জাফরুল্লাহ চৌধুরী মানুষের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাবেন না তা হয় না

সেই ছোটবেলায় পড়েছিলাম, যে দেশে গুণীর কদর হয় না, সে দেশে গুণীর জন্ম হয় না। যেদেশে বীর, দেশপ্রেমিকের কদর হয় না, সে দেশে দেশপ্রেমিক বীরের জন্ম হয় না। আমরাও কি এ দেশে আর কোনো গুণী, দেশপ্রেমিক কিংবা বীরের জন্ম হতে দেব না। কথাটা অনেক দিন থেকেই ঘুরপাক খাচ্ছে মনে। আজ হঠাৎ এক সাংবাদিক ছোট ভাইয়ের লেখাটা পরেই মনে হলো, এই প্রসঙ্গে কিছু বলা প্রয়োজন।

আজ সমগ্র বিশ্বে কোভিড-১৯ এর যে মহামারি সেটি থেকে পরিত্রাণের পথ হিসেবে বিশেষজ্ঞদের মত হচ্ছে আক্রান্ত এলাকাগুলোকে একেবারে আইসোলেট করে ফেলা বা সামাজিক মেলামেশা বন্ধ রাখা যেন নতুন করে একজন আক্রান্ত হতে না পারে। দ্বিতীয়টি হচ্ছে আক্রান্তদের চিকিৎসা দেওয়া। আর চিকিৎসা করতে হলে প্রথমে জানা প্রয়োজন রোগী করোনায় আক্রান্ত হয়েছে কি না সেটা পরীক্ষা করা। কিন্তু মাত্র চার মাস বয়সের নতুন ধরনের এ ভাইরাসটি মানব শরীরে প্রবেশ করেছে কি না সেটি পরীক্ষা করার পর্যাপ্ত পদ্ধতি আজও বিশ্বে আবিষ্কার না হওয়ায় এ পরীক্ষা পদ্ধতিতেও যেমন নানা রকম জটিলতা রয়েছে, তেমনি প্রতিটি দেশেই কিটের অপর্যাপ্ততা রয়েছে। বিশ্বের উন্নত দেশগুলো দিনরাত গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে করোনার ওষুধ, ভ্যাকসিন আবিষ্কারসহ করোনা শনাক্তকরণ প্রক্রিয়ার সহজ ব্যবহার উপযোগী, সাশ্রয়ী ও নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি আবিষ্কারের লক্ষ্যে।

এমন একটি পরিস্থিতিতে গণস্বাস্থ্যের আবিষ্কৃত কিট বিশ্ববাসীসহ বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে একটি আশার সঞ্চার করেছে। কিন্তু ১৮ কোটি মানুষের প্রত্যাশিত এই কিট ও রাজনীতি আর স্বাস্থ্য খাতের অসাধু সিন্ডিকেটের চাপে এখন মুখ থুবড়ে পড়ার উপক্রম হয়েছে। অনবরত নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে গণস্বাস্থ্যের প্রতিষ্ঠাতা ড. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর এই করোনার কিট প্রজেক্টটিকে। এটাকে নিয়ে এখন শুরু হয়েছে নোংরা রাজনীতি।

যেখানে বিশ্বের উন্নত সব দেশে করোনা পরীক্ষার কিটের অভাব রয়েছে। সেখানে আমাদের মতো একটি রাষ্ট্রের এ ধরনের আবিষ্কার হতে পারে দেশের জন্য একটি অনেক বড় অর্জন। কোটি মানুষের প্রাণ রক্ষা করা এই আবিষ্কার ড. জাফরুল্লাহ চৌধুরী তার সহকর্মীবৃন্দ, তার প্রতিষ্ঠান ও দেশকে পৌঁছে দিতে পারে সম্মানের সুউচ্চ শিখরে। কিন্তু আমাদের দেশে কেন যেন সম্মানীর সম্মান দেওয়া হয় না। সেই উচ্চতায় কাউকে পৌঁছতেই দেওয়া হয় না যে উচ্চতায় পৌঁছালে মানুষ হয় সর্বজন শ্রদ্ধেয়, অনুকরণীয়।

যে দেশে গুণীর কদর হয় না, সে দেশে গুণীর জন্ম হয় না। যে দেশে বীরের কদর হয় না সে দেশে বীরের জন্ম হয় না। এ দেশের দেশপ্রেমিক, শ্রেষ্ঠত্বের কোটা কি তবে কুক্ষিগত হয়ে গেছে? আমরা কি এ দেশে আর কোনো গুণী মানুষের জন্ম হতে দেব না!!

করোনা পরীক্ষা একটি প্রচলিত পদ্ধতি হচ্ছে পিসিআর টেস্ট। যেটিতে আক্রান্ত হওয়ার প্রথম দিকেই করোনা শনাক্ত করা সম্ভব। তবে তা প্রচণ্ড ব্যয়বহুল উপরন্তু পর্যাপ্ত কিটও নেই। ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী ও গণস্বাস্থ্যের ড. বিজন কুমার শীলের নেতৃত্বে ড. নিহাদ আদনান, ড. মোহাম্মদ রাঈদ জমিরউদ্দিন এবং ড. ফিরোজ আহমেদের উদ্ভাবিত পদ্ধতি হচ্ছে অ্যান্টিবডি টেস্ট, যেটার সাহায্যে উপসর্গ শুরুর সাত দিন পর এই পরীক্ষা সম্ভব। এই পরীক্ষায় আইজিএম অথবা আইজিজি আছে কি না দেখা যায়‌। আইজিএম পজিটিভ মানে, ওই ব্যক্তির শরীরে অতি সম্প্রতি ৬/৭ দিনের মধ্যে করোনাভাইরাস বাসা বেঁধেছে। অন্য দিকে আইজিজি পজিটিভ মানে, ওই ব্যক্তির শরীরে ভাইরাসের উপস্থিতি ছিল ৩-৪ সপ্তাহ আগে।

আক্রান্ত হওয়ার ছয় দিনের মধ্যে মানুষের শরীর নিজে থেকেই একটি অ্যান্টিবডি তৈরি করে যেটিকে আইজিজিএম বলা হয়। এই আইজিজিএম এর মাধ্যমেই ব্যক্তি করোনা পজিটিভ কি না বোঝা যাবে। এবং যদি আইজিজি ডেভেলপ করে যায় তখন বোঝা যাবে আক্রান্তের শরীরে করোনার অ্যান্টিবডি তৈরি হয়ে গেছে। এবং যাদের শরীরে এই আইজিজি তৈরি হয়ে যায় তাদের রক্তের প্লাজমা দিয়ে আক্রান্ত রোগীর শরীরে দেওয়ার মাধ্যমে ইরানে খুব ভালো ফল পাচ্ছে। দু’দিন আগে বাংলাদেশের এক ডাক্তারের শরীর থেকে এই প্লাজমা সংগ্রহ করা হয়েছে এই পরীক্ষা শুরু করা জন্য। যা বলছিলাম। বিশ্বে অনেক দেশই নিজে থেকে এই মহামারি মোকাবিলায় অ্যান্টিবডির মাধ্যমে করোনা পরীক্ষা করছে। আমাদের পাশের দেশ ভারতেও এই টেস্ট চালু করেছে।

কিটের অভাবে যেখানে করোনা পরীক্ষা করা যাচ্ছে না সেখানে কেবল একটি স্বার্থান্বেষী মহলের কারণে। একজন জাফরুল্লাহ চৌধুরী ১৮ কোটি মানুষের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাবেন না এটা বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। বীর মুক্তিযোদ্ধা, ডা. জাফরুল্লাহ চাওয়া পাওয়ার কী আছে? যার শরীরের দুটো কিডনি ডায়ালাইসিস করে বেঁচে থেকেও, নিজের স্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যে ফেলেও দেশের জন্য করোনার কিট আবিষ্কারে কাজ করে যাচ্ছেন।

ডা. জাফরুল্লাহকে নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক করলেও সত্যটা হচ্ছে দেশে-বিদেশে কোথাও তার নিজস্ব এক চিলতে জমি, এমনকি কোনো ফ্ল্যাটও নেই। পৈতৃক সূত্রে পাওয়া জমি-জমা বোনকে দান করেছেন। মরণোত্তর দেহদান করায় কবরের জন্যও তার প্রয়োজন হবে না কোনো কাপড়, বা জমি। অথচ কী আশ্চর্য তার বিরুদ্ধেই বর্তমান সরকারের আমলে রাজনৈতিক কারণে ভূমি দখল, মাছ চুরির অভিযোগ তোলা হয়েছে। ড. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর গণস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠা হয়েছিল আওয়ামী লীগ সরকারের সময়। তার প্রতিষ্ঠিত গণবিশ্ববিদ্যালয়ে এক সময় অধ্যাপনা করতেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর স্বামী, প্রয়াত বিজ্ঞানী ড. ওয়াজেদ মিয়া। অথচ আওয়ামী লীগের সরকারের আমলেই গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র, গণবিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি ‘অলিখিত’ বিদ্বেষ চলছে কতিপয় স্বার্থান্বেষী মহলের কারণে। কাজেই ড. জাফরুল্লাহ চৌধুরী করোনার কিট উদ্ভাবন কোনো ব্যবসায়িক বা ব্যক্তি স্বার্থে করেনি। দেশের জনগণের স্বার্থে করছেন। অতএব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করব, একবার দেশের কথা দেশের জনগণের কথা ভেবে কাজ করুন। পৃথিবীসহ আমরা সবাই আজ কোভিড-১৯’র কারণে ভয়াবহ বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। এখন ভেদাভেদ, স্বজনপ্রীতি আর রাজনীতির সময় নয়। এখন সময় মানবতার পাশে দাঁড়ানোর।

লেখক: বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য।