করোনাযুদ্ধে পুলিশের সুরক্ষা জরুরি

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে সাধারণ ছুটি ঘোষণা ও সব ধরনের গণপরিবহন বন্ধের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া লকডাউন পরিস্থিতির শুরু থেকেই মাঠে সক্রিয় রয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ। গত এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চলতে থাকা এই পরিস্থিতিতে মানুষজনকে ঘরে রাখা, সময়সূচি অনুসারে দোকানপাট ও বাজার চালু রাখা, রাস্তাঘাট-পাড়া-মহল্লায় অপ্রয়োজনে মানুষের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে পুলিশ। এ সময়ে সারা দেশে খাদ্য ও নিত্যপণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখা এবং বিভিন্ন জরুরি সেবা চালু রাখার ক্ষেত্রেও পুলিশ বাহিনীর সহায়ক ভূমিকা দেখা গেছে। ত্রাণ বিতরণে সহায়তা এবং প্রয়োজনে রোগীদের হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়া কিংবা মৃতদের দাফন করার ক্ষেত্রেও সক্রিয় পুলিশ। কিন্তু শহর-নগর-বন্দরের জনবসতিতে সামাজিক পরিসরে করোনার বড় আকারের সংক্রমণ ঠেকাতে এসব কার্যক্রম পরিচালনা করতে গিয়ে পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা নিজেরাই বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েছেন।  বিগত কয়েক দিনে করোনায় আক্রান্ত হয়ে কয়েকজন পুলিশ সদস্যের মৃত্যু এবং বিপুলসংখ্যক পুলিশের করোনা শনাক্ত হওয়ায় এ নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। একই সঙ্গে সামনে চলে এসেছে করোনাঝুঁকি মোকাবিলায় পুলিশের পর্যাপ্ত সুরক্ষা নিশ্চিত করার তাগিদ।       

করোনাভাইরাস থেকে কভিড-১৯ রোগে আক্রান্ত হয়ে শনিবার আরও এক পুলিশ সদস্য মারা যান। এ নিয়ে গত চার দিনে পাঁচ পুলিশ সদস্যের মৃত্যু হলো। শনিবার মারা যান পুলিশের এসআই সুলতানুল আরেফিন। আগের দিন শুক্রবার সকালে ঢাকায় মারা যান এসআই নাজির উদ্দীন। এর আগে এএসআই আবদুল খালেক, ট্রাফিক কনস্টেবল আশেক মাহমুদ ও কনস্টেবল জসিম উদ্দিনও করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান। এ পর্যন্ত যে পাঁচ পুলিশ সদস্য মারা গেলেন তারা সবাই ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ বা ডিএমপির সদস্য। এদিকে, পুলিশ বাহিনীতে শনিবার পর্যন্ত করোনাভাইরাসে সংক্রমিত সদস্যের মোট সংখ্যা ৭৪১ জনে পৌঁছে গেছে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যানুসারে শনিবার পর্যন্ত সারা দেশে পুলিশের ১ হাজার ২৫০ সদস্যকে কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে। আইসোলেশনে আছেন ১৭৪ জন। আর করোনায় সংক্রমিতদের মধ্যে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে উঠেছেন ৫৭ পুলিশ সদস্য। পুলিশ সদর দপ্তরের অপারেশন শাখার তথ্যে দেখা গেছে, করোনায় আক্রান্ত ইউনিটগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পুলিশ সদস্য করোনায় সংক্রমিত হয়েছেন ঢাকা মহানগরে।  সেখানে প্রতিদিনই কেউ না কেউ সংক্রমিত হচ্ছেন।

পরিস্থিতি পর্যালোচনায় দেখা যাচ্ছে, করোনা প্রতিরোধের লড়াইয়ে চিকিৎসক-নার্স-স্বাস্থ্যকর্মীদের পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন পুলিশ সদস্যরা। করোনার প্রাদুর্ভাব শুরুর পর দেশে ফিরে নিখোঁজ থাকা বিপুলসংখ্যক প্রবাসীর অবস্থান শনাক্ত করার জন্য সারা দেশে অভিযানে নামে পুলিশ। কিন্তু শুরুর দিকে পুলিশ সদস্যদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় তেমন কোনো প্রস্তুতি ছিল না। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এভাবে লকডাউন এলাকায় লোকজনের চলাচল নিয়ন্ত্রণ, করোনা আক্রান্ত অলিগলিতে টহল ডিউটি, সড়কে জীবাণুনাশক ছিটানো, ত্রাণ বিতরণ, ত্রাণ বিতরণে বিভিন্ন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে সহায়তা, রোগীদের হাসপাতালে পৌঁছানোসহ করোনা আক্রান্ত রোগীর দাফনে অংশ নিতে গিয়ে পুলিশ সদস্যরা করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। এ ছাড়া ব্যারাকের সদস্যরা আক্রান্ত হয়েছেন কমিউনিটি ট্রান্সমিশনের মাধ্যম। অর্থাৎ সরাসরি করোনা সংক্রমিত ব্যক্তির সংস্পর্শ এবং সামাজিক পর্যায় থেকে সংক্রমণ দুই ক্ষেত্রেই ঝুঁকিতে রয়েছেন পুলিশ সদস্যরা। তাই দায়িত্ব পালন করার সময় পুলিশ সদস্যদের জন্য পর্যাপ্ত সুরক্ষা সরঞ্জাম নিশ্চিত করা এখন জরুরি হয়ে পড়েছে।

করোনা প্রতিরোধের লড়াইয়ে মাঠে থেকে সাহসিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করার ক্ষেত্রে পুলিশ বাহিনীর এই সম্মুখযোদ্ধার ভূমিকা এরই মধ্যে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক পরিসরে প্রশংসিত হয়েছে। করোনাকালে অনেক হতাশার মধ্যে এটা খুবই আশাব্যঞ্জক যে, স্বাভাবিক সময়ে সাধারণত পুলিশবিমুখ সাধারণ মানুষও করোনাকালে তাদের বিপদ-আপদে পুলিশের শরণাপন্ন হচ্ছে এবং সহায়তা পাচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে পুলিশের যে জনঘনিষ্ঠতা ও পেশাদারিত্ব দেখা যাচ্ছে তা আগামীতেও ধরে রাখতে সচেষ্ট থাকতে হবে পুলিশকে। সর্বশেষ পরিস্থিতিতে সরকারি-বেসরকারি অফিসের সাধারণ ছুটির মেয়াদ সাপ্তাহিক ছুটি মিলিয়ে আগামী ১৬ মে পর্যন্ত বাড়ানো হতে পারে বলে জানা গেছে। আগামী দিনগুলোতেও লকডাউন পরিস্থিতি কার্যকর রাখা এবং রোজায় ত্রাণ ও জাকাত-ফিতরা বিতরণ এবং ঈদকেন্দ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশের সক্রিয়তা জরুরি। করোনা প্রতিরোধে ভূমিকা রাখা সরকারি চাকুরেদের জন্য সরকার যে প্রণোদনা, স্বাস্থ্যবীমা ও ক্ষতিপূরণের ঘোষণা দিয়েছে তা উৎসাহ জোগাবে বটে। কিন্তু পুলিশ সদস্যরা যাতে ঝুঁকিমুক্ত থেকে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে পারেন সেজন্য প্রয়োজনীয় সুরক্ষা নিশ্চিত করা বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে।