মহামারী করোনাভাইরাসের কারণে থমকে গেছে অর্থনীতির চাকা। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বড়-ছোট সব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। লম্বা সময় সাধারণ ছুটি ঘোষণার কারণে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে পড়েছেন ছোট ব্যবসায়ীরা; বিশেষ করে সারা দেশের ৫৩ লাখ ৭৩ হাজার প্রতিষ্ঠানের ক্ষুদ্র, পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীরা পথে বসেছেন। এমন ক্ষুদ্র পুঁজির ব্যবসায়ীদের কিভাবে প্রণোদনা দেওয়া যাবে তা দেশ রূপান্তরের সঙ্গে কথা বলেছেন বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন স্টাফ রিপোর্টার মামুন আব্দুল্লাহ।
দেশ রূপান্তর : রমজান মাস শুরু হলেও দোকানপাট দুপুরেই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এতে কী প্রভাব পড়ছে?
হেলাল উদ্দিন : সরকারের সিদ্ধান্তের বাইরে আমরা কেউ যেতে পারব না। যেখানে মসজিদ-মন্দিরে লোকসমাগম কম করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। আমাদের তা মানতেই হবে। কারণ স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি নেওয়া উচিত হবে না। তবে যেহেতু রমজানে ইফতারের একটা বিষয় আছে। এ জন্য দোকান খোলা রাখার সময় বাড়ানো উচিত।
দেশ রূপান্তর : ঝুঁকি এড়িয়ে এটা কীভাবে সম্ভব?
হেলাল উদ্দিন : এখন দোকান খোলা রাখতে হচ্ছে সকাল ৯টা থেকে দুপুর ২টা। এই সময় তো ঝুঁকি এড়িয়েই সবাই বাজার করছে। এ সময়টা বাড়িয়ে সকাল থেকে সন্ধ্যা ৭টা করা উচিত। এতে ইফতারের বাণিজ্যটা করতে পারবেন ব্যবসায়ীরা। অন্যদিকে ঢাকাসহ বিভিন্ন জায়গায় ছিন্নমূল মানুষ ছাড়াও ব্যাচেলররা রয়েছেন। যারা বাসায় ইফতারি বানিয়ে খেতে পারছেন না। আগে থেকেই কিনে খেয়ে অভ্যস্ত। তাদের বেশ উপকার হতো।
দেশ রূপান্তর : সরকারের সাধারণ ছুটির ফলে কী ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে?
হেলাল উদ্দিন : গেল পহেলা বৈশাখে দোকানটপাট বন্ধ থাকার কারণে আমাদের ক্ষতি হয়েছে ৮-৯ হাজার কোটি টাকা। এখন যদি ঈদ পর্যন্ত এ অবস্থা চলতে থাকে তাহলে আমাদের ক্ষতি ২০-২২ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। অনেক দোকান মালিক তাদের পুঁজি ভেঙে খেতে বাধ্য হচ্ছেন। এভাবে চলতে থাকলে অনেকেই পথে বসবেন। দোকান চালানোর মতো আর পুঁজি থাকবে না।
দেশ রূপান্তর : এ অবস্থায় সরকারের কী করণীয় হওয়া উচিত বলে মনে করেন?
হেলাল উদ্দিন : এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য দোকান ভাড়া, কর্মচারীদের বেতন, ব্যাংক লোন, বিদ্যুৎ ও সার্ভিস চার্জ বিলসহ অন্য আনুষঙ্গিক বিলের ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি ও হস্তক্ষেপ কামনা করি। তিনি বলেন, বর্তমান সংকটময় পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য ব্যবসাবান্ধব প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষিত সিদ্ধান্ত ব্যবসায়ীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে পালন করছেন। এমন পরিস্থিতিতে ক্ষুদ্র এই ব্যবসায়ীদের স্বার্থ দেখার জন্য প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চাই।
দেশ রূপান্তর : এসএমইর জন্য তো প্রণোদনা প্যাকেজ দেওয়া হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে। এর আওতায় দোকান মালিকরা পড়বেন না?
হেলাল উদ্দিন : প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত প্রণোদনা এই ব্যবসায়ীরা পাবেন না। কারণ প্রণোদনার শর্তে বলা হয়েছে, ব্যাংকে যাদের ঋণ আছে, তারা সেই ঋণের ৩০ শতাংশ পাবেন। কিন্তু ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের পছন্দ না করলে ঋণ দেবে না। ব্যাংকগুলো সব সময় বড় ব্যবসায়ীদের পছন্দ করে। তাদের শত শত কোটি টাকা দিলেও খুচরা ব্যবসায়ীদের কয়েক লাখ টাকা দিতে আগ্রহী নয়। ফলে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ঋণ দেবে না ব্যাংক।
তিনি আরও বলেন, সারা দেশে ৫৩ লাখ ৭৩ হাজার ক্ষুদ্র দোকান ব্যবসায়ী রয়েছেন। এসব দোকানে প্রায় ৫ কোটি কর্মচারী কর্মরত। তাদের বেতন ঠিকই দিতে হচ্ছে। এ জন্য তারা কোনো আন্দোলনেও নামছেন না। যেমনটা দেখা যাচ্ছে পোশাকশ্রমিকদের ক্ষেত্রে।
দেশ রূপান্তর : কী পরিমাণ অর্থ প্রয়োজন হতে পারে?
হেলাল উদ্দিন : এই কর্মচারীদের আংশিক বেতনের জন্য প্রয়োজন কমপক্ষে আড়াই হাজার কোটি টাকার তহবিল গঠন করতে প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রস্তাব দিয়েছি। ওই তহবিল থেকে ঋণ নিয়ে দোকান কর্মচারীদের মূল বেতনের অর্ধেক হিসেবে সর্বোচ্চ ৭ হাজার টাকা প্রদান করবেন মালিকরা। আশা করছি প্রধানমন্ত্রী হেফাজতে ইসলামের তা-বে ক্ষতিগ্রস্ত খুচরা ব্যবসায়ীদের জনপ্রতি ৫০ হাজার টাকা দিয়ে যেভাবে সহায়তা করেছিলেন, এবারও ক্ষতিগ্রস্ত খুচরা ব্যবসায়ীদের জন্য উদ্যোগ নেবেন।
এই ব্যবসায়ী নেতা বলেন, প্রতি কর্মচারীর গড় মাসিক বেতন ১৫ হাজার টাকা হিসাবে তাদের আংশিক বেতন সর্বোচ্চ ৭ হাজার টাকা প্রদানের জন্য ওই ঋণ তহবিল গঠনে প্রধানমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ করেছেন। এই তহবিল থেকে ক্ষুদ্র, পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীরা বিনা সুদে ঋণ পাবেন।
দেশ রূপান্তর : আলাদা কোনো প্রণোদনার প্রয়োজন আছে বলে মনে করেন কি?
হেলাল উদ্দিন : ক্ষুদ্র, পাইকারি ও খুচরা প্রতিষ্ঠানে প্রতিদিন মোট ক্ষতির পরিমাণ ১ হাজার ৭৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এসব দোকানে প্রতিদিন গড় বিক্রির পরিমাণ ২০ হাজার টাকা; যা থেকে ১০ শতাংশ লভ্যাংশ করেন মালিকরা। এ অবস্থায় এসএমই উদ্যোক্তাদের মতো দোকান মালিকদের জন্য আলাদা ৫ হাজার কোটি টাকা প্রণোদনা দাবি করছি।