করোনাভাইরাসের মহামারীর কারণে বড় ধাক্কা লেগেছে সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনায়। অর্থনীতির চাকা অনেকটা থমকে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বড়-ছোট সব ব্যবসায়ীসহ সাধারণ মানুষ। আয়-রোজগার না থাকায় অনেকেই পুঁজি ভেঙে খাচ্ছে। ফলে অনেক মধ্যবিত্ত মানুষও নিম্নবিত্তে নেমেছে। আর গরিবরা আরও গরিব হচ্ছে। এ অবস্থায় আগামী অর্থবছরের বাজেট হওয়া উচিত দরিদ্র ও কর্মহীন মানুষকে লক্ষ্য করে। বাজেটে ব্যবসা-বাণিজ্য স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে দিকনির্দেশনা থাকতে হবে। এ ক্ষেত্রে মেগা ১০টিসহ অগ্রাধিকার প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নসহ ৫টি খাতে গুরুত্ব দেওয়া উচিত বলে মনে করেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান। তিনি এসব বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন দেশ রূপান্তরের স্টাফ রিপোর্টার মামুন আব্দুল্লাহর সঙ্গে...
দেশ রূপান্তর : নতুন অর্থবছরের বাজেট আসন্ন। করোনাকালে বাজেটে কোন কোন বিষয় প্রাধান্য পাবে?
পরিকল্পনামন্ত্রী : এবারের বাজেট তৈরির প্রক্রিয়া শুরু করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। আমার মতে, আগামী বাজেটে কৃষি ও স্বাস্থ্য খাতকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ কৃষি হলো আমাদেন গ্রামীণ অর্থনীতির প্রাণ। গ্রামীণ অর্থনীতি বাঁচলে দেশ বাঁচবে। অন্যদিকে মানুষের জীবন বাঁচাতে স্বাস্থ্য খাতের দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে হবে। এ ছাড়া আগামী বাজেটে স্থানীয় সরকার, অবকাঠামো উন্নয়ন ও প্রাথমিক শিক্ষায় জোর দিতে হবে। কারণ এবারের করোনা আমাদের অর্থনীতির কলিজায় আঘাত করেছে। দেশের বহু মানুষ গরিব হয়ে যাবে। তাদের জন্য অবশ্যই কিছু না কিছু করতে হবে। তা না হলে ছেলেমেয়েদের স্কুলে পাঠাতে পারবে না।
অন্যদিকে ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতির গতি ফিরিয়ে আনতে বাজেটে দিকনির্দেশনা থাকা উচিত। কারণ ব্যবসা-বাণিজ্য ও রপ্তানি ভালো হলে অনেক মানুষের হাতে কাজ চলে আসবে। আজ যে রিকশাচালক ভাত পাচ্ছে না, সে যদি ভাড়া পায়, যাত্রী পায়, তাহলে তার কারও সহযোগিতা না নিলেও চলবে।
দেশ রূপান্তর : প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে কী বলবেন?
পরিকল্পনামন্ত্রী : আমার মনে হয়, উন্নয়নের ধারায় ফিরতে মেগা প্রকল্পগুলোর কাজ দ্রুত শেষ করা উচিত। এ জন্য বাজেটে এ বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে। যেমন পদ্মা সেতু প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার পথে। অল্প কয়েকটি স্প্যান বসালেই হয়ে যাবে। এ কাজটি যত টাকা লাগে দিয়ে শেষ করা উচিত। কারণ এর কাজ শেষ হলে ওই অঞ্চলের অর্থনীতিতে গতি ফিরে আসবে। অন্যদিকে মেট্রোরেলের কাজের গতিও বেশ ভালো। রাজধানীর মানুষের জীবনে গতি আনতে এটির কাজও শেষ করা যেতে পারে। এভাবে মেগা ১০ প্রকল্পসহ যেসব অগ্রাধিকার প্রকল্প রয়েছে, সেগুলোর কাজ দ্রুত শেষ করতে বাজেটে নির্দেশনা থাকা উচিত বলে মনে করি।
দেশ রূপান্তর : গতানুগতিক বাজেট না করে, করোনার কারণে তা পুনর্বিন্যাস করা দরকার আছে বলে মনে করেন কি?
পরিকল্পনামন্ত্রী : এবারের বাজেটে আরেকটি বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে। একটি রাষ্ট্রে অনেকগুলো খাত রয়েছে, যা অনুৎপাদনশীল। কিন্তু রাজনৈতিক বা অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে অনেক ক্ষেত্রে বাড়তি বরাদ্দ দেওয়া হয়। এসব খাতে প্রতি বছরই ব্যয় বাড়ে। কিন্তু করোনার কারণে এসব বরাদ্দ এবার কমিয়ে দিয়ে বাজেট পুনর্বিন্যাস করা যেতে পারে। এ বিষয়টা প্রধানমন্ত্রী ছাড়া অন্য কেউ করার ঝুঁকি নেবেন বলে মনে হয় না। কিন্তু করোনাভাইরাসের কারণে সৃষ্ট এ ক্ষতি পুষিয়ে নিতে এটা করা যেতে পারে বলে মনে করি।
দেশ রূপান্তর : অর্থ মন্ত্রণালয় উন্নয়নে অর্থছাড়ে লাগাম টানছে। এতে উন্নয়নে ব্যাঘাত ঘটবে কি না?
পরিকল্পনামন্ত্রী : উন্নয়নে অর্থছাড় নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে একটি সার্কুলার হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, সব প্রকল্পকে তিন ভাগে ভাগ করে উচ্চ, মধ্য ও নিম্নÑ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অর্থছাড় দেওয়া হবে। এখন বিষয়টা হলো, এতে উন্নয়ন কার্যক্রমের যে স্বাভাবিক গতি তা ব্যাহত হবে, এটা সত্য। কিন্তু এই টাকা কোথায় ব্যয় হবে সেটা দেখতে হবে। করোনাভাইরাসের কারণে দেশের অনেক মানুষ বেকায়দায় আছে, কাজ নেই। জীবন ও জীবিকার জন্য অর্থ ও খাদ্য সামগ্রী দুটোই দরকার। উন্নয়নের এই টাকাটা যাবে ওই সব সাধারণ মানুষের জন্য। ফলে সাময়িকভাবে উন্নয়ন ব্যাহত হলেও এটি দেশের মানুষের প্রয়োজনে করা হয়েছে বলে মনে করি।
দেশ রূপান্তর : চলতি অর্থবছরে এডিপি বাস্তবায়নে করোনার প্রভাব কতটুকু?
পরিকল্পনামন্ত্রী : চলতি অর্থবছরের আর মাত্র দুই মাস বাকি আছে। গত ফেব্রুয়ারিতে চীনে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের পর থেকেই বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নে বিঘœ সৃষ্টি হয়েছে। আর গত মাস থেকে তো কাজই বন্ধ রয়েছে। এই অবস্থায় এডিপি বাস্তবায়নের হার ভালো হবে না। কারণ বাকি দুই মাস হয়তো আর কাজই এগোবে না। এ জন্য এই টাকাটা রিভিশন করে, নিম্ন আয়ের মানুষের সহায়তায় ব্যবহার করা হচ্ছে। যেন তারা অন্তত দুবেলা পেট ভরে খেতে পারে।
দেশ রূপান্তর :মানুষের কাছে নগদ টাকার সংকট রয়েছে। সরাসরি আর্থিক সহায়তা দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে কি?
পরিকল্পনামন্ত্রী : এই করোনায় কারও অঢেল সম্পত্তি রয়ে যাবে, ব্যয় করতে পারবে না। আবার কারও জীবনধারণ করার মতো পয়সা থাকবে না। এটা সারা বিশে^ই হচ্ছে। তবে প্রধানমন্ত্রী নিম্ন ও মধ্যবিত্তের জন্য সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর আওতায় নানা পদক্ষেপ নিচ্ছেন। মানুষ যেন দুবেলা পেটপুরে খেতে পারে তার ব্যবস্থা করছেন। তবে নগদ অর্থ প্রদানের যে বিষয়টি, সেটির পরিকল্পনা আপাতত নেই। কারণ আশা করছি, শিগগিরিই স্বল্প পরিসরে হলেও শিল্প কারখানা খোলা হবে। মানুষের কর্মসংস্থান বা কাজ করার অবস্থা সৃষ্টি করতে পারলে হাতে টাকা চলে আসবে। এখন ১০ টাকা দরের চাল দিচ্ছে সরকার। এ ছাড়া অসহায় ও দরিদ্র মানুষের জন্য ত্রাণ দেওয়া হচ্ছে। ফলে অল্প সময়ে কাজের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারলে নগদ টাকার যে সংকট সেটা থাকবে না। করোনার সময় মানুষের লাইফস্টাইলে একটু পরিবর্তন আনতেই হবে। আগে ভাত খাওয়ার পর চা না খেলে চলত না। এখন হয়তো ভাতটা খাওয়া হবে, কিন্তু চা-টা হয়তো পারবে না। তবে সরকার চাল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহের ব্যাপক উদ্যোগ নিয়েছে। এখন সেটা বাস্তবায়নও করা হচ্ছে।