বৈশ্বিক মহামারী করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ও মৃত্যুর মিছিল বাড়ছেই। বিশ্বের ২১০টি দেশ ও অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া ভাইরাসটিতে গতকাল রবিবার পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে ২ লাখ ৮১ হাজার মানুষের। আক্রান্ত হয়েছে ৪১ লাখ ৩০ হাজারের বেশি। গেল বছর শেষ দিন চীনের উহানে ভাইরাসটির প্রথম রোগী শনাক্ত হওয়ার পর প্রথম মাসে তুলনামূলক কম ছড়ালেও ফেব্রুয়ারি থেকে ভয়াবহ রূপ নিতে শুরু করে ভাইরাসটি। মার্চ ও এপ্রিল মাসে বিশ্বজুড়ে আক্রান্ত ও মৃত্যু হয় কয়েক লাখ মানুষের। এর মধ্যে অবশ্য মার্চের শেষদিকে চীন ও দিক্ষণ কোরিয়া অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয় ভাইরাসটির সংক্রমণ। তবে প্রায় মাসখানেক বিরতির পর চীনের উহানে ও দক্ষিণ কোরিয়ায় নতুন করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর আগেও ওই দেশ দুটিতে নতুন করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছে। তবে কর্র্তৃপক্ষ দাবি করেছে, ওইসব রোগী বাইরে থেকে আসা। কিন্তু গত শনি ও রবিবার দেশ দুটিতে নতুন করে স্থানীয় পর্যায়ের সংক্রমণ উদ্বেগ বাড়িয়ে দিয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ায় নতুন করে বেশ কয়েকজনের করোনাভাইরাস শনাক্ত হওয়ার পর কর্র্তৃপক্ষ রাজধানী সিউলজুড়ে পানশালা এবং ক্লাবগুলো বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছে। নতুন করে আক্রান্তের ঘটনায় আবার দ্বিতীয় দফা সংক্রমণের আশঙ্কা করছে দেশটি। ভাইরাসটির উৎসস্থল উহানেও গতকাল নতুন এক করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছে। তিনিও স্থানীয়ভাবেই সংক্রমিত হয়ে থাকতে পারেন বলে চীনের দাবি।
এদিকে গত এক মাসের হিসাব পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, এ সময়ের মধ্যে এশিয়ায় রোগী বেড়েছে কয়েকগুণ। ইরানে লাখ ছাড়িয়েছে আক্রান্তের সংখ্যা। চীনে প্রায় ৮৩ হাজার রোগী। সিঙ্গাপুরে শুরু হয়েছে সংক্রমণের ঢেউ। ভারতে শুরুর দিকে সংক্রমণ কম হলেও কয়েক দিনের মধ্যে সেই সংখ্যা ছাড়িয়ে গেছে ৫০ হাজার। পাকিস্তান, বাংলাদেশ, সৌদি আরব, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, জাপান, কুয়েত, আফগানিস্তানসহ মহাদেশটির অনেক দেশেই রোগীর সংখ্যা হু হু করে বাড়ছে। এর মধ্যে চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ায় সংক্রমণ হার কম হলেও ভারতে বেড়েছে ভয়ানক হারে। এপ্রিলের ১ তারিখে দেশটিতে মাত্র দ্ইু হাজার করোনা রোগী থাকলেও গতকাল পর্যন্ত সেই সংখ্যা ৬৪ হাজার পার হয়েছে। সৌদি আরবে ১ এপ্রিল রোগীর সংখ্যা ১ হাজার ৭০০ জনের মতো হলেও ৯ মে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৭ হাজারে। ইরানেও এ সময়ের মধ্যে ৫০ হাজারের বেশি আক্রান্ত হয়েছে। পাকিস্তানে গত ১ এপ্রিল রোগীর সংখ্যা ছিল ২ হাজার ১১১ জন। কিন্তু গতকাল সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৯ হাজার জন। সিঙ্গাপুরে ১ এপ্রিল ছিল এক হাজার রোগী। সেই সংখ্যা ১ মে বেড়ে হয়েছে সাড়ে ২২ হাজার। আমিরাতে এ সময়ের মধ্যে রোগী বেড়ে হয়েছে প্রায় ১৮ হাজার। অথচ ১ এপ্রিল রোগীর সংখ্যা ছিল মাত্র ৮০০। এ সময়ের মধ্যে কাতারের রোগী বেড়েছে প্রায় ২০ হাজার। জাপানে বেড়েছে ১৩ হাজার। এছাড়া মহাদেশটির অনেক দেশেই রোগীর সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়েছে।
তবে বড় উদ্বেগের বিষয়টি হচ্ছে চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ায় নতুন করে স্থানীয়দের মধ্যে সংক্রমণের ঘটনা। উহানের লকডাউন তুলে সবকিছু স্বাভাবিক হওয়ার পথেই গতকাল নতুন রোগী পাওয়ার খবর অবাক ও শঙ্কিত করেছে গোটা বিশ্বকে। দক্ষিণ কোরিয়ায় লকডাউন না থাকলেও তারা যেসব কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছিল তাতে ঢিল দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরই নতুন গুচ্ছ সংক্রমণের ঘটনা উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
বিবিসি বলছে, রবিবার দক্ষিণ কোরিয়া ৩৪ জন কভিড-১৯ রোগে নতুন করে আক্রান্ত হয়েছে। গত এক মাসের মধ্যে এটাই ছিল দৈনিক সর্বোচ্চ সংক্রমণের হার। দেশটিতে নতুন করে সংক্রমণ ছড়িয়েছে ২৯ বছর বয়স্ক এক তরুণের কাছ থেকে। গত সপ্তাহান্তে রাতের বেলা ফুর্তি করতে বেরিয়েছিল ওই তরুণ। ওই তরুণ যেসব জায়গায় গিয়েছিল, এখন স্বাস্থ্য কর্র্তৃপক্ষ সেসব জায়গায় গিয়ে এমন ১ হাজার ৫১০ জনকে পরীক্ষা করার জন্য খুঁজছে।
বিষয়টি নিয়ে প্রেসিডেন্ট মুন জে-ইন বলেছেন, নতুন করে একটা ক্লাস্টার বা একগুচ্ছ মানুষের মধ্যে এ সংক্রমণ হওয়ার পর এটা পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে যে, পরিস্থিতি একটা সহনীয় ও স্থিতিশীল পর্যায়ে থাকলেও তার মধ্যেই যেকোনো সময় সংক্রমণ আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে।
এক ভাষণে প্রেসিডেন্ট বলেছেন, এ ভাইরাসের ওপর থেকে নজরদারি কমালে চলবে না। একেবারে শেষ না হলে এ ভাইরাসের শেষ নেই।
গতকাল রাতের সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্যানুযায়ী, করোনায় মৃত্যু হয়েছে ২ লাখ ৮১ হাজার ১৫ জনের। গতকাল পর্যন্ত আক্রান্তদের মধ্যে সুস্থ হয়েছে ১৪ লাখ ৫৫ হাজার ৪৭ জন। চিকিৎসাধীন ২৩ লাখ ৯৪ হাজার ৯৭৫ জন। এদের মধ্যে ৪৭ হাজার ৪৭০ জনের অবস্থা গুরুতর।
এখন পর্যন্ত ১৩ লাখ ৪৮ হাজার ৩১৫ জন আক্রান্ত নিয়ে তালিকার শীর্ষে আছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটি মৃত্যুর তালিকায়ও শীর্ষে। সেখানে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮০ হাজার ৫৬ জনে। আক্রান্তের সংখ্যায় দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা স্পেনে এখন করোনা রোগীর সংখ্যা ২ লাখ ৬৪ হাজার ৬৬৩ জন। মারা গেছে ২৬ হাজার ৬২১ জন। তবে মৃত্যুর সংখ্যায় ইতালি আছে স্পেনের আগে। দেশটিতে মারা গেছে ৩০ হাজার ৩৯৫ জন। আর আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ১৮ হাজার ২৬৮ জনে। যুক্তরাজ্যে মৃত্যুর সংখ্যা ৩২ হাজার, আক্রান্ত ২ লাখ ১৫ হাজার ২৬০ জন। ফ্রান্সে মারা গেছে ২৬ হাজার ৩১০ জন। আক্রান্ত ১ লাখ ৭৬ হাজার ৬৫৮ জন। ইউরোপের আরেক দেশ জার্মানিতে শনাক্ত হওয়া রোগীর সংখ্যা ১ লাখ ৭১ হাজার ৩১৪ জন। দেশটিতে গতকাল পর্যন্ত মারা গেছে ৭ হাজার ৫৪৯ জন। নেদারল্যান্ডসে আক্রান্তের সংখ্যা ৪২ হাজার ৬২৭ আর মৃত্যু হয়েছে ৫ হাজার ৪৪০ জনের। বেলজিয়ামেও রোগীর সংখ্যা ৫৩ হাজার ৮১ জন। মারা গেছে ৮ হাজার ৬৫৬ জন। সুইজারল্যান্ডে আক্রান্ত ৩০ হাজার ৩০৩, মৃত্যু হয়েছে ১ হাজার ৮৩০ জনের। তুরস্কে ১ লাখ ৩৭ হাজার ১১৫ জন আক্রান্ত। ৩ হাজার ৭৩৯ জন মারা গেছে। সুইডেনে ২৬ হাজার ৩২২ জন রোগী শনাক্ত হয়েছে। মারা গেছে ৩ হাজার ২২৫ জন। রাশিয়ায় ২ লাখ ৯ হাজার ৬৮৮ জন রোগী শনাক্ত হয়েছে। তবে মারা গেছে ১ হাজার ৯১৫ জন।
কানাডায় রোগীর সংখ্যা ৬৭ হাজার ৭০৭। মারা গেছে ৪ হাজার ৬৯৩ জন। ব্রাজিলে ১ লাখ ৫৬ হাজার ৬১ জন রোগী শনাক্ত হয়েছে। মৃত্যুর সংখ্যা ১০ হাজার ৬৫৬ জন।
মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইরানে আক্রান্তের সংখ্যা ১ লাখ ৭ হাজার ৬০৩ আর মৃত্যু হয়েছে ৬ হাজার ৬৪০ জনের। ভাইরাসটির উৎসস্থল চীনে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৮২ হাজার ৯০১ এবং মৃত্যুর সংখ্যা ৪ হাজার ৬৩৩ জন।
এছাড়া অনেক দেশেই রোগীর সংখ্যা ২০ হাজার ছাড়িয়েছে আর মারা গেছে হাজারেরও বেশি।