একটি সরকারি পরিপত্র নিয়ে কিছু প্রশ্ন

বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে সরকারি কোনো চাকরির পরীক্ষায় বসার সুযোগ আমার হয়নি। বা বলতে পারি প্রয়োজন পড়েনি। তবে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা সূত্রে আমার হাজারো ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে যোগদানের বিপুল আগ্রহ আমি দেখি। তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমার যে দ্বিধাহীনতা, সে চিন্তা থেকেই আমার এই লেখা।

বৃহস্পতিবার গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালযয়ের বিচার শাখা থেকে জারি হওয়া একটি পরিপত্র আমার নজরে আসে। বলাবাহুল্য পরিপত্রটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে আমি সংগ্রহ করি। স্বভাবগত কারণে খুব মনোযোগ দিয়ে পাঠের চেষ্টাও করি। পরিপত্রটির কিছু অংশ পড়ে কিছু এমন প্রশ্নের উদ্রেক আমার মধ্যে ঘটল যে সেগুলো উল্লেখ না করে থাকতে পারলাম না।

পরিপত্রের সারমর্ম বিবেচনায়, আশা করি প্রশ্ন উত্থাপন, সরকারবিরোধী বা রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয় এমন কার্যক্রমের মধ্যে পড়বে না। আমি মনে করি, সরকরের প্রচারিত এ পরিপত্র বা সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন করা, কোনো বিশ্বাস ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন করার সমতুল্য আবেগী বা দণ্ডনীয় অপরাধ নয়।

উক্ত পরিপত্রে মূলত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রে সর্তকতামূলক কিছু দিকনির্দেশনা দেয়া হয়।

নির্দেশিকার ২ এর ক ধারা অনুযায়ী, 'সামাজিক যোগাযোগের বিভিন্ন মাধ্যমে সরকার বা রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয় এমন কোনো পোস্ট ছবি অডিও, ভিডিও, আপলোড, কমেন্ট, লাইক, শেয়ার করা থেকে বিরত থাকতে হবে।'

আমার প্রশ্ন হলো দুটি, সরকারের বা রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হওয়া প্রসঙ্গটি বলতে কী বোঝানো হয়েছে? তার মানে কি এই যে সরকার বা রাষ্ট্র কর্তৃক গৃহীত সিদ্ধান্ত প্রসঙ্গ নিয়ে কোনোরূপ দ্বিতীয় মত প্রকাশের সুযোগ কি নাই?

দ্বিতীয় প্রশ্নটি হলো, এ জাতীয় পোস্টের অডিও-ভিডিও আপলোড, কমেন্ট, লাইক, শেয়ার করা থেকেও বিরত থাকতে বলা হয়েছে। অর্থাৎ আমার জ্ঞানে যা কুলায়, ব্যক্তিকে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে মতামত প্রদান করতে নিষেধ করা হয়েছে। তাহলে সরকার বা রাষ্ট্রীয় পক্ষ থেকে সংবিধানের নিম্নোক্ত ধারাসমূহ কীভাবে সংরক্ষণ করা হলো এ প্রশ্নটিই আমি বিনয়ের সঙ্গে করতে চাই।

সংবিধানের ৩৯ এর (১) ধারায় উল্লেখ আছে, চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার নিশ্চয়তাদান করা হইল।

৩৯ এর (২)(ক) ধারায় বলা আছে, প্রত্যেক নাগরিকের বাক্ ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতার অধিকারে, এবং (খ) সংবাদক্ষেত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দান করা হইল।

প্রশ্ন হলো ব্যক্তি যদি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার চিন্তা প্রকাশের সুযোগ না পায়, কোনো পোস্ট এ লাইক কমেন্ট করার বা শেয়ার করার স্বাধীনতা না পায় তবে সেটি কীভাবে ব্যক্তির চিন্তা বা বিবেকের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দান করে?

অগত্যা প্রশ্ন করতে বাধ্য হলাম উক্ত পরিপত্রটি কি খোদ বাংলাদেশের সংবিধানিক ধারা ও রাষ্ট্রীয় ভাবমূর্তি পরিপন্থী নয়?

পরিপত্রটির ২ এর (খ) তে বলা হয়, 'জাতীয় ঐক্য ও চেতনার পরিপন্থী কোনোরকম তথ্য-উপাত্ত প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকতে হবে'।
আমার প্রশ্ন হলো, 'জাতীয় ঐক্য' বা 'চেতনা' বলতে কী বোঝানো হয়েছে? আমার জানা মতে, মুক্তিযুদ্ধ ভিন্ন বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কোনো জাতীয় ঐক্য বা চেতনা নির্মাণ করা সম্ভব নয়। যেহেতু বাংলাদেশ রাষ্ট্র না তো কেবল বাঙালির না তো কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম অনুসারী চেতনা বহন করে। তাই কীভাবে জাতীয় ঐক্য বা চেতনার বিরুদ্ধাচারণ করা হলে সেটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে, সে প্রশ্ন থেকেই যায়।

পরিপত্রটির (৩) এ বলা হয়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে কনটেন্ট ও ফ্রেন্ডস সিলেকশনে সবাইকে সর্তকতা অবলম্বন এবং রেফারেন্স শেয়ার পরিহার করতে হবে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অপব্যবহার অ্যাকাউন্টের জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি দায়ী হবেন এবং সে জন্য প্রচলিত আইন ও বিধিবিধান অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। 

আমার প্রশ্ন হলো, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যক্তি কাকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করবেন, সেটি নির্ধারণ করে দেওয়ার অধিকার, বাংলাদেশ রাষ্ট্র বা সরকার আদৌ রাখে কি? 

প্রখ্যাত দার্শনিক মিশেল ফুকো দেখিয়েছিলেন, উনবিংশ শতকের রাষ্ট্র কীভাবে মানুষের কাছ থেকে তার জীবনের অধিকার ছিনিয়ে নেয়। 
অগত্যা এই পরিপত্রটি পাঠ করে কেবলই মনে হয়েছে, সরকারি কর্মকর্তাগণ, কর্মচারী ও সরকারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষকবৃন্দ কি কেবলই একজন সরকারী পেশাজীবী? এর বাইরে কি তাদের কোনো জগত থাকতে মানা? চিন্তা করতে মানা? নিজের বিবেকের কথা বলাও কি মানা? এত এত মানা করার অধিকার, আদৌ বাংলাদেশের সংবিধান দেয় কি?

প্রসঙ্গক্রমে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, এই পরিপত্রটি মূলত সরকারি প্রতিষ্ঠানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারের নির্দেশিকা হিসেবে প্রকাশ করা হয়েছে। সত্যি বলতে কী, আমি যেহেতু কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কোনো ব্যক্তি নই, সেহেতু সৌভাগ্যক্রমে আমি আমার মত প্রকাশের পূর্ণ স্বাধীনতা রাখি। 

তথাপি একজন শিক্ষক হিসেবে আমি মনে করি, সরকারী প্রতিষ্ঠানে কর্মরত অপরাপর শিক্ষক ও সরকারী কর্মকর্তার বিবেক, চিন্তা ও মত প্রকাশের অধিকার হরণের এই দলিলটি কতখানি বাংলাদেশের সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক সে দিকে নজর দেওয়া বরঞ্চ আমাদের জন্য খুব জরুরি।

স্নিগ্ধা রেজওয়ানা: শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।