মাইক ব্রিয়ারলি সব কিছুতেই ব্যতিক্রম। ক্যামব্রিজের সেন্ট জোন্স কলেজের বিখ্যাত সাবেকি, অথচ তার মধ্যে পান্ডিত্যের অহংকার নেই। অথচ নিজের যেকোনো একটা পরিচিতি সম্বল করে সেরাদের কাতারে বসতে পারেন।
তিনি ইংল্যান্ডের সর্বকালের সেরা অধিনায়ক। ‘আর্ট অব ক্যাপ্টেন্সি’ যারা পড়েছেন তারা একবাক্যে স্বীকার করেন জন মাইকেল ব্রিয়ারলি মহা ক্রিকেটতাত্ত্বিক। তিনি আবার মনোবিদও। ক্রিকেট থেকে অবসরের পর এমসিসির প্রেসিডেন্ট হয়েছেন। ব্রিটিশ সাইকোঅ্যানালিটিক্যাল সোসাইটির প্রেসিডেন্টশিপও সামলেছেন সমান দক্ষতায়।
এমন গুণী লোকটিই ব্যাটিং দক্ষতায় ছিলেন যাচ্ছেতাই। ইংল্যান্ডের হয়ে ৩৯ টেস্ট আর ২৫ ওয়ানডে খেলে কোনো সেঞ্চুরি করতে পারেননি। টেস্টে সর্বোচ্চ রান ৯১। ওয়াডেতে ৭১। যারা প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ব্রিয়ারলির ট্রিপল সেঞ্চুরি (৩১২*), ৪৫টা সেঞ্চুরি আর হাজার পঁচিশেক রানের পরিসংখ্যান নিয়ে তেড়ে আসবেন তাদের জন্য ওর ব্যাটিং গড় তুলে ধরছি। টেস্টে ২২.৮৮। ওয়ানডেতে ২৪.২৮। প্রথম শ্রেণিতে ৩৭.৮১। সেই আমলের (১৯৭৬-৮১) মানদ-ে যাচ্ছেতাই বলতে হবে। ব্রিয়ারলির দলের উইকেটকিপার অ্যালান নটের গড়ও (৩৭.৭৫) অনেক বেশি ছিল। কথিত আছে সিøপ ফিল্ডিং আর অধিনায়কত্ব করার জন্যই দলে সুযোগ পেতেন ব্রিয়ারলি। কলকাতায় গত বছর টাইগার পতৌদি স্মারক বক্তৃতা দিতে এসে নিজেকে নিয়ে মজা করে বলেছিলেন, ‘এখনো গর্ব হয় একটা ম্যাচে আমি নবাবের চেয়ে বেশি রান করেছিলাম। হোভের ভিলেজ ক্রিকেট ম্যাচে টাইগার খাতা খুলতে পারেনি। আমি করি ২ রান।’
মাইক ব্রিয়ারলি যত না ওপেনিং ব্যাটসম্যান (প্রথম টেস্টে উইন্ডিজের বিরুদ্ধে ওপেন করতে নেমে শূন্য রানে আউট হয়েছিলেন), তার চেয়ে অনেক অনেক গুণী অধিনায়ক। ৩৯ টেস্টে ইংল্যান্ডকে নেতৃত্ব দিয়ে জিতেছেন ১৭টিতে। হেরেছেন মাত্র চারটি। দলের ব্যাটিংয়ে তার প্রভাবশালী অংশগ্রহণ ছিল না। অথচ মগজটার জন্য তিনিই ছিলেন সবচেয়ে প্রভাবশালী। নিজেদের মতো করে টিম পারফরম্যান্সের আদর্শ ক্ষেত্র প্রস্তুত করতেন। ৮১’র অ্যাশেজ সিরিজ যার জ¦লন্ত উদাহরণ। নিজের ধুরন্ধর ক্যাপ্টেন্সি আর একজন ইয়ান বোথামকে দিয়ে বাজিমাত করেছিলেন।
এমন অর্জনের পরও নিস্পৃহ তিনি। অভিজাত ইংরেজসুলভ নিরাসক্তি নিয়ে পরে বলেছিলেন, ‘পেছনে ফিরে দেখলে কেমন যেন লাগে। অনেক কিছু ধূসর হয়ে গেছে। বড় ঘটনাগুলো মনে আছে, খুচরোগুলো মাথায় নেই। ৫০০ ম্যাচের মধ্যে ৩৯৯ বার এমন রোমাঞ্চকর কামব্যাক সম্ভব নয়। হেডিংলিতে যা হয়েছিল। আমার কাছে বোথামের অসাধারণত্ব ছাড়াও ব্যাখ্যা হলো অদৃষ্ট। সে ম্যাচে বোথাম যেমন মেরে খেলেছিল, একটা স্ট্রোক সামান্য এদিক ওদিক হতেই পারত। হয়নি যে, এটাই তো অদৃষ্ট।’
ড্রেসিংরুমে বোথামকে সামলানো কিন্তু সহজ ছিল না। ব্রিয়ারলি লিখেছিলেন, ‘ক্যারিয়ারের প্রথম তিন-চার বছর বোথাম বেস্ট ছিল। তার পর পিঠের ব্যথা। একসময় বেশি মুডি হয়ে গেল। ট্রেনিং করত না ঠিকমতো। ওজনও বেড়ে গেল।’ এর বেশি আর একটুও বলেননি পরিশীলিত ব্রিয়ারলি। এটা তার প্রাজ্ঞতা। কুলনেসও। ব্রিয়ারলি-বোথাম কম্বিনেশনে ভারসাম্য রাখার জন্য যা জরুরি ছিল। বোথামের আগুনে প্রতিভার মুখে লাগাম পরিয়ে মাঠে কার্যকর করে তোলার রহস্য প্রসঙ্গে একবার হেসে বলেছিলেন, ‘ওটা অনেকটাই মিথ। মিষ্টি কল্পনা মিশে গেছে।’
মাইক ব্রিয়ারলির ‘ক্যাপ্টেন্সি’ও একটা মিথ। সমালোচকরা বলেন, অস্ট্রেলিয়া গিয়ে ব্রিয়ারলি কখনো পূর্ণশক্তির অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে অ্যাশেজ জেতেননি। ভিভ রিচার্ডসের উইন্ডিজের বিরুদ্ধে ইংল্যান্ডকে নেতৃত্ব দেননি। কথাটা মিথ্যে নয়। তবে এটাও সত্যি এক বোথামকে নিয়ে তিনি ইংল্যান্ডকে যা ফিরিয়ে দিয়েছেন সেটাও অনেক।
চিরকালের ক্রিকেটতাত্ত্বিক হিসেবে এমসিসির কোচিং ম্যানুয়াল সংস্কারের কথা বলেছিলেন ব্রিয়ারলি। কিন্তু ভিত্তিটাকে বদলে দেওয়ার পক্ষে ছিলেন না। তার মন্তব্য ‘খেলাধুলা, গান-বাজনা, অভিনয় বিশ্বে সব কিছুর ইতিহাসেই একটা বেসিক টেকনিক বলে বস্তু আছে। আবার তার বাইরে সহজাত কাজকর্মেরও একটা বৃহৎ জগৎ আছে। যত ভালো প্লেয়ার দেখবেন, সবার মধ্যে দুটি জিনিসই থাকে। আপনার হয়তো শেবাগের গুডলেংথে পড়া একটা ডেলিভারিকে পা না নিয়ে মাঠের বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া দেখে মনে হতে পারে ম্যানুয়ালের কী দরকার। কিন্তু খুব ভালো করে খেয়াল করলে দেখবেন কিছু কিছু শর্ত ও রক্ষা করেছে। তবে এটা ঠিকই যে, ম্যানুয়ালটা সংশোধিত হলে ভালো হয়।’
সবশেষে তার ‘আর্ট অব ক্যাপ্টেন্সি’। ক্রিকেট স্ট্র্যাটেজির বাইবেল। এখানেও সংস্কারবাদী তিনি। একবার বলেছিলেন, ‘আমি বইটা এখন লিখলে নিশ্চয়ই কয়েকটা চ্যাপ্টার বেশি থাকত। ওয়ানডে আর টি-টোয়েন্টি ক্যাপ্টেন্সির ওপর। কিন্তু বইটা তো এই সময়ে লেখা নয়। পুরনো সময়ের ক্রিকেট অধিনায়কত্বের এক দলিল হিসেবে ওটা বেঁচে থাক।’
ক্রিকেট ইতিহাস ধূসর হবে। মাইক ব্রিয়ারলিও একদিন ম্যাপল পাতার মতো ঝরে পড়বেন পৃথিবীর বৃন্ত থেকে। তার ‘আর্ট অব ক্যাপ্টেন্সি’ কিন্তু রয়ে যাবে অনাগত ভবিষ্যতের জন্য।
আজ এই ক্রিকেট-মস্তিষ্কের ৭৮তম জন্মদিন।