সাংবাদিক ও গণমাধ্যম শিল্পের সুরক্ষা জরুরি

করোনা দুর্যোগে যে পেশাজীবীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি নিয়ে নিরলসভাবে জরুরি সেবা দিয়ে যাচ্ছেন সাংবাদিকরা তাদের অন্যতম। চিকিৎসক-নার্স-স্বাস্থ্যকর্মী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরই এ দুর্যোগে সম্মুখসমরের যোদ্ধা সাংবাদিকরা। সাধারণ ছুটি ও লকডাউন পরিস্থিতির মধ্যেও সারা দেশ থেকে সংবাদ সংগ্রহ ও প্রচারের মধ্য দিয়ে সচেতনতা সৃষ্টি করে করোনার বিস্তার রোধে জনমত সৃষ্টি করা, জরুরি ত্রাণ সহায়তা কার্যক্রম তুলে ধরা এবং করোনা চিকিৎসার নানা দিক ও সংকটগুলো তুলে ধরার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন সাংবাদিকরা। বিশ্বজুড়েই করোনাকালে সাংবাদিকতার এ ভূমিকার কথা আলোচিত ও প্রশংসিত হচ্ছে। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো, পেশাগত দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের সুরক্ষায় যেমন বিশেষ উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না, তেমনি সাংবাদিক ও সামগ্রিকভাবে গণমাধ্যম শিল্পের সুরক্ষাতেও কোনো সরকারি প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে না। অথচ করোনাকালে মানুষের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা দূর করতে আতঙ্ক ছড়ানো গুজব ও বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণার বিপরীতে বস্তুনিষ্ঠ তথ্য ও সংবাদ প্রচারে সাংবাদিকরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। এ পরিস্থিতিতে সাংবাদিক ও তাদের পরিবারের সদস্যরা উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন।

মঙ্গলবার রাজধানীতে করোনায় আক্রান্ত হয়ে দেশে প্রথম এক সাংবাদিকের মৃত্যুতে সাংবাদিকতার অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। সঙ্গে বেড়েছে উদ্বেগ। দৈনিক সময়ের আলোর নগর সম্পাদক হুমায়ুন কবীর খোকন মঙ্গলবার রাতে তীব্র শ্বাসকষ্ট নিয়ে হাসপাতালে ভর্তির ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই মারা যান। পরে নমুনা পরীক্ষায় তার দেহে করোনাভাইরাস সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। দেশে এখন পর্যন্ত বেশ কয়েকটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল এবং দৈনিক পত্রিকার সাংবাদিক ও তাদের পরিবারের সদস্যরা করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হয়েছেন। কয়েকজন এরই মধ্যে সুস্থও হয়ে উঠেছেন। কিন্তু করোনাকালে সংবাদকর্মীদের ব্যক্তিগত সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য যে ধরনের প্রস্তুতি ও উদ্যোগের প্রয়োজন ছিল অনেক ক্ষেত্রেই সেটা নিশ্চিত করা যায়নি। কিছু সংবাদমাধ্যম কর্মীদের বাড়ি থেকে কাজ করার সুযোগ করে দিলেও অনেক প্রতিষ্ঠানই তা করতে পারেনি। তেমনি মাঠের কাজে নিয়োজিতদের ব্যক্তিগত সুরক্ষা পোশাকও নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। উভয় ক্ষেত্রেই বিনিয়োগেরও প্রয়োজন। করোনার কারণে সংবাদমাধ্যম শিল্পে যে মহাআর্থিক বিপর্যয় নেমে এসেছে সেটাও এ ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলেছে।

করোনার কারণে বিশ্বের অন্যান্য অনেক দেশের মতোই দেশের গণমাধ্যম শিল্প মারাত্মক সংকটে পড়েছে। বাংলাদেশেও ঢাকা থেকে প্রকাশিত অন্তত আটটি জাতীয় দৈনিকের মুদ্রিত সংস্করণ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। টিভি চ্যানেলগুলোও অশনিসংকেত দেখছে। শিল্প কারখানাগুলো বন্ধ থাকা এবং সামগ্রিক অর্থনীতির সংকটের নেতিবাচক প্রভাব সরাসরি পড়েছে এ শিল্পে। ছাপা পত্রিকার কাটতি কমেছে। বিজ্ঞাপনও প্রায় বন্ধ হয়ে এসেছে। বিপুলসংখ্যক সংবাদকর্মী ও সংবাদ বিপণনকর্মী তথা হকার এ কারণে বড় ধরনের সংকটে পড়েছেন। গণমাধ্যম শিল্পের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখে এ সংকট থেকে উত্তরণের জন্য তথ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করে বিশেষ সরকারি প্রণোদনার দাবি জানিয়েছিলেন সম্পাদক ও এ শিল্পের নেতারা। কিন্তু দুঃখজনক হলেও এটাই সত্য যে, নিউজ পেপারস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (নোয়াব), সম্পাদক পরিষদ ও অ্যাসোসিয়েশন অব টেলিভিশন চ্যানেল ওনার্স (অ্যাটকো) ও এডিটরস গিল্ড বাংলাদেশের নেতাদের সেই আবেদনে সাড়া দিয়ে কোনো সরকারি প্রণোদনার ঘোষণা আসেনি। রপ্তানিমুখী খাতসহ ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বৃহৎ শিল্পের জন্য সরকার ৯৫ হাজার ৬১৯ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করলেও সংবাদমাধ্যম শিল্পের জন্য কোনো বরাদ্দই দেওয়া হয়নি।

সরকার ইতিমধ্যেই ঘোষণা করেছে যে, দায়িত্ব পালনকালে সরকারি চাকুরেরা যদি কেউ করোনায় আক্রান্ত হন, তাহলে পদমর্যাদা অনুযায়ী প্রত্যেকের জন্য থাকছে ৫ থেকে ১০ লাখ টাকার স্বাস্থ্যবীমা। আর কেউ মারা গেলে বীমার পরিমাণ ৫ গুণ বৃদ্ধি করে ৫০ লাখ টাকা দেওয়া হবে। কিন্তু করোনাসহ যেকোনো দুর্যোগে সম্মুখসারিতে থাকা সাংবাদিকদের জন্য কোনোরকম বীমা কিংবা প্রণোদনার ঘোষণা দেয়নি সরকার। এমনিতেই সংকটে থাকা গণমাধ্যম শিল্প করোনার অর্থনৈতিক অভিঘাতে ভয়াবহ বিপর্যয়ে পড়েছে। নিয়মিত আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেক সংবাদ প্রতিষ্ঠানই ইতিমধ্যে কর্মীদের বেতনভাতা দেওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। এ অবস্থায় একদিকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সংবাদ সংগ্রহ ও প্রচারের দায়িত্ব পালন করা, আরেকদিকে নিয়মিত বেতনভাতা না পাওয়ার অর্থনৈতিক দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন সংবাদকর্মীরা। কোনো কোনো শিল্পে শ্রমিকদের বেতনভাতা দেওয়ার জন্যও সরকার সহায়তা দিচ্ছে। কিন্তু এ ক্ষেত্রেও সংবাদমাধ্যম কর্মীরা বঞ্চিত। এমন সংকটকালে সাংবাদিকদের ব্যক্তিগত সুরক্ষা এবং গণমাধ্যম শিল্প রক্ষায় আপদকালীন বিশেষ প্রণোদনা দেওয়ার যৌক্তিক দাবির বিষয়ে সরকারের জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত।