মানসম্মত ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রী (পিপিই) পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেছেন করোনা চিকিৎসার জন্য নির্ধারিত কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী সরকারি হাসপাতালে কর্মরত বেশ কয়েকজন নার্স। তাদের দাবি, নিম্নমানের পিপিই পরে চরম ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে তাদের। আর এরই মধ্যে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে হাসপাতালটির ৩ নার্স করোনাভাইরাসে আক্তান্ত হওয়ায় অন্য নার্সদের মধ্যে ভীতি ছড়িয়ে পড়েছে। অন্যদিকে চলমান সংকট মোকাবিলায় সম্প্রতি এই হাসপাতালে প্রেষণে নতুন যোগ দেওয়া ৬৪ নার্স দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে প্রেষণে যোগ দেওয়া নার্সদের ভাষ্য, নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) পুরনো ও দক্ষ নার্স থাকার পরও তাদের আড়ালে রেখে জোর করে নতুনদের আইসিইউতে ডিউটি দেওয়া হচ্ছে।
তবে ওই অভিযোগ অস্বীকার করে কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী সরকারি হাসপালের নার্সিং সুপারিনটেনডেন্ট রহিমা খাতুন টেলিফোনে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যেসব নার্স এ ধরনের অভিযোগ করেছে তাদেরকে প্রমাণ দিতে বলুন যে তাদেরকে মানসম্মত পিপিই ও এন-৯৫ মাস্ক দেওয়া হয়নি। আর প্রেষণে আসা ৬৪ নার্সকেই শুধু আইসিইউতে ডিউটি দেওয়ার অভিযোগও সঠিক নয়। সবার সঙ্গে সমন্বয় করে ডিউটি দেওয়া হচ্ছে।’
উদ্ভূত সংকটের সমাধান চেয়ে নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবর লিখিত আবেদন করেছেন কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে কর্মরত ৪১ নার্স। তাতে হাসপাতালের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় যুক্ত নার্সিং কর্মকর্তাদের চরম দুর্ব্যবহার, অমানবিক আচরণ ও নানা সমস্যা-সংকটের কথা তুলে ধরা হয়েছে। এসব সংকটের সমাধান করা না হলে পরিবারের কথা চিন্তা করে মানবিক বিবেচনায় তাদের প্রেষণাদেশ বাতিল করে নিজ নিজ কর্মস্থলে ফেরত নেওয়ার দাবিও করেছেন।
লিখিত আবেদনে বলা হয়, ‘করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের সেবায় প্রেষণে কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী সরকারি হাসপাতালে গত ৫ এপ্রিল যোগ দেই। যেকোনো সময় নিজেরাও এই ভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারি জেনেও নিজের জীবন ও পরিবারের মায়া ত্যাগ করে গত ৫ এপ্রিল আমরা এখানে যোগদানের পর থেকে পদে পদে নানা বৈষম্য ও অমানবিক আচণের শিকার হচ্ছি।’
অভিযোগে আরও বলা হয়, ‘এই হাসপাতালে কর্মরত নার্সিং সুপারিনটেনডেন্ট রহিমা খাতুন, সুপারভাইজার ফেরদৌসী খানমসহ বেশ কয়েকজন পুরনো ৩০-৩৫ নার্সকে রোস্টার ডিউটি না দিয়ে দাপ্তরিক কাজে ব্যস্ত রাখেন। করোনা রোগীর ওয়ার্ড ও আইসিইউতে প্রেষণে যোগ দেওয়া নার্সদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। মানসম্পন্ন পিপিই ও এন-৯৫ মাস্ক ছাড়াই নার্সদের রোগীদের সেবা দিতে বাধ্য করা হচ্ছে।’
আবেদনে সই করা ভুক্তভোগী কয়েকজন নার্স অভিযোগ করে বলেন, নার্সিং সুপারিনটেনডেন্ট ও সুপারভাইজারসহ অন্যদের সঙ্গে এসব সমস্যা নিয়ে কথা বলতে চাইলেই তারা চরম দুর্ব্যবহার করেন। এমনকি চাকরি থেকে বরখাস্ত করারও হুমকি দেন। কোনো সমস্যার কথা বলতে গেলেই তাদের মুখে একই বুলি ‘কাজ করতে না চাইলে লিখিতভাবে রিজাইন দিয়ে চলে যাও।’
নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে হাসপাতালটির একজন নার্স বলেন, ‘১২ বছরের চাকরিজীবনে এমন দুর্ব্যবহারের শিকার হইনি। বাসায় প্রতিবন্ধী সন্তান রেখে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছি। প্রধানমন্ত্রী যেখানে নার্সদের কাজের প্রশংসা করে দফায় দফায় ধন্যবাদ দিয়েছেন, সাধারণ মানুষ যেখানে করোনাযুদ্ধে ডাক্তার-নার্সদের ফ্রন্টলাইনের যোদ্ধা হিসেবে অভিহিত করছেন, সেখানে এদের এমন দুর্ব্যবহার কাজ ছেড়ে চলে যাওয়ার মতো উসকানি।’
নার্সদের করা আবেদনে আরও বলা হয়েছে, শুরুতে ঊর্ধ্বতনরাসহ সব নার্সিং কর্মকর্তা উত্তরার হোয়েল মিলিনা হোটেলে ওঠেন। কিন্তু এরই মধ্যে ওই হোটেলে অবস্থানরত ৩ নার্স করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হন। এরপর রাতারাতি আগে প্রেষণে থাকা ১৬ জন নার্সিং কর্মকর্তা অন্য হোটেলে চলে যান। বর্তমানে মিলিনা হোটেলে নতুন প্রেষণে যাওয়া ৬৪ নার্সকে রাখা হয়েছে। জায়গা না হওয়ায় দুজনের রুমে তিনজন থাকছেন। এতে ব্যক্তিগত দূরত্ব বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে না। যেখানে একজন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগী ধরা পড়লে পুরো বাড়ি বা মহল্লা লকডাউন করে দেওয়া হচ্ছে সেখানে কীভাবে ৬৪ জন নার্সকে মৃত্যুর মুখে ফেলে রেখে অন্য কর্মকর্তারা চলে গেলেন। তা নিয়ে হোটেলে অবস্থানরত নার্সরা চরম মানসিক বিপর্যয়ের মধ্যে রয়েছেন।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সাদিকা আক্তার বলেন, ‘কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে যেসব মাস্ক ও পিপিই দেওয়া হয়েছে সেগুলো মানসম্মত। এ নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই।’