স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় মন্ত্রী জাহিদ মালেক জানিয়েছেন, করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে পোশাক কারখানা খোলা রাখা যাবে। তবে কর্মরত শ্রমিকদের জন্য আলাদা কোয়ারেন্টাইনের ব্যবস্থা রাখতে হবে। গতকাল রবিবার সচিবালয়ে মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে ‘করোনায় শিল্প ও ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান খোলা রাখা’ বিষয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় তিনি এ কথা জানান।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, গ্রাম থেকে ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে আসা কর্মজীবী মানুষের তালিকা করা হবে। নিজ নিজ জেলা প্রশাসনকে ওই তালিকা দেওয়া হবে। করোনাভাইরাস সংক্রমণের মধ্যে তারা ফিরে গেলে বাড়ি লকডাউন করা হবে। আর তাকে নিয়ে যাওয়া হবে কোয়ারেন্টাইনে। কর্মস্থলে অসুস্থ হলে বা উপসর্গ দেখা দিলে তাদের থাকতে হবে আইসোলেশন ও কোয়ারেন্টাইনে। শিল্প কারখানার মালিকরাই শ্রমিকদের কোয়ারেন্টাইনের ব্যবস্থা করবেন।
সভায় পোশাক শিল্প খাত সংশ্লিষ্ট নেতারা স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে করোনার এই সময়ে কারখানা খোলা রাখার পক্ষে বিভিন্ন যুক্তি তুলে ধরেন। এ সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘স্বাস্থ্যবিধি বজায় রেখে তৈরি পোশাক কারখানাগুলো খোলা রাখা যাবে। দেশের মানুষের জীবন ও জীবিকা দুটোই ঠিক রাখতে হবে। তৈরি পোশাক শিল্প খাত দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে আমরা আন্তর্জাতিক বাজারে অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে যাব। অন্যদিকে করোনার এই দুঃসময়ে মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষারও উদ্যোগ নিতে হবে। তাই একদিকে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে হবে, অন্যদিকে স্বাস্থ্যবিধিও মানতে হবে।’
জাহিদ মালেক বলেন, ‘পোশাক শিল্প খাতের প্রতিনিধি, শ্রমিক প্রতিনিধি ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি মিলে একটি যৌথ কমিটি করার নির্দেশনা দেওয়ার পাশাপাশি শ্রমিকদের থাকা, খাওয়া ও যাতায়াতে আলাদা ব্যবস্থা রাখা, শ্রমিকদের টেস্টিং সুবিধা বাড়াতে হবে। করোনায় কোনো কারখানায় বেশি মানুষ আক্রান্ত হলে ওই কারখানা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হবে। আর কোনো শ্রমিক আক্রান্ত হলে যাতে ভোগান্তিতে না পড়ে, সেজন্য শিল্প মালিকদের আলাদা কোয়ারেন্টাইন ব্যবস্থা রাখতে হবে।
সভায় অন্যানের মধ্যে বিকেএমইএর সভাপতি সেলিম ওসমান এমপি, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সচিব মোস্তফা কামাল উদ্দিন, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব আসাদুল ইসলাম, পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ, বিএমএ সভাপতি মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন, শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব, বাণিজ্য সচিব, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব, বিজিএমইএ সভাপতি রুবানা হক, স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের সভাপতি প্রফেসর ইকবাল আর্সলান, ঢাকা চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি শামস মাহমুদ, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক প্রফেসর আবুল কালাম আজাদসহ বিভিন্ন শিল্প সংস্থার নেতা এবং স্বাস্থ্য খাত ও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বক্তব্য রাখেন।
শ্রমিকরা কারখানায় ফিরলে করোনার তিন ‘হটস্পট’ ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, ‘একবার যারা ভেতরে চলে আসছে; ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরে চলে আসছে, তাদের এখানেই থাকতে হবে। যে পর্যন্ত লকডাউন পিরিয়ড থাকবে বা যতক্ষণ পর্যন্ত সংক্রমণ না কমবে বা একটা পিরিয়ড নির্ধারিত হবে, সেই পিরিয়ড পর্যন্ত তাদের ওই এলাকাতেই থাকতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা তাদের বের হওয়ার জন্য বারণ করব। এবং কেউ যদি কোনো কারণে চলে যায়, আমরা সব জেলায় নির্দেশনা দিচ্ছি তালিকা তৈরি করার জন্য। কারা গার্মেন্টস বা অন্যান্য শিল্পে কাজ করতে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ কিংবা অন্যান্য জায়গায় এসেছে তাদের তালিকা রাখবে নিজ নিজ জেলা। কেউ যদি ফেরত যায়া তাকে কোয়ারেন্টাইনে নিয়ে যাবে এবং বাড়ি লকডাউন করে দেবে। এই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, শ্রমিকরা যেখানে কাজ করবেন সেখানে মিনিমাম যাতে একটা স্পেস মেইনটেন করে কাজ করেন। তাদের পরিবহনটা যাতে সঠিক হয়। পরিবহনের মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়। তাদের (শ্রমিক) থাকার জায়গা, খাওয়ার জায়গা এগুলোর বিষয়ে যেন তারা গুরুত্ব দেন। একই সঙ্গে তাদের কোয়ারেন্টাইন সেন্টার করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। শ্রমিকরা আক্রান্ত হলে যাতে কোয়ারেন্টাইন সেন্টারে রাখা হয় সেই ব্যবস্থা যেন তারা করেন।
পোশাক কারখানা অধ্যুষিত ওই তিন এলাকায় মালিকদের করোনা পরীক্ষার সুযোগ তৈরি করার জন্য বলা হয়েছে জানিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘টেস্টের দরকার হলে তারা যাতে বেশি করে টেস্ট করতে পারেন। এ বিষয়টি তারা প্রতিপালন করবেন। সবচেয়ে বড় যে সিদ্ধান্ত হয়েছে সেটা হলো, শিল্প বিশেষ করে পোশাকশ্রমিকদের স্বাস্থ্যের দিকটা মনিটর করার জন্য একটি কমিটি করা। ফোকাল পয়েন্ট তৈরি করা। বিভিন্ন সাব-কমিটি করা।’
সভায় স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব আসাদুল ইসলাম বলেন, ‘ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর সংক্রমণের জন্য হটস্পট, সেখানে সংক্রমণ বেশি হয়েছে। কীভাবে আমরা এ স্থানগুলোকে আলাদা করে রাখতে পারি, স্বাস্থ্য নির্দেশিকা যাতে সবাই মেনে চলতে পারে। একইভাবে যদি তারা (শ্রমিক) সংক্রমিত হয়; তাদের কীভাবে আইসোলেট করে থাকতে হবে, যারা আইসোলেশন সেন্টার করবে কর্র্তৃপক্ষ তার জন্য হাসপাতাল নির্ধারণ করবে।
সচিব আরও বলেন, ‘বিজিএমইএ, বিকেএমইএসহ সবাই আন্তরিক, তাদের স্বার্থেই সংক্রমণ মিনিমাইজ করতে হবে। সংক্রমণমুক্ত রাখতে হবে তাদের ফ্যাক্টরির স্বার্থেই। সেই চেষ্টায় তারা আরও বাড়তি ব্যবস্থা নেবে।’