সারা দেশে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্যেই করোনা সংক্রমণের হটস্পট বা মূল কেন্দ্র নারায়ণগঞ্জসহ গাজীপুর, আশুলিয়া, রাজধানী ঢাকা এবং চট্টগ্রামের তৈরি পোশাক কারখানাগুলো খুলে দেওয়া হয়েছে। সংক্রমণের আতঙ্ক থাকলেও পেটের দায়ে কাজে যোগ দিতে মহাসড়কগুলোতে নেমেছে শ্রমিকের ঢল। কয়েক দফায় কারখানা খোলা-বন্ধের সময় বারবার হুঁশিয়ারি দেওয়া হলেও এবারও সংক্রমণ রোধে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা মানা হয়নি। রবিবার সকাল থেকেই পোশাকশ্রমিকরা দল বেঁধে কাজে ফিরেছেন। দেশব্যাপী গণপরিবহন বন্ধ থাকলেও শ্রমিকদের কারখানায় নিয়ে আসার জন্য মালিকরা কোনো ধরনের পরিবহনের ব্যবস্থা করেননি। শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা কিংবা শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় কোনো বিশেষ উদ্যোগও নেওয়া হয়নি। বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ নেতারা কারখানা চালু করার বিষয়ে যেসব অঙ্গীকার করেছিলেন, সেসব যেমন মানা হয়নি, তেমনি তাদের পক্ষ থেকে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং প্রশাসনকে দেওয়া কারখানা খোলার শিডিউলও মানেননি অনেক কারখানার মালিক। এভাবে কারখানা খোলার কারণে শ্রমিকদের মধ্যে ব্যাপক হারে করোনা ছড়িয়ে পড়া এবং পুরো সমাজে করোনার ঝুঁকি আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।
বিজিএমইএ থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক সংগঠনটির সদস্যভুক্ত ২ হাজার ২৭৪টির মধ্যে রবিবার ৫০২টি কারখানা খুলেছে। এর মধ্যে রাজধানীতে ২৫, আশুলিয়া ও সাভারে ১২৯, নারায়ণগঞ্জে ১৮, গাজীপুরে ২৩৮ এবং চট্টগ্রামে ৯২টি। অন্যদিকে বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতি বিকেএমইএর সদস্যভুক্ত ৯৩৩টি কারখানার মধ্যে ১০৪টি খুলেছে। যদিও নির্দেশ ছিল শুধু নিটিং, ডায়িং ও গার্মেন্টসের স্যাম্পল সেকশন শুরু করার, তবে তা মানেনি অনেক কারখানা কর্তৃপক্ষ। কিন্তু বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ খুলে দেওয়া কারখানার যে সংখ্যা জানাচ্ছে বাস্তবে তার চেয়ে অনেক বেশি কারখানা খুলতে দেখা যাচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে গাজীপুরের কথা বলা যায়। বিজিএমইএর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে গাজীপুর জেলায় ২৩৮টি কারখানা খুলেছে। কিন্তু রবিবার গাজীপুরে ৪৩৮টি কারখানা খুলেছে বলে দাবি করেছে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন। কারখানা খোলা নিয়ে মালিক ও তাদের সংগঠনগুলোর এমন লুকোচুরি খেলা এবং স্বাস্থ্যবিধি না মানাসহ প্রশাসনকে দেওয়া অঙ্গীকার পূরণ না করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। একদিকে করোনার বিস্তার রোধে সরকারি সাধারণ ছুটি বাড়িয়ে দেশব্যাপী গণপরিবহন বন্ধ রাখা হচ্ছে, আরেক দিকে যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি না মেনে কারখানা খুলে দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে বস্তুতপক্ষে লকডাউন ব্যবস্থাই ভেঙে পড়ছে।
মালিকরা স্বাস্থ্যবিধি মেনে কারখানা খোলার যে দাবি করছেন, সেখানে তারা শুধু কারখানায় জীবাণুনাশক স্প্রে করা, শ্রমিকদের মাস্ক ও গ্লাভস পরে কাজ করার কথাই বলছেন। কিন্তু গত দুই দফার মতো এবারও কোনো ধরনের পরিবহনের ব্যবস্থা না করে হেঁটে এবং নানা পরিবহনে গাদাগাদি করে বিপুলসংখ্যক শ্রমিককে শিল্পাঞ্চলগুলোতে আসতে বাধ্য করার বিষয়ে তাদের বক্তব্য খুবই দায়িত্বজ্ঞানহীন। শ্রমিকরা সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, কারখানার সুপারভাইজার ফোন করে করে শ্রমিকদের কাজে যোগ দিতে আহ্বান জানানোয় চাকরি হারানোর ভয়েই তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হেঁটে, ট্রাকে, যে যেভাবে পারেন গ্রামের বাড়ি থেকে এসেছেন। এদিকে কারখানা খোলা নিয়ে শ্রমিক নেতাদের মধ্যেও ভিন্নমত দেখা গেছে। কেউ বলছেন, তৈরি পোশাক খাতের বাজার ধরে রাখতে কারখানা খুলে দেওয়া ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। কেউ বলছেন, কারখানা খোলায় কোনো সমস্যা নেই, কিন্তু স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত না করে কারখানা খোলা আত্মঘাতী। এ অবস্থায় খুলে দেওয়া কারখানাগুলোতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে কাজ করা এবং শ্রমিকদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা আবশ্যক।
পরিস্থিতি পর্যালোচনায় মনে হচ্ছে, সরকার লকডাউন ধীরে ধীরে শিথিল করে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চালুর চেষ্টা করছে। সরকারি সাধারণ ছুটি আগামী ৫ মে পর্যন্ত বাড়ানো হলেও রবিবারই খুলে দেওয়া হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর এবং ১৮টি মন্ত্রণালয়। এদিকে রমজান শুরুর পর রাজধানীতে খাবারের দোকানসহ পাড়া-মহল্লার দোকানপাট খোলা রাখার সময়সূচি দুই ঘণ্টা বাড়িয়ে সকাল ৬টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত করা হয়েছে। রাস্তাঘাটে মানুষজন ও যানবাহনের চলাচলও আগের চেয়ে অনেক বেশি বেড়েছে। মুশকিল হলো, করোনার সংক্রমণ ক্রমাগত বাড়ার এই সময়ে যদি সমাজে শারীরিক দূরত্ব ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা না হয় তাহলে সেটা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। কেননা এখনো দেশে করোনা শনাক্তের পরীক্ষার হার যেমন আশানুরূপভাবে বাড়ানো হয়নি, তেমনি হাসপাতালগুলোতে করোনার চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায়ও কোনো শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হতে দেখা যায়নি। এ অবস্থায় ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, চট্টগ্রামসহ শিল্পাঞ্চলগুলোতে তৈরি পোশাক কারখানাসহ অন্যান্য কল-কারখানা যেন দেশে করোনার আরও বিস্তারের কেন্দ্রে পরিণত না হয়, সে বিষয়ে বিশেষ মনোযোগ দেওয়া এখন কারখানা মালিক, মালিকদের সংগঠন ও সরকার সবারই দায়িত্ব।