এক দিন আয় করতে না পারলে ঢাকা শহরের অধিকাংশ নিম্ন আয়ের মানুষের জীবন সংকটে নিপতিত হয়। গত সোয়া মাস ধরে এই নিম্ন আয়ের মানুষদের অবস্থা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। সরকারের হিসাবে অনেক মানুষ এ সময়ে ত্রাণ পেলেও ঢাকা শহরের অনেক জায়গায় ন্যূনতম ত্রাণ পৌঁছায়নি। নিম্ন আয়ের পরিস্থিতিটা স্বচক্ষে দেখা গেলেও দেখা যাচ্ছে না নগরের নিম্ন মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তদের অবস্থা। আমরা কিছু খাদ্য সহযোগিতা করতে গিয়ে আমাদের চোখে পড়েছে কিছু নিদারুণ কষ্টকর দৃশ্যপট।
আসমানী থাকেন চাঁদ উদ্যানে। অনেক বড় সংসার। ৫টা মেয়ে ও স্বামী নিয়ে বসবাস করেন বস্তিতে। খুবই অসহায় অবস্থা। তাদের ঘরে চাল-ডাল কিছুই নেই। নির্মাণশ্রমিক আতিক থাকেন সোনা মিয়ার টেকে। কাজ নেই, আয় নেই কিন্তু ঘরে দুই বাচ্চা ও বউ নিয়ে খুবই বিপদে আছেন। সেদিন এক শিশু পথরোধ করে দাঁড়িয়ে বলল তার মা তাকে চাল নিয়ে যেতে বলেছে, তার বয়স ৬-৭ বছর হবে। বাবা নেই। মা ভিক্ষা করে। মেয়েটা গর্ভবতী। যেকোনো দিন সন্তান প্রসব করবে, নেই বাড়িতে খাবার, নেই মেয়ের চিকিৎসার খরচ। বাবা নেই বাড়িতে। মা ও বোন ঘরে কিন্তু খাবার নেই। বাধ্য হয়ে ১২ বছর বয়সে রিকশা নিয়ে বের হয়েছে খোকন। তার চোখে পানি, শরীরে অতটা শক্তি নেই যে রিকশা চালাতে পারে সারা দিন। বাড়ি দিনাজপুর। শনির বিলে থাকে পুরো পরিবার নিয়ে। ৬ জন খাওয়ার মানুষ। সারা দিনে আয় করেছে ৯০ টাকা। চোখে পানি। কী করবে বুঝতে পারছে না। এমনই শহরের নিম্ন আয়ের বাসিন্দাদের অবস্থা।
একটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন রফিক (ছদ্মনাম)। মাস তিনেক আগে চাকরি চলে যায়। সাভারে বসবাস করেন একা। কিছুদিন হলো এতই খারাপ অবস্থা যে বাসায় চাল পর্যন্ত নেই। তার এক বন্ধু আমাদের এ তথ্য দিলে আমরা তার পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছি। টাকা হাতে পেয়ে কান্না করে সে বলেছে, ভাই চাল কিনতে যাচ্ছি, সারা দিন খাইনি। কামরাঙ্গীরচরে থাকেন রেশমা (ছদ্মনাম)। তিনি মূলত স্কুটি চালিয়ে টিউশনি ও ছোট একটা চাকরি করে সংসার চালাতেন। লকডাউনের পর থেকে তার আয় বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু এ কথা কাউকেই বলতে পারছিলেন না। সম্প্রতি তার একজন কাছের মানুষের কাছ থেকে জানতে পেরে আমরা তার পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছি। দু’সন্তানে জননী রত্না (ছদ্মনাম)। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যে পড়াশুনা করেছেন। তার স্বামী একটি ছ্ট্টো দোকান চালাতেন। পুরো লকডাউনে তাদের দোকান বন্ধ। তাই বাসা ভাড়া বাকি পড়ে গেছে। কিন্তু বাড়িওয়ালা কোনোভাবেই বাসা ভাড়া পরে নিতে রাজি নয়। এ পরিস্থিতিতে তিনি পড়েছেন একটি বড় সমস্যায়। না পারছেন সইতে আর না পারছেন কাউকে বলতে। তার বন্ধুরা উদ্যোগ নিয়ে কিছু টাকাপয়সার ব্যবস্থা করে দিয়েছে কিন্তু খুবই গোপনীয়তার সঙ্গে। তিনি একজন থিয়েটারকর্মী। থাকেন যাত্রাবাড়ীতে। তার এক বন্ধুর মাধ্যমে জানতে পারলাম তার সংকটের কথা। পুরো পরিবার নিয়ে খুবই মানবেতর জীবন যাপন করছেন। যাহোক তাকে ফোন করলে প্রথমে অস্বীকার করলেও পরে সহযোগিতা নিয়েছেন যখন বলেছি আমরা একটি বড় পরিবারের অংশ, আমি আপনি সকলে।
এই করোনাকালে আমরা প্রতিদিন দেখছি মানুষের তীব্র ক্ষুধা, অভাব আর দিশেহারা অবস্থা। সেদিন একটা ফোন পেলাম। নিতান্তই মধ্যবিত্ত পরিবারে ৬ জন মানুষ খানেওয়ালা। কয়েক দিন হলো তাদের ভয়াবহ খাদ্য সংকট। কাউকে বলতেও পারছেন না, আবার সইতেও পারছেন না। আমাদের পরিচিতকে জানালে আমরা সামান্য খাবার তাকে পৌঁছে দিতে পেরেছি। এ হলো মোটা দাগে মধ্যবিত্তের অবস্থা। নিম্ন আয়ের মানুষরা সহজেই তাদের অবস্থা ও দাবি জানাতে পারলেও মধ্যবিত্তরা এক্ষেত্রে মুখে তালা ঝুলিয়ে আছে। এক ধরনের লজ্জা ও সংকোচে তারা নিজেদের আড়াল করে রেখেছে। কিন্তু আমরা জানি সকলেরই ক্ষুধা লাগে আর সংকটও রয়েছে। তাই এক্ষেত্রে সরকারের উচিত নিম্ন মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তদের জন্যও ব্যবস্থা গ্রহণ। বিশেষ করে মধ্যবিত্তের বড় সংকট এ মুহূর্তে বাড়ি ভাড়াসহ তার ঋণ পরিশোধের বিষয়ে। এক্ষেত্রে সময় নির্ধারণে সরকার বড় ভূমিকা নিতে পারে।
মূলত কয়েকজন মিলেই আমরা নিম্ন আয়ের মানুষদের জন্য খাদ্য সহযোগিতার উদ্দেশ্য নিয়ে ‘চাল, ডাল, আলু। বাঁচার জন্য। ৪৫০ টাকায় এক সপ্তাহ’ নামে একটা ক্যাম্পেইন শুরু করেছিলাম। আজ পর্যন্ত পাঁচ শতাধিক মানুষকে আমাদের খাদ্য সহযোগিতা পৌঁছাতে পেরেছি। ৫ কেজি চাল, ২ কেজি আলু, হাফ কেজি পেঁয়াজ, ডাল, তেল, একটি সাবান ও এক প্যাকেট লবণ এগুলোই আমাদের পরিবারপ্রতি খাদ্য সহযোগিতা। গত কয়েক দিন হলো আমরা দেখছি আমাদের যারা সহযোগিতা করতেন এ কাজে সেই সহযোগিতার মাত্রা কমে এসেছে। এর কারণ আর কিছু নয়, মধ্যবিত্তের টাকায় টান পড়েছে আর উচ্চবিত্তরাও এক্ষেত্রে তেমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেননি। তবুও আমরা দেখছি দেশব্যাপী হাজারো উদ্যোগ গড়ে উঠেছে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের সাহায্য-সহযোগিতা নিয়ে।
আমাদের এই কাজের পাশাপাশি আমরা গত ৭ দিন ধরে প্রতিদিন রান্না করা খাবার বিতরণ করছি ১৪০ জন নিম্ন আয়ের মানুষের মাঝে। কাজটি শুরু করাটা সহজ ছিল কিন্তু ধারাবাহিকতা রক্ষা করাই কষ্টকর হয়ে যাচ্ছে। আমাদের প্রতিদিন বাজার করতে হচ্ছে, চাল, ডাল, সবজি, ডিম কিনতে হচ্ছে। খরচটা একদম নিয়মিত। কিন্তু নিয়মিত টাকা আসাটা প্রায় বন্ধ। এখন হাতেগোনা দু-একজন মানুষ টাকা পাঠায়। এ দিয়েই আমাদের চলতে হচ্ছে। কিন্তু বিকেল ৫টা বেজে গেলেই লোহার ওই গ্রিলের সামনে এসে দাঁড়ায় তারা। তাদের ফেরানো সম্ভব? এই তালিকায় রয়েছে অসুস্থ অনেকেই, রয়েছে শিশু, বৃদ্ধ, নারী, বিধবা, রিকশাওয়ালা এমনকি মধ্যবিত্ত পরিবারও। এ কাজের পাশাপাশি আমরা নিম্ন আয়ের দরিদ্র নারী যারা অসুস্থ, প্রসূতি ও সংকটের মধ্যে আছে তাদের পাশেও দাঁড়ানোর চেষ্টা করছি। এর মধ্যে কয়েকজন গর্ভবতী নারীকে আমরা নিয়মিত পুষ্টিকর খাবার ও ওষুধ দেওয়ার চেষ্টা করছি। দুজনকে আর্থিক সহযোগিতা ও খাবার পাঠানো হচ্ছে নিয়মিত। আমরা এ ধরনের খুব সংকটের মধ্যে যে নারীরা রয়েছে তাদের জন্য আরও সহযোগিতার হাত বাড়াতে চাই। কিন্তু সবকিছুর পর আমরা দেখি আমাদের সামর্থ্য অনেক কম আর এ কাজটা রাষ্ট্রের পক্ষে যতটা সহজ, ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর পক্ষে ততটাই কঠিন। যাহোক আমরা একটা স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে এই করোনা পরিস্থিতিতে একসাথে বেশকিছু উদ্যোগ নিয়ে কাজ করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। আমরা এক ধরনের স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি নিয়েই এ কাজ করে যাচ্ছি। যদিও আমাদের কাজের প্রধান শর্তই হলো আমরা সর্বোচ্চ নিরাপত্তা বিবেচনায় নিয়ে এ কাজে অংশগ্রহণ করব। তাই ব্যক্তিগত সুরক্ষার সবকিছুই আমরা সকলেই মান্য করে চলার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। আমাদের এই ক্ষুদ্র প্রচেষ্টার মাধ্যমে আমরা দেখছি সমাজে নানান অসংগতির চিত্র। একটা শ্রেণি সত্যিকার অর্থেই অভুক্তপ্রায় আর মধ্যবিত্তের অবস্থাও দিন দিন খারাপের দিকেই যাচ্ছে। সরকারের উচিত দ্রুত নাগরিকদের সংকট বিবেচনায় নিয়ে তাদের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ। কারণ মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা না থাকলে মানুষকে এই করোনা পরিস্থিতিতে তাদের ঘরে রাখা খুবই কঠিন।
লেখক
সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, সম্পাদক, পরিবেশ বার্তা
ufardous@gmail.com