়ে প্রতারক চক্রের কাছে সরবরাহ করছে।
করোনাকালে এমন প্রতারণার শিকার হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত অনেকেই সেই অভিজ্ঞতার কথা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেইসবুকে তুলে ধরছেন। থানায় অভিযোগও করছেন অনেকে। তাদেরই একজন জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের ছাত্রী শাহরিনা আফরীন। ২০ এপ্রিল তার ফেইসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেন। সেখানে তিনি লেখেন, ‘খুব বিপদে পড়ে পোস্ট করছি। প্রথমেই বলে নিই যে আমার বাবা খুবই সহজ-সরল একজন মানুষ। উনি চট্টগ্রামে সিনজেন্টায় ছোট্ট একটি চাকরি করেন। থাকেন ২ নম্বর গেটের কাছে। আমরা ঢাকায় থাকি। ১৯ এপ্রিল বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ঢাকার অফিস থেকে অফিসের কাজে আব্বুর বিকাশে ৫০ হাজার টাকা (২০,০০০+৩০,০০০ দুই ভাগে) পাঠায়। আব্বুর বিকাশে প্রায়ই টাকা পাঠানো হয় অফিসের কাজে। যা-ই হোক, দুপুর ১টার দিকে আব্বুর বিকাশ অ্যাপে টাকা ওঠানোর নোটিফিকেশন আসছিল। সঙ্গে সঙ্গে টাকা ওঠাতে গিয়ে দেখেন তার আগের টাকাসহ কোনো টাকা নেই বিকাশে। অ্যাপের স্টেটমেন্ট চেক করে জানা যায়, দুপুর ৩টায় আলাদা আলাদা নম্বরে টাকা ট্রান্সফার করা হয়েছে। এরপর বিকাশ হেল্পলাইনে যোগাযোগের চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। পুরো ঘটনা বর্ণনা করে চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে। বারবার বিকাশ হেল্পলাইনে কল করেও পাওয়া যাচ্ছে না। যতটুকু জানতে পারি আব্বুর থেকে অনেক আগে একবার বিকাশে সমস্যার কথা বলে কল আসে এবং বিকাশের পিন, এনআইডিসহ অনেক তথ্য জেনে নেয়। এ কথা উনি আমাদের সঙ্গে শেয়ার করেননি। আব্বুর বস টাকার জন্য খুব চাপ দিচ্ছেন। আমাদের এই টাকা দেওয়ার সামর্থ্য নেই। সংসারটাই চলছে টেনেটুনে। এ অবস্থায় এ চক্রটাকে ধরা বা টাকাটা উদ্ধার করার জন্য কেউ কি সাহায্য করতে পারবেন?’
বিষয়টি নিয়ে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার মো. ফারুক হোসেনের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, করোনার এই সময়ে স্বাভাবিক ব্যাংকিং সীমিত হয়েছে। ফলে মানুষ যথাসময়ে ব্যাংকিং কার্যক্রম করতে না পেরে অনলাইন ব্যাংকিংয়ের দিকে ঝুঁকছে। ফলে প্রতারক চক্র এই সুযোগ নিতে পারে।
তিনি আরও বলেন, ‘শুধু করোনার সময় নয়, স্বাভাবিক পরিস্থিতিতেও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এ ধরনের চক্র সুযোগ নিয়ে থাকে। যারা পেশাগতভাবেই এই প্রতারণার কাজ করে থাকে। আমরা ইতিপূর্বে অনেক অভিযান পরিচালনা করেছি। সেই সব অভিযানে চক্রের গডফাদার থেকে শুরু করে তাদের অনুসারী যারা আছে, তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গত এক বছরেই এমন সাতটি চক্রের হোতাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।’
বিকাশের লেনদেনের নিরাপত্তাব্যবস্থায় কোনো ফাঁক রয়েছে কি না, জানতে চাইলে সিআইডির এই কর্মকর্তা বলেন, ‘বিকাশ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আমরা কয়েদ দফায় বৈঠক করেছি। বিকাশের অফিসারদের আমরা ট্রেনিং করিয়েছি, নিরাপত্তা বিষয়ে বিভিন্ন এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রামও করে থাকি। বিকাশের নিরাপত্তার কোনো দুর্বলতার বিষয়টি আমাদের কাছে এখনো পরিলক্ষিত হয়নি। আমাদের কাছে মনে হয়েছে বাংলাদেশের সাধারণ জনগণ সহজেই প্রতারণার শিকার হয়ে যায়।’
অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা চলে যাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, অনেকে বিকাশের ক্যাশ ইন বা আউট পয়েন্টে গিয়ে অ্যাকাউন্টের যে পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে সেটি গোপনে করে না। প্রতারক চক্রের সদস্যরা তার আশপাশে থেকে পাসওয়ার্ডটি মনে রাখে। পরে সিম ডেভেলপ করে টাকা তুলে নেয়। সুতরাং পাসওয়ার্ড কারও সঙ্গে শেয়ার করা উচিত নয়। টাকা তোলার সময় আশপাশে কেউ ফলো করছে কি না, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।’
গত ২১ মার্চ যশোরে আন্তঃজেলা বিকাশ প্রতারক চক্রের ৪ সদস্যকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ ব্যুরো ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তখন পিবিআইয়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এম কে এইচ জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, প্রতারক চক্রটি প্রথমে মাঠপর্যায়ের বিভিন্ন বিকাশের দোকান থেকে তাদের হাতে থাকা মোবাইল দিয়ে দোকানের বিকাশের রেজিস্টারের পাতার ছবি কৌশলে তুলে নেয়। তারপর ছবিগুলো দ্বিতীয় ধাপের প্রতারকের কাছে পাঠায়। তারা বিকাশের প্রধান কার্যালয়ের কর্মকর্তার পরিচয় দিয়ে কৌশলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের বিকাশ অ্যাকাউন্টের ভেরিফিকেশন কোড ও পিন কোড সংগ্রহ করে। বিকাশ অ্যাপের মাধ্যমে গ্রাহকের ওই অ্যাকাউন্ট থেকে প্রতারকরা তাদের নির্ধারিত নম্বরে টাকা পাঠিয়ে দেয়। সর্বশেষ তৃতীয় ধাপে তারা বিকাশের এজেন্টদের মাধ্যমে সেই টাকা উঠিয়ে থাকে। এজেন্টরা সরাসরি প্রতারণার কাজে সহযোগিতা করে।
বিকাশের পক্ষ থেকে এ ধরনের প্রতারণার বিষয়ে গ্রাহকদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে বলা হয়েছে, ‘কোনোভাবেই প্রতারিত হবেন না। ভুলে টাকা চলে গেছে বলে প্রতারক আপনাকে টাকা পাঠাতে বলতে পারে কিংবা বিকাশ কর্মকর্তা সেজে অ্যাকাউন্ট সচল ও তথ্য হালনাগাদের কথা বলতে পারে। এসব কথায় কান দেবেন না। বিকাশ কখনো অ্যাকাউন্টের পিন, ভেরিফিকেশন কোড বা অন্যান্য তথ্য জানতে চায় না। এ ছাড়া আপনি লোভ, ভয় অথবা ভুল বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে মোবাইলে অপরিচিত কাউকে নিজের টাকা বিকাশ করবেন না।