হাওরে ধান নিয়ে শঙ্কায় কৃষকরা

টানা বৃষ্টিতে হাওরে বাড়ছে পানি। আগাম বন্যার শঙ্কায় কৃষকরা নিচু এলাকার জমির আধাপাকা ধান কাটতে বাধ্য হচ্ছেন। অথচ কৃষকরা চাচ্ছেন ধান পুরোপুরি পাকার পরে কাটতে। পাশাপাশি করোনা পরিন্থিতিতে শ্রমিকের অভাবে পানির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সব ধান কাটা সম্ভব কি না, তা নিয়ে রয়েছে সংশয়। এর সঙ্গে আছে শিলা বৃষ্টি ও বজ্রপাতের চোখ রাঙানি। তবে কৃষি মন্ত্রণালয় চাইছে এই মাসের ৩০ তারিখের মধ্যে হাওরের ধান কাটা শেষ করতে। সে কারণেই পুরো হাওর এলাকায় এখন ধান কাটার কাজ চলছে পুরোদমে।

দেশ রূপান্তরের সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ ও হবিগঞ্জ প্রতিনিধির প্রতিবেদন ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যানুসারে এর মধ্যে ২৪ এপ্রিল পর্যন্ত হাওরাঞ্চলের ১ লাখ ৯৮ হাজার হেক্টর জমির ধান কাটা হয়েছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যানুসারে কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ, সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হাওরেই ৪ লাখ ৪৫ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে ওই দিন পর্যন্ত সিলেটে ৫৩, মৌলভীবাজারে ৫৪, হবিগঞ্জে ৩৭, সুনামগঞ্জে ৪৮, নেত্রকোনায় ৫৬ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ৫৬ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে।

ওই এলাকার ধান কাটার কাজে ৩ লাখ ৯ হাজার ২৪৪ শ্রমিক, ৩৫৯টি কম্বাইন হারভেস্টার ও ৪৪২টি রিপার ধান কাটার কাজে নিয়োজিত আছে।

আমাদের সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি জানিয়েছেন, জেলায় হাওর এলাকায় বন্যার শঙ্কা নিয়ে পুরোদমে চলছে ধান কাটা। গত শনিবার পর্যন্ত পুরো জেলায় ধান কাটা হয়েছে ৪৮ শতাংশ। বৈরী আবহাওয়া আর শ্রমিক সংকটে ধান কাটতে কৃষকদের নানা সংকটে প্রশাসন, বিভিন্ন রাজনৈতিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সহযোগিতায় আর দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে আসা শ্রমিকদের নিয়ে হাওরে কৃষকরা বোরো ধান তুলতে ব্যস্ত সময় পার করছেন।

জেলা কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, সুনামগঞ্জে এবার ১৫৪টি হাওরে ২ লাখ ১৯ হাজার ৩০০ হেক্টর বোরো ফসলের আবাদ হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১২ লাখ মেট্রিক টন।

সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. সফর উদ্দিন জানান, সুনামগঞ্জে গত শনিবার পর্যন্ত গড়ে ১০ লাখ ৪৯ হাজার ৬০ হেক্টর জমির ধান কাটা হয়েছে, যা মোট ফসলের ৪৮ শতাংশ। এর মধ্যে হাওরে ৯৭ হাজার ১৩৫ হেক্টর ৬০ শতাংশ এবং হাওরের বাইরে ১৩ শতাংশ ফসল কাটা হয়েছে। সরকার প্রদত্ত ১১৪টি কম্বাইন হারভেস্টার এবং ১১৭টি রিপার মেশিনও হাওরের উঁচু এলাকার ধান কাটছে। বেশ কিছু এলাকায় এখন ধান পুরোপুরি পাকেনি, আগাম বন্যা আর শ্রমিক সংকট থাকলেও বাইরের শ্রমিক ও স্বেচ্ছাসেবীদের সহযোগিতায় ধান কাটা চলছে। আগামী ৫ মের মধ্যে হাওরের সম্পূর্ণ বোরো ফসল কাটা শেষ হয়ে যাবে বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ।

হবিগঞ্জে শ্রমিক সংকট ও আগাম বন্যার আশঙ্কা কাটিয়ে হারভেস্টার মেশিন ও শ্রমিক দিয়ে দ্রুতগতিতে হাওরে পাকা ধান কাটছেন কৃষকরা। অপেক্ষাকৃত উঁচু এলাকা হওয়ায় টানা বৃষ্টিতে জমিতে এখনো পানি ওঠেনি। তবে ধানের ন্যায্যমূল্য নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন কৃষক। জেলার কৃষি বিভাগ বলছে, হাওরাঞ্চলের ধান কাটা শেষ হতে মে মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত লাগবে।

নেত্রকোনার অন্যতম মোহনগঞ্জ উপজেলার ডিঙ্গাপোতা হাওরের সাড়ে ৬ হাজার হেক্টর জমির প্রায় ৯০ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে এমন দাবি মোহনগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার। কৃষক ধান কাটায় সন্তুষ্ট হলেও দাম কম হওয়ায় হতাশ।

মৌলভীবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সূত্রের বরাতে আমাদের প্রতিনিধি জানিয়েছেন, জেলায় এ বছর বোরো আবাদ হয়েছে ৫৩ হাজার ৫৩০ হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে হাওরে আবাদ হয়েছে ২৬ হাজার ৭০০ হেক্টরে। ইতিমধ্যে মৌলভীবাজারের হাকালুকি, কাউয়াদিঘি ও বাইক্কাবিল হাইল হাওরে ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত ৭২ শতাংশ ধান কাটা সম্পন্ন হয়েছে। ৪৭টি কম্বাইন হারভেস্টার ও ১২৯টি রিফার মেশিন দিয়ে ধান কাটা হচ্ছে। এ ছাড়া ২৬ হাজার শ্রমিক ধান কাটায় অংশ নিয়েছেন।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কাজী লুৎফুল বারী জানান, বোরো ধানের ফলন ভালো হয়েছে। এ মাসের মধ্যেই হাওরের ধান ঘরে তোলা সম্ভব হবে।

আমাদের কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি জানিয়েছেন, হাওরের কৃষকদের এখন আরেক আতঙ্কের নাম করোনাভাইরাস ও বজ্রপাত। এ কারণে শ্রমিক সংকটে ভুগছেন কিশোরগঞ্জের হাওরের হাজারো কৃষক। জেলার হাওরাঞ্চল, বিশেষ করে ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রামের হাজারো কৃষকের এখনো প্রায় ৬০ শতাংশ জমির ধান কাটা বাকি রয়েছে। শ্রমিক সংকটের পরও কৃষকরা যে ৪০ শতাংশ জমির ধান কাটতে পেরেছেন, তাও গত দুদিনের টানা বৃষ্টির কারণে মাড়াই ও শুকাতে পারছেন না তারা।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. সাইফুল আলম হাওরে শ্রমিক সংকটের কথা স্বীকার করে বলেন, হাওরে চট্টগ্রাম থেকে কিছু শ্রমিক আসায় তাদের সহযোগিতায় ৫০ শতাংশ জমির ধান কাটা হয়ে গেছে। কিন্তু দুদিন ধরে বৃষ্টি, শিলাবৃষ্টি ও প্রবল বজ্রপাতে প্রাণহানির ঘটনায় ভয়ে মাঠে নামছেন না শ্রমিকরা। তবে আবহাওয়া কিছুটা ভালো হলেই আশা করি এ সপ্তাহের মধ্যেই সম্পূর্ণ ধান কাটা হয়ে যাবে।