৫০ লাখ পরিবার পাবে নগদ অর্থ

৫০ লাখ দরিদ্র পরিবারকে নগদ সহায়তা দেবে সরকার। প্রতি মাসে সর্বোচ্চ ২ হাজার টাকা পর্যন্ত এ সহায়তা দেওয়া হতে পারে। আগামীকাল সোমবারের মধ্যে এ-সংক্রান্ত তালিকা তৈরির কাজ শেষ করার নির্দেশনা দেওয়া হলেও আগামী সপ্তাহের আগে এ কাজ শেষ হবে না বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। তবে চলতি মাস থেকেই তারা এই টাকা হাতে পাবেন। সুবিধাভোগী প্রত্যেককেই কিউআর (কুইক রেসপন্স) কোডযুক্ত কার্ড দেওয়া হবে। যাতে করে সহজেই এক কর্মসূচির সহায়তাভোগী অন্য কর্মসূচির সহায়তা পেতে না পারেন। 

করোনাভাইরাসের কারণে দেশের শত শত পেশাজীবীর কাজ বন্ধ হয়ে গেছে। তাদের পক্ষে পরিবারের দৈনন্দিন চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। দেশের অনেক স্থানে তারা সহায়তার জন্য ধরনা দিচ্ছেন। আবার অনেকে সহায়তার জন্য হাত পাততে লজ্জাও পাচ্ছেন। এসব পেশাজীবীকে নগদ সহায়তা কর্মসূচির আওতায় আনা হচ্ছে। এসব পেশাজীবীর মধ্যে রয়েছে দিনমজুর, রিকশাচালক, ভ্যানচালক, নির্মাণশ্রমিক, কৃষিশ্রমিক, দোকানের কর্মচারী, ব্যক্তি উদ্যোগে পরিচালিত বিভিন্ন ব্যবসায় কর্মরত শ্রমিক, পোলট্রি খামারের শ্রমিক, বাস-ট্রাকের পরিবহন শ্রমিক ও হকারসহ নানা পেশার মানুষ।  

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব শাহ কামাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, মোট ১ কোটি ২৫ লাখ পরিবারের তালিকা হচ্ছে। এর মধ্যে কিছু তালিকা করাই আছে। আর কিছু নতুন করে করা হচ্ছে। এরমধ্যে ৫০ লাখ পরিবার পাবে রিলিফ বা নগদ সহায়তা। ৫০ লাখ পরিবার পাবে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির সহায়তা। ১০ লাখ ৪০ হাজার পরিবার পাবে ভিজিডি সহায়তা। ৪ লাখ ১৯ হাজার মৎসজীবী সহায়তা পাবে। ১০ লাখ ৪১ হাজার পাবে ওএমএস সহায়তা। খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির সুবিধা যারা নিচ্ছেন তারা রিলিফ বা নগদ সহায়তা পাবেন না। দুস্থ ৫০ লাখ পরিবার আসবে নগদ সহায়তার আওতায়। এই সহায়তা ১ হাজার হবে না কি ২ হাজার হবে তার সিদ্ধান্ত নেবেন প্রধানমন্ত্রী। আগামী ৪ মের মধ্যে তালিকাটি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে হস্তান্তর করার কথা। আমরা একটা সফটওয়্যার করে দিয়েছি। প্রতিটি ইউনিয়নে কম-বেশি ৫ হাজার মানুষের তালিকা হবে। সংশ্লিষ্ট কমিটি ঠিক করবে এই পাঁচ হাজারের মধ্যে কারা ভিজিডি পাবে, কারা মৎসজীবী কর্মসূচিতে যাবে, কারা খাদ্যবান্ধবের আওতায় যাবে বা কারা নগদ সহায়তা পাবে। করোনাভাইরাস আসার পর আমরা একটা কমিটি করে দিয়েছি কোন লোকগুলো রিলিফের উপযুক্ত তাদের চিহ্নিত  করার জন্য। প্রত্যেককে কিউআর (কুইক রেসপন্স) কোডযুক্ত কার্ড দেওয়া হবে। এই কার্ডে তার ডিটেইলস থাকবে। বিভিন্ন কর্মসূচির আলাদা রঙের কার্ড থাকবে। এক কর্মসূচির কার্ড দিয়ে অন্য কর্মসূচির সুবিধা নেওয়া যাবে না। এতে করে ডুপ্লিকেশন এড়ানো যাবে।

এক প্রশ্নের জবাবে সিনিয়র সচিব আরও বলেন, এখন একটা লোক ভিজিডির চাল নেয়। সে চালটা পাশে রেখে ওএমএসের লাইনে দাঁড়িয়ে যায়। আবার কোথাও খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির সুবিধা পায়। একজন তিন-চার কর্মসূচির ভেতরে ঢুকে পড়েছে। আবার কিছুলোক লজ্জায় সামনে যায় না। এটা যেন না হয়। তাদের বিভিন্ন কর্মসূচিতে ভাগ করে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধা দেওয়া হবে। ১ কোটি ২৫ লাখ পরিবার মানে হচ্ছে পরিবার পিছু ৪ জন করে ধরা হলে ৫ কোটি মানুষ, ৫ জন করে হলে সোয়া ৬ কোটি মানুষ সুবিধা ভোগ করবেন। পিতামাতার ভরণপোষণ আইন অনুযায়ী পিতা-মাতাকেও ধরতে হবে। সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর সুবিধাভোগীদের প্রকৃত সংখ্যাটাও আমরা বের করে আনতে চাচ্ছি। অনেকে বলেন, ভিন্ন রাজনৈতিক দল করার কারণে তারা পান না বা আগে কর্মজীবী থাকার কারণে তাদের দেওয়া হয় না। এই কিউআর কার্ড করা হলে কারা পায় আর কারা পায় না তা সহজেই খুঁজে বের করা যাবে। চিহ্নিত করে বলে দেওয়া হবে এরা পাবে খাদ্যবান্ধব, এরা পাবে রিলিফ, এরা পাবে ভিজিডি। যারা টাকা দিয়ে কিনে খাওয়ার ক্ষমতা আছে তারা তো আর রিলিফ নেবে না।    

গার্মেন্টকর্মীরা এর মধ্যে আসবে কি না জানতে চাইলে সিনিয়র সচিব বলেন, তারা তো বেতনই পাচ্ছেন।

গত প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে সুবিধাভোগীদের তালিকা তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। ঢাকা বিভাগে এ তালিকা তৈরির কাজ তদারকি করছেন ঢাকার বিভাগীয় কমিশনার। তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সহায়তায় ইতিমধ্যে টাঙ্গাইল জেলায় একটা মডেল দাঁড় করানো হয়েছে। সেই মডেল অনুসরণ করেই তালিকা তৈরির কাজ এগিয়ে চলছে। তালিকাভুক্তদের মাসে দুই হাজার টাকা করে নগদ সহায়তা দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কিন্তু টাকার পরিমাণ নিয়ে বিতর্ক থাকায় বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী প্রায় ৭৫০ কোটি টাকা এ খাতে থোক বরাদ্দ দেবেন বলে জানা গেছে। অর্থমন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, এ খাতে মন্ত্রণালয় ১ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেবে।

ঢাকার বিভাগীয় কমিশনার মো. মোস্তাফিজুর রহমান গত শুক্রবার রাতে দেশ রূপান্তরকে বলেন, এই তালিকা শুধু ঢাকায় না সারা দেশেই হচ্ছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে যাদের মানবিক সহায়তা দেওয়া দরকার তাদের জন্য এ তালিকা করা হচ্ছে। প্রথমে একটা এক্সেল সিট করা হবে। সেন্ট্রালি একটা সফটওয়্যার করা হবে। সেখান থেকে সারা দেশের সুবিধাভোগীদের বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাবে। ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে জানা যাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি অন্য কোনো সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সহায়তা পাচ্ছে কি না। চলতি মে মাসেই এ কর্মসূচি চালু করা হবে।

আগামী ৪ মের মধ্যে তালিকা তৈরির কাজ শেষ হবে কি না জানতে চাইলে বিভাগীয় কমিশনার বলেন, বিষয়টি একটু চ্যালেঞ্জিং। কারণ ফর্মে অনেকগুলো তথ্য দিতে হয়।

এদেশের জাতীয় পরিচয়পত্র হরদম নকল হচ্ছে। এসব নকল পরিচয়পত্র ব্যবহার করে পাসপোর্টও হচ্ছে। এই অবস্থায় কিউআর কার্ড নকল এড়ানোর জন্য কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা আসলে মানুষটাকে বাছাই করছি। মানবিক দৃষ্টি থেকে কাজটা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির যদি জাতীয় পরিচয়পত্র নাও থাকে তাদের চাল বা অন্যান্য সুবিধা দিতে কোনো বাধা নেই।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ৫০ লাখ পরিবারভিত্তিক মানবিক সহায়তা কার্ড করা হচ্ছে। এসব কার্ডে ১২টি তথ্য লিপিবদ্ধ করতে হয়। পরিবার প্রধানের নাম, পিতা বা স্বামীর নাম, জন্ম তারিখ, বয়স, লিঙ্গ, পেশা, জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্ম নিবন্ধন নম্বর, মোবাইল নম্বর, পরিবারের সদস্য সংখ্যার (পুরুষ, মহিলা, হিজড়া, শিশু প্রতিবন্ধী আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়েছে) তথ্য নেওয়া হচ্ছে। পূর্বে কোনো সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় থাকলে তার নাম, বর্তমান ঠিকানা এবং স্থায়ী ঠিকানাও সংগ্রহ করা হচ্ছে।

টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক মো. শহীদুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, তালিকা করা হচ্ছে ওয়ার্ডভিত্তিক। যারা কোনো ধরনের সামাজিক সুবিধার আওতায় নেই তাদের তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। পরে সেসব নাম একটা সফটওয়্যারে সংরক্ষণ করা হবে। এর মাধমে এসব নাম যেকোনো জায়গা থেকে দেখা যাবে বা জানা যাবে কারা সব সুবিধাভোগ করছেন। 

কোনো কোনো জেলায় তালিকা তৈরির কাজ এগিয়ে চললেও অনেক জেলায় এখনো শুরু হয়নি। তৃণমূল পর্যায়েও এই কাজ শুরু হয়নি। জামালপুরের জেলা প্রশাসক এনামুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমাদের রেশন কার্ড প্রদানের একটি তালিকা তৈরির কথা বলা হয়েছিল। আমরা অনেকটা নিরপেক্ষভাবে এক লাখ লোকের তালিকা করতে সক্ষম হয়েছি। তবে নগদ টাকা প্রদান সংক্রান্ত কোনো তালিকা তৈরির নির্দেশনা এখনো পাইনি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে শেরপুর পৌরসভা ৯নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আমির হোসাইন বাদশা দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমি রেশন কার্ড সংক্রান্ত তালিকা চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া প্রায় শেষ করেছি। কিন্তু নগদ টাকা প্রদান করা হবে, এই সংক্রান্ত নতুন তালিকা তৈরির কোনো নির্দেশনা প্রশাসন থেকে আসেনি।

করোনা পরিস্থিতির কারণে গার্মেন্টস খাতে ইতিমধ্যে প্রায় ৩০ হাজার শ্রমিক চাকরিচ্যুত হয়েছেন। এসব শ্রমিকের অনেকে মাইলের পর মাইল হেঁটে কারখানায় কাজে যোগ দেওয়ার জন্য ঢাকায় এসেছিলেন। কিন্তু কারখানায় এসে ছাঁটাই হয়েছেন বলে জানতে পেরেছেন। এর বাইরেও বেতন হচ্ছে না বা লে-অফের শিকার হয়েছেন আরও লক্ষাধিক শ্রমিক। তাদের অনেকে বকেয়া বেতনের জন্য করোনোভাইরাসকে উপেক্ষা করে আন্দোলন করছেন। সরকারের নগদ অর্থ সহায়তা দেওয়ার তালিকায় এসব কর্মীকে যুক্ত করা উচিত বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এ বিষয়ে জানতে চাইলে পরিকল্পনা মন্ত্রী এমএ মান্নান দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী কার্যালয় থেকে এই তালিকা তৈরির ব্যাপারে তদারকি করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে মাঠ পর্যায়ের স্থানীয় সরকার কাঠামোকে কাজে লাগানো হবে। এ তালিকায় হত-দরিদ্ররা যেন স্থান পায় এ বিষয়ে বিশেষ নজর দেওয়া হবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, গার্মেন্টস মালিকরা বলেছিল, প্রণোদনা পেলে তারা কোনো শ্রমিক ছাঁটাই করবে না। কিন্তু এখন শোনা যাচ্ছে, তারা সে কথা রাখছে না। বিষয়টি খুবই দুঃখজনক। এখন নগদ টাকা দেওয়ার যে কর্মসূচি নেওয়া হচ্ছে, এখানে চাকরিচ্যুত গার্মেন্টকর্মীদের যুক্ত করা যেতে পারে। এজন্য ওই শ্রমিকদের গ্রামের বাড়ি বা স্থায়ী ঠিকানার স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। চাকরি চলে গেছে এমন তথ্য দিয়ে তারা আবেদন করলে অবশ্যই যুক্ত হতে পারবে। যুক্ত করাও উচিত।

এ বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সদস্য ড. শামসুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, এই তালিকায় অবশ্যই হতদরিদ্ররা স্থান পাবে। যারা করোনার কারণে আয় রোজগার করতে পারছে না, কিন্তু কোথাও থেকে সহায়তাও পাচ্ছে না। এরা যেকোনো খাতের শ্রমিক কর্মচারী হতে পরে।

জানতে চাইলে তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক ও উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিজিএমইএ সভাপতি ড. রুবানা হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিজিএমইএ সদস্যভুক্ত কারখানার প্রায় সবাই বেতন পরিশোধ করেছেন। ব্যতিক্রম সব জায়গায়ই থাকে। তবে বাস্তবতার নিরিখেই অনেক শ্রমিক কষ্টে আছেন। কারণ বিজিএমইএ সদস্যভুক্ত নয়, এমন কারখানার সংখ্যাও নেহায়েত কম নয়। আবার অনেক কারখানা লে-অফ করেছে, ছাঁটাইও হয়েছে। এটা অস্বীকার করা যাবে না। এজন্য প্রধানমন্ত্রীর যে উদ্যোগ এখানে পোশাকশ্রমিকদের যুক্ত করা উচিত।