নিখোঁজ সাংবাদিক কাজলের সন্ধান মিলল বেনাপোলে

নিখোঁজ সাংবাদিক শফিকুল ইসলাম কাজলকে যশোরের বেনাপোলের সাদিপুর সীমান্ত থেকে ‘আটক’ করার পর গতকাল রবিবার আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। এর প্রতিক্রিয়ায় কাজলের স্ত্রী জুলিয়া ফেরদৌস নয়ন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তাকে পাওয়া গেছে এটাই বড় কথা। আলহামদুলিল্লাহ। বিস্তারিত বলতে পারছি না। আমার ছেলের সঙ্গে কথা বলেন। সে তার বাবার কাছে গেছে।’

কাজলের ছেলে পলক বলেন, ‘(রবিবার) ভোররাত ২টা ৪৮ মিনিটের দিকে আমাকে ফোন করে বলা হয় বাবা এখন বেনাপোল থানায় আছেন। পরে ফোনে তার সঙ্গে কথা হয়েছে। এরপরই আমি বেনাপোলের উদ্দেশে রওনা হই।’ বেনাপোল থেকে পলক আরও বলেন, ‘বাবা বেঁচে আছেন, এ জন্য শুকরিয়া। আপনারা আমার বাবার দিকে খেয়াল রাখবেন।’

গতকাল রবিবার সকালে বেনাপোল বন্দর থানার ওসি মামুন খান জানান, গত শনিবার গভীর রাতে বিজিবি রঘুনাথপুর সীমান্ত থেকে এক ব্যক্তিকে আটক করে থানায় নিয়ে আসে। পরে জানা যায়, ওই ব্যক্তি ঢাকা থেকে নিখোঁজ হন ফটোসাংবাদিক শফিকুল ইসলাম কাজল। বিজিবি অবৈধ অনুপ্রবেশের অভিযোগে থানায় একটি মামলা করেছে। আমরা তাকে আজ আদালতে পাঠাব।

এদিন বিকেলে যশোরে আদালত অনুপ্রবেশের অভিযোগে মামলায় কাজলের জামিন আবেদন মঞ্জুর করেন। এ ছাড়া কাজলের বিরুদ্ধে রাজধানীর তিনটি থানায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে যে তিনটি মামলা রয়েছে, ফরোয়ার্ডিংয়ে পুলিশ তা-ও উল্লেখ করে। এর সঙ্গে পুলিশের পক্ষ থেকে ৫৪ ধারায় একটি মামলা দেওয়া হয়। আদালত ৫৪ ধারার মামলায় কাজলকে জেলহাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেয়।

যশোর আদালতের সাধারণ নিবন্ধন কর্মকর্তা (জিআরও) এএসআই সুবোধ ঘোষ জানান, সাংবাদিক কাজলকে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. মঞ্জুরুল ইসলামের আদালতে হাজির করা হয়। সেখানে পুলিশ তার নামে রুজু হওয়া মামলাগুলোর কথা তুলে ধরে।

কাজলের আইনজীবী দেবাশীষ দাসকে উদ্ধৃত করে তার সহকারী শিক্ষানবিশ আইনজীবী সুদীপ্ত ঘোষ জানান, পুলিশ কাজলের বিরুদ্ধে অবৈধ অনুপ্রবেশের মামলা (বিজিবির রুজু করা) ছাড়াও রাজধানীর তিনটি থানায় আরও তিনটি মামলা থাকার কথা বলেছে। এ তিনটি মামলাই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে করা। গত ৯, ১০ ও ১১ মার্চ মামলা তিনটি হয় যথাক্রমে শেরেবাংলা নগর, হাজারীবাগ ও কামরাঙ্গীরচর থানায়। আদালত এই মামলা তিনটি সম্বন্ধে কোনো আদেশ দেয়নি।

সদর আদালতের হাজতখানার ইনচার্জ পুলিশের এটিএসআই সন্তোষ কুমার বিশ্বাস জানান, ৫৪ ধারায় রুজু করা মামলায় আদালত বিকেলে সাংবাদিক কাজলকে জেলহাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেয়। সেই অনুযায়ী সন্ধ্যার আগেই তাকে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

সকালে পুলিশ জানায়, কাজলকে বেনাপোল বন্দর থানা হেফাজতে পেলে গতকাল ভোররাতে তার ছেলে মনোরম পলকের সঙ্গে তার প্রথম কথা হয়। থানার একজন পুলিশের ফোন থেকে তিনি পলকের সঙ্গে কথা বলেন।

বেনাপোল রঘুনাথপুর বিজিবি ক্যাম্পের কমান্ডার হাবিলদার আশেক আলী বলেন, সাংবাদিক কাজলকে রাতে টহল দলের বিজিবি সদস্যরা সাদিপুর সীমান্তের একটি মাঠের মধ্য থেকে উদ্ধার করে। বিজিবি পরে বেনাপোল বন্দর থানা পুলিশের কাছে তাকে সোপর্দ করে। কাজলের পরিবারের সদস্যরা খবর পেয়ে রাতেই তাকে নিতে বেনাপোলের উদ্দেশে ঢাকা রওনা হন।

যুব মহিলা লীগের নেত্রী (বহিষ্কৃত) শামীমা নূর পাপিয়ার ওয়েস্টিন হোটেলকেন্দ্রিক কারবারে ‘জড়িত’দের নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনের কারণে মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরীর বিরুদ্ধে যে মামলা হয়েছে, তাতে আসামির তালিকায় কাজলের নামও রয়েছে। মাগুরা-১ আসনের আওয়ামী লীগের সাংসদ সাইফুজ্জামান শিখর গত ৯ মার্চ শেরেবাংলা নগর থানায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ওই মামলা করেন। গত ১০ মার্চ সন্ধ্যায় রাজধানীর হাতিরপুলের ‘পক্ষকাল’-এর অফিস থেকে বের হন কাজল। এরপর থেকে তার কোনো সন্ধান না পেয়ে পরদিন ১১ মার্চ চকবাজার থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন তার স্ত্রী জুলিয়া ফেরদৌসী নয়ন। পরে মামলা করেন তার ছেলে মনোরম পলক। ১৩ মার্চ জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে কাজলকে সুস্থ অবস্থায় ফিরে পাওয়ার দাবি জানায় তার পরিবার।

কাজল নিখোঁজের অল্প আগে ধারণ হওয়া দাবি করে একটি ভিডিওচিত্র প্রকাশ করেছিল মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। ওই ফুটেজে কাজলকে একটি জায়গায় রাস্তার পাশে মোটরসাইকেল রেখে পাশের কোথাও যেতে দেখা যায়। বেশ কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে মোটরসাইকেল চালিয়ে যান তিনি। এর মধ্যে তার ওই মোটরসাইকেল ঘিরে কয়েকজনকে তৎপরতা চালাতে দেখা যায়।

সাংবাদিক কাজল নিখোঁজ হওয়ার পর তার সন্ধানের দাবিতে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে কয়েক দফা কর্মসূচি পালন করেছেন সাংবাদিক সহকর্মী ও পরিবারের সদস্যরা।

তবে নিখোঁজের বেশ কদিন পর কাজলের ফোন নম্বরটি বেনাপোলেই চালু হয়েছিল বলে পুলিশ জানায়। তখন কাজল নিখোঁজের ঘটনার তদন্ত কর্মকর্তা চকবাজার থানার এসআই মুন্সী আবদুল লোকমান বলেছিলেন, ‘নিখোঁজ সাংবাদিক কাজলের ফোন নম্বরটি চালু হয়েছিল। লোকেশন দেখিয়েছে বেনাপোল।’ এরপর গতকাল সাদিপুর সীমান্ত থেকে ‘আটক’ করার পর আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।