ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নওগাঁ-২ আসনের সাংসদ শহীদুজ্জামান সরকার করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পর অন্য সাংসদদের ভেতরেও উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে। ত্রাণ কার্যক্রম নিয়ে তাদের অনেকেই তৎপর থাকলেও শহীদুজ্জামান সরকার আক্রান্ত হওয়ার খবরে অন্য সাংসদরা এখন ঘরমুখী থাকতে শুরু করেছেন। স্ত্রী-সন্তানসহ পরিবারের অন্যদের নিরাপদে রাখতে তারা বাড়তি সতর্কতা নিতে শুরু করেছেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বেশির ভাগ মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও সাংসদ এখন ঢাকার বাসায় আছেন। যারা এলাকায় আছেন তারাও গত দুদিনে ঘরের বাইরে বের হননি।
কয়েকজন সাংসদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, শহীদুজ্জামান আক্রান্ত হওয়ার পর তাদের ওপর পারিবারিক চাপ বেড়েছে। ঘরের বাইরে বের হতে গেলে পারিবারিক চাপে পড়তে হচ্ছে। তবে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা থাকলেও জনপ্রতিনিধি হিসেবে তাদের ঘরে বসে থাকার সুযোগ নেই। তাহলে স্থানীয় জনগণ সেবাবঞ্চিত হবে। নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ সাহসহারা হয়ে পড়বে।
শহীদুজ্জামানের সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে সংসদের হুইপ, আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও জয়পুরহাট-২ আসনের সাংসদ আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন দেশ রূপান্তরকে বলেন, শহীদুজ্জামান সরকার কালকের চেয়ে আজ ভালো আছেন। তিনি আইসোলেশনে আছেন। সবার থেকে বিচ্ছিন্ন। ন্যাম ভবনের বাসায় চিকিৎসা নিচ্ছেন। ভবন লকডাউন করা হবে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, সেটির দরকার নেই। তিনি পরিবার, পরিজন সবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছেন। ডাক্তারের ব্যবস্থাপত্র নিয়মিত নিচ্ছেন এবং সে হিসেবে চলছেন। স্বপন বলেন, এর আগেও আমাদের একজন সাংসদের স্ত্রী করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন এবং সুস্থ হয়ে গেছেন। অন্য সাংসদদের মাঝে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা সৃষ্টি হয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, একজন সহকর্মী আক্রান্ত হয়েছেন স্বভাবতই সেটি থাকবে। কিন্তু এর মানে এই নয় যে ঘরে বসে যেতে হবে। সাবধানতা অবলম্বন করে কাজ করে যেতে হবে।
একাধিকবার নির্বাচিত ও জাতীয় সংসদের সদস্য শহীদুজ্জামান সরকার দেশ রূপান্তরকে বলেন, শুক্রবার নমুনা পরীক্ষার রিপোর্ট হাতে পেয়ে নিশ্চিত হই আমি করোনাভাইরাস পজিটিভি। তিনি তার সুস্থতার জন্য সবার কাছে দোয়া চেয়েছেন। নওগাঁ জেলার এই সাংসদ গত ২৮ এপ্রিল তার নির্বাচনী এলাকা থেকে ঢাকায় আসেন। এরপর করোনার উপসর্গ দেখা দিলে নমুনা পরীক্ষা করতে দেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী শহীদুজ্জামান সরকারের শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর নিয়েছেন। স্বাস্থ্যবিধি মেনে আইসোলেশনে থাকতে শহীদুজ্জামান সরকারকে নির্দেশ দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী তাকে অভয় দিয়েছেন।
আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য ও শেরপুর-২ আসনের সাংসদ মতিয়া চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, উদ্বেগ থাকবে, থাকবে উৎকণ্ঠা; তবুও আমরা জনপ্রতিনিধিদের চলতে হবে। কাজ করতে হবে। জনপ্রতিনিধিরা ঘরে বসে থাকলে জনগণেরই কষ্ট হবে। শহীদুজ্জামান সরকারের আশু আরোগ্য কামনা করে প্রবীণ এই সাংসদ বলেন, আমাদের স্বাস্থ্যবিধি মেনে সতর্কতা অবলম্বন করে কাজ করতে হবে।
আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক সম্পাদক ও নেত্রকোনা-৩ আসনের সাংসদ অসীম কুমার উকিল দেশ রূপান্তরকে বলেন, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা তো থাকেই। তিনি বলেন, তারপরও আমরা যেহেতু নেতা, জনপ্রতিনিধি, তাই আমাদের হাত গুটিয়ে বসে থাকলে চলবে না। তিনি বলেন, একজন সাংসদ আক্রান্ত হওয়ার পর একটু আতঙ্ক সৃষ্টি হয় এটা স্বাভাবিক। কিন্তু আমরা যদি হাত গুটিয়ে আতঙ্কে ঘরে বসে থাকি তাহলে জনসাধারণ সেবা থেকে বঞ্চিত হবে। জনগণের কথা চিন্তা করে আমাদের ঘরে বসে থাকার উপায় নেই। অসীম কুমার উকিল বলেন, বাড়তি সতর্কতা, সাবধানতা অবলম্বন করে কাজ করতে হবে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের সাংসদ ফরহাদ হোসেন সংগ্রাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, একজন সহকর্মী শহীদুজ্জামান সরকার করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ায় স্বভাবতই আমরা উদ্বিগ্ন। তিনি বলেন, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা থাকলেও জনপ্রতিনিধি হিসেবে আমাদের ঘরে বসে থাকার সুযোগ কম। আমরা সক্রিয় না থাকলে ডিসি, এসপিসহ অন্যরা সচল থাকবে না। জনসাধারণ ও নেতাকর্মীরা সাহসহারা হয়ে পড়বে। এতে করে জনগণ সেবাবঞ্চিত হবে।
নওগাঁ-২ আসনের সাংসদ শহীদুজ্জামান সরকার করোনাভাইরাস (কভিড-১৯) আক্রান্ত হওয়ার পর নওগাঁ-৬ আসনের সাংসদ ইসরাফিল আলম, নওগাঁ-৩ আসনের সাংসদ ছলিম উদ্দিন তরফদার, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুল মালেক, জেলা প্রশাসক হারুন-অর-রশীদ, পুলিশ সুপার প্রকৌশলী আবদুল মান্নান ও সিভিল সার্জন ডা. আ. ম. আখতারুজ্জামান কোয়ারেন্টাইনে আছেন। এ ছাড়া কভিড-১৯ আক্রান্ত সাংসদের নির্বাচনী এলাকা পত্নীতলা-ধামইরহাট উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তাসহ অন্যান্য কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতাদের কোয়ারেন্টাইনে থাকার অনুরোধ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ।
নওগাঁ জেলা সিভিল সার্জন ডা. আ. ম. আখতারুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ২৭ এপ্রিল জেলা প্রশাসকের কার্যলয়ের সম্মেলন কক্ষে প্রধানমন্ত্রীর ভিডিও কনফারেন্সে নওগাঁ-২ আসনের সাংসদ শহীদুজ্জামান সরকার উপস্থিত ছিলেন। ওই ভিডিও কনফারেন্সে থাকা জেলার দুই সাংসদ, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার ও সিভিল সার্জন কোয়ারেন্টাইনে আছেন। এ ছাড়া সাংসদ শহীদুজ্জামান সরকার ২১ এপ্রিল থেকে তার নির্বাচনী এলাকা পত্নীতলা-ধামইরহাট উপজেলায় অবস্থানকালে তার সঙ্গে থাকা উপজেলা নির্বাহী ও অন্যান্য কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতা যারা তার সংস্পর্শে এসেছিলেন তাদের চিহ্নিত করে কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করা হচ্ছে এবং তাদের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য প্রেরণ করা হবে বলে জানান সিভিল সার্জন।
(প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন আমাদের নওগাঁ প্রতিনিধি)