কিছু ক্ষণজন্মা মানুষ সমাজকে কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছে দেওয়ার ব্রত নিয়ে নিরলস কাজ করে যান। প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হিসাব না কষে আজীবন চেষ্টা করে যান নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালন করে দেশ ও জাতিকে সমৃদ্ধ করার। জাতীয় অধ্যাপক ও প্রকৌশল-বিজ্ঞানী জামিলুর রেজা চৌধুরী ছিলেন এমনই এক মানুষ। তার দীর্ঘ কর্মময় জীবন ছিল বর্ণাঢ্য। তিনি শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করে একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করেছেন। তেমনি পুরকৌশল ও কাঠামো প্রকৌশলের গবেষণা থেকে শুরু করে দেশের সর্ববৃহৎ অবকাঠামোগুলোর নির্মাণযজ্ঞে সাফল্যের সঙ্গে নেতৃত্ব দিয়েছেন। আবার গণিত ও বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে কাজ করার পাশাপাশি মানুষকে পরিবেশ সচেতন করার সামাজিক দায়িত্বের মতোই জাতির ক্রান্তিকালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে রাজনৈতিক দায়িত্বও পালন করেছেন। অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরীর অনন্য বিশিষ্টতা এই যে, বৈচিত্র্যময় ও গুরুত্বপূর্ণ বহু জাতীয় দায়িত্ব পালন করেও তিনি সর্বদাই সর্বজনগ্রাহ্য ছিলেন। তার প্রয়াণে জাতি এক অনুসরণীয় সর্বজনগ্রাহ্য ব্যক্তিত্বকে হারাল।
১৯৪৩ সালে সিলেটের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন জামিলুর রেজা চৌধুরী। তার বাবা, ভাইসহ পরিবারের অনেক সদস্যই প্রকৌশলী ছিলেন। সম্ভবত সেই অনুপ্রেরণা থেকেই তিনিও প্রকৌশলী হয়ে ওঠেন। ১৯৫৭ সালে ঢাকার সেন্ট গ্রেগরিজ স্কুল থেকে ম্যাট্রিক এবং ১৯৫৯ সালে ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। তৎকালীন আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ বা বর্তমান বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৬৩ সালে তিনি প্রথম বিভাগে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করেন। ১৯৬৩ সালে বুয়েটে শিক্ষকতা শুরু করে ব্রিটেনে উচ্চশিক্ষা শেষে আবার বুয়েটে ফিরে আসেন। একপর্যায়ে বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্ব পালনের আমন্ত্রণ পেলেও তিনি মন দিয়েছিলেন মানসম্মত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলায়। ২০০০ সালের দিকে ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির জন্মলগ্নে তিনি উপাচার্যের দায়িত্ব নেন। পরে ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করেছেন আমৃত্যু। প্রকৌশল বিদ্যার নিরলস এ গবেষকের প্রায় ৭০টি গবেষণা প্রবন্ধ দেশ-বিদেশের খ্যাতনামা জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ একমাত্র বাংলাদেশি হিসেবে ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টার ইউনিভার্সিটি থেকে সম্মানসূচক ডক্টর অব ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রিতে ভূষিত হন জামিলুর রেজা চৌধুরী।
জামিলুর রেজা চৌধুরী পিএইচডি করেছেন বহুতল ভবন বিষয়ে। সিভিল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে প্রথম যুক্ত হন ঢাকায় শিল্পব্যাংক ভবন নির্মাণের সময়। স্বাধীনতার পর দেশের প্রায় সব বড় অবকাঠামো নির্মাণের সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন। বৃহৎ অবকাঠামো নির্মাণের বিষয়ে তার দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে পেরেছে দেশ। বঙ্গবন্ধু সেতু থেকে শুরু করে পদ্মা সেতু, ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, কর্ণফুলী টানেলসহ বেশ কয়েকটি মেগা প্রকল্পের উপদেষ্টা ও পরামর্শক হিসেবে বাংলাদেশ সরকারকে সহায়তা করেছেন অধ্যাপক চৌধুরী। বিভিন্ন সময়ে সরকারের পরিবর্তন হলেও তিনি যেমন কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শের দ্বারা কখনই প্রভাবিত হননি তেমনি সবসময়ই তিনি জাতীয় স্বার্থে কথা বলেছেন, পরামর্শ দিয়েছেন। এখনকার যুগে সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে এমন সব দায়িত্ব পালন করা এবং সব ধরনের বিতর্কের ঊর্ধ্বে থাকতে পারা যে অত্যন্ত বিরল তা সবাই স্বীকার করবেন। বিরল এ গুণের কারণেই তিনি সর্বজনগ্রাহ্য ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছিলেন। সম্ভবত সবার কাছে গ্রহণযোগ্যতা এবং এ দৃঢ় চরিত্রের কারণেই ১৯৯৬ সালে প্রয়াত সাবেক প্রধান বিচারপতি হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে রাজনৈতিক অঙ্গনেও দায়িত্ব পালন করতে হয়েছিল তাকে।
সমাজে গণিত ও বিজ্ঞানের চর্চা এগিয়ে নিতে আজীবন শিক্ষার্থীদের যেমন অনুপ্রাণিত করেছেন তেমনি এসব বিষয়ে বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করে গেছেন নামের আদ্যাক্ষর অনুসারে জে.আর.সি হিসেবে সমধিক পরিচিত অধ্যাপক চৌধুরী। তাই প্রকৌশলী সমাজকে নেতৃত্ব দিতে ইনস্টিটিউট অব ইঞ্জিনিয়ার্সের (আইইবি) সভাপতির দায়িত্ব পালনের মতোই তিনি বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটির সভাপতি, বাংলাদেশ আর্থকোয়েক সোসাইটি, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনেরও (বাপা) নেতৃত্ব দিয়েছেন। ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ যখন ইন্টারনেট জগতে প্রবেশ করে সেখানেও তথ্যপ্রযুক্তিবিদ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন তিনি। কাজের স্বীকৃতি এবং অবদানের জন্য দেশ-বিদেশে সমাদৃত জামিলুর রেজা চৌধুরী একুশে পদক, বাংলাদেশ ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউট স্বর্ণপদকসহ বহু পদক, পুরস্কার আর সম্মাননা পেয়েছেন। সুবক্তা, নিরহংকারী ও সদালাপী এ মানুষটি আজীবন স্বপ্ন ছড়িয়ে গেছেন। একবার এক গণিত উৎসবে তরুণদের তিনি বলেছিলেন, তার স্বপ্ন বাংলাদেশের আগামী প্রজন্মের কেউ পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন অথবা ফিজিওলজি/মেডিসিনে নোবেল পুরস্কার জিতবেন। আজীবন স্বাপ্নিক এ মানুষটি ৭৭ বছর বয়সে গতকাল মঙ্গলবার পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করলেন। তার মৃত্যুতে জাতি এক নিষ্ঠাবান মেধাবী সন্তানকে হারাল। কিন্তু তিনি যে কর্মজীবন আর স্বপ্ন রেখে গেছেন সেটা অনুধাবন ও অনুসরণ করলে একদিন হয়তো তার অপূর্ণ স্বপ্ন পূরণে আজকের প্রজন্ম সফল হবে।