সুঁই-সুতোর ফোঁড়ে এখন দুঃখ লেখা

আবহমান কাল থেকে বাংলার নারীরা দেয়ালে শোভিত বাঁধানো রুমালে সুঁই-সুতোর ফোঁড়ে ফোঁড়ে যত কথা লিখেছেন তার মধ্যে সম্ভবত সবচেয়ে বেশি বার লেখা হয়েছে ‘ভুলোনা আমায়’। দেয়ালরুমাল তো বটেই, হাতপাখা, বালিশের কভার, টেবিলক্লথ কিংবা প্রিয়জনকে উপহার দেওয়া ছোট্ট রুমালেও মনের কথা লিখে রেখেছেন নারীরা। বস্ত্রশিল্পের সূতিকাগার বাংলার পুরাকালের মসলিন-রেশম কিংবা তুলনামূলক আধুনিক জামদানি শিল্পের মতোই ঐতিহ্যবাহী বাংলাদেশের সূচিশিল্প। নকশিকাঁথার অমর কাব্যে বাঙালি নারীর এই শিল্পসত্তা এখনো জাগরূক হয়ে আছে। কালে কালে কাঁথাশিল্পের সেলাইয়ের ফোঁড় যেমন উঠে এসেছে ঘর সাজানোর দেয়ালরুমালসহ নানা উপকরণে, তেমনি কাঁথা সেলাইয়ের ফোঁড়গুলোই নানাভাবে উঠে এসেছে পোশাকে। গ্রামের উঠান থেকে নারী সূচিশিল্পীদের এসব হাতের কাজ এখন বড় বড় ফ্যাশন হাউজের শো-রুমের গণ্ডি পেরিয়ে ঠাঁই করে নিচ্ছে আন্তর্জাতিক নানা প্রদর্শনীতেও। সূচিশিল্প প্রসঙ্গে চিত্রশিল্পী কামরুল হাসান লোকশিল্পের মর্মকথা প্রবন্ধে লিখেছিলেন‘কত দুঃখ, কত হাসি, কত আনন্দ, কত কোলাহল, কত কলহ, মান-অভিমানের স্বাক্ষর এই কাঁথাগুলো তা ভাষায় বোঝানো সম্ভব নয়।’

সুই-সুতোর এসব ফোঁড় কত কি যে বয়ে বেড়ায় সে খবর আমরা রাখি না বলেই হয়তো, কি ইতিহাসে কি বর্তমানে এই সূচিশিল্পীদের নিয়তি যেন বাঁধা ভুলে যাওয়ায়। এবার করোনাভাইরাস মহামারীর কালে সেই সত্য আবারও সামনে এলো। এখন দেশে নারী সূচিশিল্পীদের সবচেয়ে বড় কর্মক্ষেত্র জামালপুর জেলায়। জামালপুরের নকশিকাঁথা, শাড়ি, সালোয়ার-কামিজ, পাঞ্জাবিসহ বিভিন্ন নকশিপণ্যের সুনাম রয়েছে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও। ঢাকাসহ বড় বড় শহরের নকশিপণ্যের চাহিদার সিংহভাগই পূরণ করেন এখানকার নকশিপণ্যের উদ্যোক্তারা। কিন্তু এখন করোনাভাইরাস মহামারীতে চরম দুর্গতিতে পড়েছেন তারা। শনিবার দেশ রূপান্তরে ‘জামালপুরে নকশিশিল্পের চার লাখ নারীকর্মীর দুর্দিন’ শিরোনামের প্রতিবেদনে সেখানকার সরেজমিন চিত্র উঠে আসে। আয় না থাকায় উদ্যোক্তারা পরিশোধ করতে পারছেন না কর্মীদের মজুরি। ফলে চরম কষ্টে আছেন এ শিল্পে জড়িত জেলার প্রায় চার লাখ নারী সূচিশিল্পী ও দুই হাজারের বেশি উদ্যোক্তা। উদ্যোক্তারা জানান, পয়লা বৈশাখ ও ঈদুল ফিতরের সময় নকশিপণ্যের চাহিদা সবচেয়ে বেশি থাকলেও এবার করোনায় লকডাউনের কারণে মার্চের শেষ সপ্তাহ থেকেই বন্ধ হয়ে যায় সব নকশিশিল্প প্রতিষ্ঠান। ফলে উৎপাদিত পণ্যের সরবরাহও থেমে যায়। ফলে ঈদের আগে বাড়তি আয় দূরে থাক, তিন বেলা খাবার জোগাড়ই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে দেশের ঐতিহ্যবাহী এই সূচিশিল্পের কর্মীদের। জামালপুর হস্তশিল্প সমিতির নেতারা বলছেন, পাইকারি বিক্রির সময় চলে যাওয়ায় সরকার ১০ তারিখ থেকে সীমিত পরিসরে মার্কেট, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খুলে দিলেও তা নকশিপণ্যের উদ্যোক্তাদের কাজে আসবে না।

এ অবস্থায় জামালপুরের সূচিশিল্পের কর্মী ও উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ সহায়তা প্রয়োজন। কিন্তু স্থানীয় প্রশাসনের তরফে অতি দরিদ্র শ্রেণিতে বিতরণ করা ত্রাণের কিছু সুবিধা সেখানকার নারীকর্মীদের একাংশ পেলেও বিশেষায়িত কুটির শিল্পের মর্যাদায় এই শিল্প রক্ষায় কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। অথচ জামালপুরের ঐতিহ্যবাহী সূচিশিল্পের প্রসার ঘটিয়ে সেখানে অত্যাধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন নকশিপল্লী নির্মাণের প্রকল্প নিয়েছে সরকার। ‘শেখ হাসিনা নকশিপল্লী’ নামের এই পল্লীটি নির্মাণের জন্য গত বছরই জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) বরাদ্দও নিশ্চিত করা হয়েছে। জামালপুর শহরের পাদদেশে ঝিনাই নদীর পাড় ঘেঁষে কম্পপুর এলাকায় ৩০০ একর জমির ওপর গড়ে উঠবে শেখ হাসিনা নকশিপল্লী। ৫ হাজার ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্প এখন চলমান। তারই ধারাবাহিকতায় ক্রেতা-বিক্রেতাদের সুবিধার জন্য কয়েক মাস আগে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সেখানে নকশিপণ্যের সাপ্তাহিক হাটও চালু করে সরকার। কিন্তু করোনার মহাদুর্যোগে যদি জামালপুরের নকশিশিল্পের উদ্যোক্তা আর সূচিশিল্পীরা টিকে না থাকতে পারেন, তাহলে নকশিপল্লী হবে কী করে।

করোনার সম্ভাব্য আর্থিক ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সহায়তা করতে এপ্রিলের শুরুতেই ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পসহ মাঝারি শিল্পের উদ্যোক্তাদের জন্য চলতি মূলধন হিসেবে স্বল্প সুদে ২০ হাজার কোটি টাকার ঋণ সহায়তা প্রদানের ঘোষণা দেয় সরকার। এই ঋণের ৯ শতাংশ সুদের মধ্যে ৪ শতাংশ উদ্যোক্তা পরিশোধ করবে আর বাকি ৫ শতাংশ সরকার ভুর্তকি হিসেবে দেবে। সরকারের এই ঘোষণাকে অর্থনীতিবিদ ও এই শিল্প খাত সংশ্লিষ্টরা সাহসী ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ বলে স্বাগতও জানান। কিন্তু প্রশ্ন হলো, উদ্যোক্তারা কবে এই ঋণের সুবিধা পাবেন আর তার মধ্য দিয়ে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের লাখ লাখ কর্মীরাই বা কীভাবে উপকৃত হবেন। এ বিষয়ে নীতিমালা ও তালিকা চূড়ান্ত হয়ে থাকলে জরুরিভিত্তিতে ঈদের আগেই এই শিল্প খাতের উদ্যোক্তা ও কর্মীদের সাহায্যে সরকারের পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। দেশের ঐতিহ্যবাহী এই কুটির শিল্পের বিকাশ চাইলে এই শিল্পের সূচিশিল্পীদের জীবনমানের উন্নয়নকে অবশ্যই অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। এক সময় দেয়ালরুমালেই লেখা থাকতো এমন কাব্যকথা‘ঊষর মরুর ধূসর বুকে বিশাল যদি শহর গড়ো, তার চাইতে একটি জীবন সফল করা অনেক বড়।’