ঋণের সুদ স্থগিতে স্বস্তি

শিল্প কারখানায় লকডাউন শিথিলের দাবি ব্যবসায়ীদের

করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে সৃষ্ট অচলাবস্থায় ব্যাংকঋণের সুদ দুই মাস স্থগিত করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে ব্যবসায়ীদের সাময়িক স্বস্তি মিলেছে। এবার তারা শিল্প কারখানার অবরুদ্ধ অবস্থা (লকডাউন) শিথিলের দাবি জানিয়েছেন। এতে ব্যবসা-বাণিজ্য সচলের পাশাপাশি শ্রমিকদের বেকার হয়ে পড়ার ঝুঁকিও কমবে বলে মনে করছেন তারা।

বাংলাদেশ সিমেন্ট ম্যানুফেকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন ও ক্রাউন সিমেন্ট গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান মো. আলমগীর কবির দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দুই মাসের জন্য সুদ স্থগিতের বিষয়টি আমরা স্বাগত জানাই। এটি একটি ইতিবাচক দিক। এতে উদ্যোক্তারা সাময়িকভাবে স্বস্তি পাবেন।’ তিনি বলেন, ‘লকডাউনের কারণে সব ধরনের শিল্প কারখানাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দীর্ঘদিন শিল্প কারখানা বন্ধ থাকায় শ্রমিক-কর্মচারীদের একটি বড়  অংশ বেকার হয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। তাই সরকারের উচিত হবে শিল্পকারখানার জন্য লকডাউন শিথিল করা। স্বাস্থ্যবিধি মেনে স্বল্প সময়ের জন্য হলেও শিল্প কারখানা চালুর ব্যবস্থা করতে হবে। এতে শ্রমিকদের বেকার হয়ে পড়ার ঝুঁকি কমে যাবে।’

করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে সৃষ্ট ব্যবসায়িক ক্ষতি-পরিস্থিতি বিবেচনা করে গত রবিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রজ্ঞাপনে চলতি বছরের এপ্রিল ও মে মাসের সব ঋণের সুদ আদায় না করতে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়। এ সময়ে আরোপযোগ্য সুদ পৃথক ব্লক অ্যাকাউন্টে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ফলে যারা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছেন, তাদের এই দুই মাসের সুদ দিতে হবে না।

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ব্লক অ্যাকাউন্টে রাখা সুদের ওপর আবার সুদ আরোপ করা যাবে না। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ব্লক অ্যাকাউন্টে রাখা সুদ বা মুনাফা গ্রাহকের কাছ থেকে আদায় করা যাবে না। ব্যাংক তা আয় খাতেও দেখাতে পারবে না। কেউ আয় খাতে নিয়ে গেলে তা আবার রিভার্স করে ব্লক অ্যাকাউন্টে নিয়ে আসতে হবে।

গতকাল সোমবার এ বিষয়ে আরও একটি সার্কুলার জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, সুদ স্থগিতের বিষয়টি শুধু পুরনো ঋণের জন্য প্রযোজ্য হবে। এ ক্ষেত্রে গত ৩১ মার্চের আগে নেওয়া ঋণের জন্য দুই মাসের সুদ স্থগিতের বিষয়টি কার্যকর হবে। নতুন ঋণ অর্থাৎ ১ এপ্রিল থেকে বিতরণ করা ঋণ সুদ স্থগিতের এই সুবিধা পাবে না।

ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশনের (এফবিসিসিআই) প্রেসিডেন্ট শেখ ফজলে ফাহিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দুই মাসের সুদ স্থগিতের বিষয়টি ভালো সিদ্ধান্ত। তবে আরও কয়েক মাস সুদ স্থগিত রাখা প্রয়োজন। কারণ দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে ব্যবসা-বাণিজ্যের আরও অবনতি হবে। সে ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের কোনো আয় থাকবে না। আর আয় না হলে তারা সুদ পরিশোধ করতে পারবেন না।’

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) প্রেসিডেন্ট শামস মাহমুদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, সুদ স্থগিতের এই পদক্ষেপে আর্থিক খাত কিছুটা সমস্যার মধ্যে পড়লেও ব্যবসায়ীরা উপকৃত হবেন। এখন শিল্প কারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ থাকায় ব্যবসায়ীদের কোনো আয় নেই। কিন্তু স্থায়ী খরচগুলো চালিয়ে যেতে হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে দুই মাসের সুদ স্থগিতে ব্যবসায়ীদের ওপর চাপ কিছুটা কমবে। তবে এটি সাময়িক একটি পদক্ষেপ। করোনা মোকাবিলায় সরকারকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে। কীভাবে ব্যবসা ও অর্থনীতি স্বাভাবিক ধারায় ফিরিয়ে আনা যায়, সেজন্য উচ্চপর্যায়ের একটি কমিটিও করা উচিত।’

সম্প্রতি রাজশাহী বিভাগের জেলাগুলোর সঙ্গে টেলিকনফারেন্সে ঋণের সুদের বিষয়ে ব্যবসায়ীদের দুশ্চিন্তা না করতে বলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি সুদের বিষয়টি দেখবেন বলে আশ্বস্ত করেন। প্রধানমন্ত্রী আশ্বাস দেওয়ার পরই এপ্রিল ও মে মাসের ব্যাংকঋণের সুদ স্থগিত করে বাংলাদেশ ব্যাংক।

করোনাভাইরাস সংক্রমণ রোধে গত ২৬ মার্চ থেকে পাঁচ ধাপে ১৬ মে পর্যন্ত দেশব্যাপী সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে সরকার। এ সময়ে জরুরি সেবা ছাড়া সব শিল্প কারখানা বন্ধ রাখতে বলা হয়। তবে এরই মধ্যে কিছু ক্ষেত্রে শিথিলতা এসেছে। বিশেষ ব্যবস্থায় তৈরি পোশাক খাতের কিছু কারখানা চালু করা হলেও অধিকাংশ শিল্প কারখানাই বন্ধ রয়েছে। সরকার দুই মাসের সুদ স্থগিত করলেও দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় শ্রমিক-কর্মচারীদের একটি বড় অংশ বেকার হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। তবে সুদ স্থগিত করায় ব্যবসায়ীদের খেলাপি হওয়ার সংখ্যা কমবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও সাংসদ আবদুস সালাম মুর্শেদী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এই মুহূর্তে বলা মুশকিল কতদিনে এই করোনা সমস্যার সমাধান হবে। দীর্ঘদিনের লকডাউনে উৎপাদন বন্ধ থাকায় অনেক ব্যবসায়ী ঝরে যেতে পারেন। ব্যাংক ঋণের সুদ স্থগিত করার সিদ্ধান্তটি ভালো। তবে দুই মাস যথেষ্ট নয়, সময় আরও বাড়াতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘পরিস্থিতি কবে স্বাভাবিক হবে কেউ বলতে পারছে না। এ কারণে অবশ্যই ঋণের সুদ স্থগিতাদেশের সময় বাড়াতে হবে, তা না হলে অনেক ব্যবসায়ী খেলাপি হয়ে যাবেন।’

নিট খাতের উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিকেএমইএর সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ হাতেম দেশ রূপান্তরকে বলেন, করোনার কারণে অনেক উদ্যোক্তা আর ব্যবসা করার মতো অবস্থায় থাকবেন না। তারা ব্যবসা বাণিজ্য বন্ধ করে দেবেন। তারা যেন সহজে এক্সিট করতে পারে, দেউলিয়া না হয় সেজন্য সুদ স্থগিতের সিদ্ধান্তটা বাস্তবসম্মত। তবে এই সুবিধা কমপক্ষে এক বছর দেওয়ার দাবি জানান তিনি।

আবাসন ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব) সহসভাপতি লিয়াকত আলী ভূঁইয়া বলেন, ‘আমরা আবাসন শিল্পে করোনাভাইরাসের ক্ষতি মোকাবিলায় জন্য চার ধরনের সুযোগ চেয়েছি। এর মধ্যে একটি ছিল ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক ঋণের সুদ মওকুফ করা। কিন্তু সেটি না করে ঋণ পরিশোধ দুই মাসের জন্য স্থগিত রাখা হয়েছে। এটি ভালো, তবে সময় আরও বাড়াতে হবে।’

করোনাভাইরাসে সৃষ্ট ক্ষতি মেটাতে ইতিমধ্যে সরকারের প্রণোদনা প্যাকেজের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮০ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা। এর মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক দেবে ৫৫ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা। ফলে সিআরআর দেড় শতাংশ কমানোসহ মোট ৭৪ হাজার ৩৫০ কোটি টাকার তহবিলের জোগান দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সব ধরনের ঋণের সুদহারে ভর্তুকি দিচ্ছে সরকার।