অদ্ভুত শৃঙ্খলার গ্যাঁড়াকলে পুঁজিবাজার

মার্চ মাসের ২৬ তারিখ থেকে সারা দেশে অঘোষিত লকডাউন শুরু হওয়ার পর থেকেই দেশের পুঁজিবাজার বন্ধ রাখা হয়েছে। ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ এশিয়াসহ সারা বিশ্ব কভিড-১৯-এর প্রকোপে নাকাল হলেও এবং অনেক দেশের বহু এলাকা লকডাউন করা হলেও একমাত্র দ্বীপদেশ শ্রীলঙ্কা ছাড়া পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে পুঁজিবাজার এভাবে বন্ধ করে রাখা হয়নি। আমাদের দেশে এই ছুটির মধ্যেও ব্যাংক সীমিতভাবে চালু রাখা হয়েছে, কাঁচাবাজার, মুদির দোকান, ওষুধের দোকান খোলা রাখা হয়েছে। কারণ, এগুলো বন্ধ করা হলে জীবন অচল হয়ে পড়বে; কভিড-১৯-এ সংক্রমিত হওয়ার আগে মানুষ না খেয়ে মারা যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দেবে। কিন্তু এখানে পুঁজিবাজার এই আবশ্যকীয় সেবার মধ্যে পড়ে নাই, যদিও পুঁজি বাজারের পণ্য টাকার মতোই তরল এবং এর লেনদেন সম্পন্ন হয় ডিজিটালি, শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখেই। ফলে পুঁজিবাজারে ছোট-বড়, দেশি-বিদেশি সব বিনিয়োগকারীর মধ্যে এক চরম হতাশা বিরাজ করছে এবং বাজার টেকসই থাকবে কি না এ নিয়ে তাদের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। অবশ্য বাজার বন্ধ করার অব্যবহিত আগে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) বাজারের ধস থামাতে উদ্ভট কায়দায় যেভাবে ফ্লোর প্রাইস নির্ধারণ করার ব্যবস্থা নিয়েছে, তাতে বাজার খুললেও হাতেগোনা দু-চারটি ছাড়া বাদবাকি অন্য কোনো ‘স্ক্রিপ’ আদৌ কেনাবেচা হবে কি না সে বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। একটা ইংরেজি দৈনিকে দেখলাম, শেষ দিন ২৫ মার্চ ৩৪৩টি স্ক্রিপের মধ্যে ২৩৬টির কোনো ক্রেতা ছিল না, যার মধ্যে ব্র্যাক ব্যাংক, স্কয়ার ফার্মা, অলিম্পিক ও জিপির মতো ‘ব্লু-চিপস’ও রয়েছে।

আমার বাবা নিরক্ষর হলেও ছিলেন অক্লান্ত পরিশ্রমী ও স্বশিক্ষিত এক কৃষক। শুধু এই পরিশ্রমের গুণে তিনি আমাদের লালন-পালনের পরও পৈতৃক সূত্রে প্রাপ্ত জমিজমা তিন গুণে উন্নীত করতে সমর্থ হন। কিন্তু এই জমি ক্রয় করতে গিয়ে অসংখ্যবার ভেজালে পড়ে তিনি বহু অর্থ জলে ফেলেন; এক জমি একাধিকবার ক্রয়ে টাকা গচ্চা দেন, যার সাক্ষী আমি নিজে। আমাকে দিয়ে উদ্ভট ভাষায় লিখিত ওইসব দলিলপত্র অনেকটা জোর করেই পড়াতেন। এরপর থেকে জমির প্রতি আমার এক প্রচণ্ড বিতৃষ্ণা জন্মে। সে কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় টিউশনির বদৌলতে হাতে অল্পস্বল্প কিছু টাকা এলে বন্ধুরা যেখানে জমির খোঁজ করত, আমি সেখানে প্রাইমারি মার্কেট থেকে শেয়ার কিনতাম। তখন ছিল কাগজের শেয়ার, যেগুলো কেনা, ওঠানো ও বিক্রি করার জন্য বেশ দৌড়াদৌড়ি করতে হতো; এখনকার মতো এত সহজ ছিল না। তবে জমিজমার তুলনায় তা ছিল শতভাগ ভেজালমুক্ত। লাভ-লোকসান যাই হোক, তারল্য ছিল এর প্রধান গুণ; যখন প্রয়োজন তখনই ক্যাশ করা যেত। তারল্য যে কি জিনিস, তা টের পেয়েছিলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষের দিনগুলোতে। অনার্স পরীক্ষা এবং বিসিএস পরীক্ষা পিঠাপিঠি হওয়ায় টিউশনি ছেড়ে দিয়ে শুধু পড়াশোনায় মনোযোগী হতে বাড়িতে পত্র পাঠিয়েছিলাম তিন-চার মাসের খরচ পাঠাতে। আমার অসুস্থ বাবা মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরে তার জমি বিক্রি করে আমার জন্য সময়মতো টাকা পাঠাতে পারেননি। সচ্ছল হলেও স্বল্প মেয়াদে তারল্যের অভাবে প্রয়োজন মেটাতে তিনি ছিলেন অক্ষম। তাই চড়া সুদে ধার করে তিনি আমার জন্য টাকা পাঠান।

কভিড-১৯ আসার আগেও দেশের পুঁজিবাজারের অবস্থা নাজুক ছিল। যদিও এর জন্য এই কমিশনের নেতৃত্বে বাজারে নিয়ে আসা বিপুল পরিমাণ নিম্নমানের স্ক্রিপকেই অনেকে দায়ী করে থাকেন। এ ছাড়া ২০১৯ সালের জানুয়ারি মাস থেকে শেয়ারবাজারের সূচক ক্রমবর্ধমান হারে পয়েন্ট হারাচ্ছিল। করোনাকালে এসে তা এক্কেবারে তলানিতে নেমে যায়; রোগীর যেমন যখন-তখন অবস্থা হয়, সে রকম। তখন বিএসইসি ত্রাণকর্তা সেজে অকস্মাৎ আজব ও জটিল এক প্রক্রিয়ায় সব স্ক্রিপের ফ্লোর প্রাইস নির্ধারণ করে দেয়। ফলে যেদিন এই অদ্ভুত ব্যবস্থাটি প্রবর্তিত হয়, সেদিন লেনদেন হয় শুধু দিনের শেষ আধা ঘণ্টা। এরপর বন্ধ হওয়ার আগে সপ্তাহখানেক বাজার চালু থাকলেও দৈনিক লেনদেনের পরিমাণ ছিল যৎসামান্য। আর শেষের দিনের অবস্থা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। এখন বাজার সম্পূর্ণ আইসোলেশনে থাকায় তার প্রকৃত অবস্থা কী, তা আদৌ ঠাহর করা যাচ্ছে না, তবে এটা যে এখন ভাইরাসের মতো ‘জড় ও জীবের মাঝামাঝি’তে অবস্থান নিয়েছে, তা অনুমান করা যায়। বাজার খুললেই তার প্রকাশ ঘটবে।

সেকেন্ডারি মার্কেটে স্ক্রিপের ফ্লোর প্রাইস নির্ধারণের পেছনে কোনো যৌক্তিকতা থাকতে পারে না। এ ধরনের পণ্যের ক্ষেত্রে কোনো দেশে ফ্লোর প্রাইস আছে বলেও আমাদের জানা নেই। ফ্লোর প্রাইস নির্ধারণ করা হয় সাধারণত কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রে, যার উদ্দেশ্য থাকে বৃহত্তর স্বার্থে ওই পণ্যের উৎপাদন বাড়ানো এবং ফসল কাটার সময় সরবরাহ-প্রাচুর্যে পণ্য-মূল্যের মৌসুমভিত্তিক যে অধোগতি ঘটে, তার বিপরীতে উৎপাদনকারীদের প্রণোদনামূলক মূল্য প্রদান নিশ্চিত করা। পাশের দেশ ভারতে দেশের প্রয়োজনে নানা ধরনের কৃষিপণ্য উৎপাদনে উৎসাহ দেওয়ার জন্য Commission for Agricultural Costs and Prices রয়েছে। তারা গবেষণা ও অনুধ্যান করে চাহিদা ও সরবরাহের নিরিখে বছরভিত্তিক চাষাবাদ শুরুর আগেই পণ্যওয়ারি Minimum Support Price (MSP) ঘোষণার সুপারিশ করে। ফ্লোর প্রাইসের অর্থ হলো পণ্যের বাজারদর যতই কমে যাক না কেন, সরকার ওই দরে উৎপাদনকারীর কাছ থেকে পণ্য কিনে নিতে বাধ্য। ফলে উৎপাদনকারীর লোকসান গুনতে হয় না। এখন বিএসইসি যে ফ্লোর প্রাইস নির্ধারণ করেছে, সে প্রাইসে ক্রেতা না পাওয়া গেলে বিক্রেতা কী করবে? তার তো টাকার দরকার; এই লকডাউন অবস্থায় নগদ টাকার প্রয়োজন আরও বেশি। এজন্য দর নির্ধারণ করে দিলে সেই দরে অফার করা সব স্ক্রিপ কিনে নেওয়া আবশ্যকীয় শর্ত। অন্যথা বিক্রেতা শেয়ারবাজারে মূল্য হারানোর চেয়েও অন্যত্র বড় ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারেন। বিএসইসি এই সুড়ঙ্গের এক মুখ বন্ধ করে দিয়েছে; যারা সুড়ঙ্গের পথে বের হতে রওনা দিয়েছে, তাদের কী হবে, সে প্রশ্নের উত্তর তাদেরই দিতে হবে।

বিএসইসির কাজকর্ম দেখে প্রখ্যাত লেখক, রাজনীতিবিদ ও সাংবাদিক আবুল মনসুর আহমদের উদ্ধৃত একটি কৌতুক মনে পড়ে যায়। গ্রামের একদল শ্রমিক মাটি কাটার কাজে ব্যস্ত। হঠাৎ মাটির ভেতর থেকে দুটি তালের আঁটি বেরিয়ে পড়ে। কিন্তু দীর্ঘদিন মাটির মধ্যে থেকে সে আঁটি দুইটার রং, দাঁড়ি, আকার ও আয়তনে অনেক পরিবর্তন আসায় তারা কেউই জিনিসটাকে চিনতে পারছিলেন না। কিন্তু তাদের প্রচণ্ড কৌতূহল। এজন্য গ্রামের মহাজ্ঞানী মোড়লের শরণাপন্ন হন। মোড়ল জিনিস দুটি দেখে প্রথমে হেসে ফেলেন, পরে কেঁদে ওঠেন এবং পরিশেষে আবার হেসে ফেলেন। শ্রমিকরা মোড়লের হাসি, কান্না এবং আবার হাসির গূঢ় রহস্য খুলে বলতে বলেন। মোড়ল জানান প্রথম হাসির কারণ এই সামান্য বিষয়টি সম্পর্কে তার দীনহীন অনুসারীরা কোনো জ্ঞান রাখেন না, তাই দেখে। কান্নার কারণ তিনি মারা গেলে তার এই দুর্ভাগা অনুসারীদের অবস্থা কী দাঁড়াবে, তা চিন্তা করে। আর শেষ হাসির কারণ হলো বিষয়টি যে কী, তা তিনি নিজেও জানেন না। বিএসইসি কি এখন নিজের ব্যর্থতা ঢাকার জন্য এই হাসি-কান্না-হাসির চক্রে ঘুরপাক খেতে নানারূপ আনকা কাজকর্ম করে যাচ্ছে? এই কিছুদিন আগেও তো রাস্তায় নেমে প্রতিবাদকারী ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের তারা পুলিশ দিয়ে ঠেঙিয়ে জানান দিয়েছিলেন, ওঠানামা পুঁজিবাজারের ধর্ম, জোর করে তা কমানো-বাড়ানো যাবে না। আজকে আবার সেই ধর্ম ফেলে দিয়ে উল্টো রথে চড়ে বসা কেন?

আমার এক প্রাক্তন সহকর্মী কয়েকটি শেয়ারে তার সঞ্চয়ের কিছু অর্থ বিনিয়োগ করেছিলেন। এখনকার অবরুদ্ধ পরিস্থিতিতে টানাটানির মধ্যে পড়ায় তিনি সেগুলো বিক্রি করে দিয়ে জীবন বাঁচাতে চান। লোকসান হয় হবে, জীবন তো আগে। প্রয়োজনের সময় সম্পদ কাজে না লাগলে তা পরে যতই অর্থ বয়ে আনুক না কেন, তা অর্থহীন। কিন্তু বাজার বন্ধ থাকায় তিনি সেগুলো ক্যাশ করতে পারছেন না। আবার সামনে বাজার খুললেও যে বিক্রি করতে পারবেন, তার কোনো গ্যারান্টি নেই ফ্লোর প্রাইসের কল্যাণে। কারণ, ওই মূল্যের নিচে কোনো লেনদেন গ্রহণযোগ্য নয়। ফ্লোর প্রাইসের মধ্যে কোনো গ্রাহক না পেলে তাকে আমার বাবার মতো কারও কাছ থেকে ধার নিয়ে চলতে হবে। কিন্তু এই লকডাউন পরিস্থিতিতে তিনি কার কাছে যাবেন ধার নিতে? তার এখনকার এই অসহায়ত্বের দায়ভার কার? এমন তরল শেয়ারগুলোকে এক কলমের খোঁচায় যারা কঠিন করে বাজারকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে এসেছেন, তাদের কি কোনো দায় নেই? আমার প্রশ্ন দেশে প্রতিযোগিতা আইন বহাল থাকা অবস্থায় বাণিজ্যিক ভিত্তিতে বিনিময়যোগ্য সম্পূর্ণ ঝুঁকিযুক্ত কোনো আর্থিক পণ্যের ফ্লোর প্রাইস নির্ধারণ করার ক্ষমতা কমিশনের আছে কি না এবং এটা করার পর যদি কোনো পক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে কর্তৃত্বপূর্ণ অবস্থানে থেকে এ ধরনের প্রতিযোগিতার স্পিরিটবিরোধী কাজের জন্য বর্তমান বিএসইসিকে এর দায়ভার নিতে হবে কি না? যদি না হয়, তবে বুঝতে হবে যে, বিএসইসি ১৭৬৫ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কর্র্তৃক বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার দেওয়ানি লাভের মতো দায়িত্বহীন ক্ষমতা ভোগ করছেন। অনাবৃষ্টি ও কোম্পানির এই দায়িত্বহীন ক্ষমতা ভোগের কারণে সৃষ্ট ছিয়াত্তরের মন্বন্তরে বাংলার এক-তৃতীয়াংশ লোক প্রাণ হারায়। আমরা আশা করব পুঁজি বাজারে এ রকম বড় কোনো বিপর্যয় আসার আগেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়গুলো বিবেচনা করে দ্রুত প্রতিবিধানের ব্যবস্থা নেবেন।

লেখক

খাদ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক

rulhanpasha@gmail.com