ইজিবাইকের সিসাযুক্ত পরিত্যক্ত ব্যাটারি

কৃষিপণ্যে সিসা প্রবেশ হুমকিতে জনস্বাস্থ্য

ইজিবাইক বা ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় সারা দেশ বর্তমানে সয়লাব। ছোট আকারের এ গণপরিবহনে থাকা সিসাযুক্ত ক্ষতিকর ব্যাটারি নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছে সরকার। ইজিবাইকের সিসাযুক্ত পরিত্যক্ত ব্যাটারি যত্রতত্র ফেলার কারণে তা থেকে বিষাক্ত ক্যাডমিয়াম, ক্রোমিয়াম ও লেড সরাসরি ফসলি জমিতে মিশে যাচ্ছে। আর ওইসব বিষাক্ত উপাদান পরে মাটি থেকে চাল ও হলুদসহ নানা কৃষিপণ্যে প্রবেশ করছে, যা মানবস্বাস্থ্যের জন্য ভয়াবহ হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে। কৃষিজমি থেকে কৃষিপণ্যে লেড প্রবেশের কারণে জনস্বাস্থ্যের হুমকির পাশাপাশি দেশের রপ্তানি বাণিজ্যেও সরাসরি প্রভাব ফেলছে। ইতিমধ্যে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে স্থানীয় সরকার বিভাগে চিঠি দিয়ে বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। ইজিবাইকের পরিত্যক্ত ব্যাটারি অপসারণে পরিবেশবান্ধব ও বিজ্ঞানসম্মত ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ পরিস্থিতিতে জেলা, উপজেলা ও গ্রামপর্যায়ে চলাচলকারী অটোরিকশার পরিত্যক্ত ব্যাটারির পরিবেশবান্ধব ও বিজ্ঞানসম্মত ব্যবস্থাপনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ওইসব বর্জ্যরে পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থাপনায় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানদের দায়িত্ব দিতে সব জেলা প্রশাসককে চিঠি দেওয়া হয়েছে। গত ২৫ মার্চ স্থানীয় সরকার বিভাগের উপসচিব মো. ইফতেখার আহম্মেদ চৌধুরী স্বাক্ষরিত ওই চিঠি পাঠানো হয়।

জানতে চাইলে স্থানীয় সরকার বিভাগের উপসচিব মো. ইফতেখার আহম্মেদ চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সারা দেশে বিপুল পরিমাণ ইজিবাইক চলছে। এসব ইজিবাইকের ব্যাটারিতে অতিরিক্ত পরিমাণে সিসা রয়েছে। এসব সিসা পরিবেশ ও মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর। আমরা পরিত্যক্ত ব্যাটারি পরিবেশবান্ধব উপায়ে অপসারণ ব্যবস্থাপনার জন্য জেলা প্রশাসকদের চিঠি দিয়েছি। জেলা প্রশাসন এ বিষয়ে ইউপি চেয়ারম্যান ও সদস্যদের নির্দেশনা দেবে।’

স্থানীয় সরকার বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর ইজিবাইকের পরিত্যক্ত ব্যাটারি যেখানে সেখানে মানুষ ফেলে দিচ্ছে। আর সেই ব্যাটারিতে থাকা নানা ধরনের ক্ষতিকর উপকরণ ছড়িয়ে পড়ছে ফসলি জমিতে। খাদ্যের মাধ্যমে সেই বিষ আবার ছড়িয়ে পড়ছে মানবদেহে। এ অবস্থায় ইজিবাইকের প্রসারে উদ্বিগ্ন বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষসহ সরকারের একাধিক মন্ত্রণালয়। এ বিষয়ে গত ২৭ ফেব্রুয়ারি বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে স্থানীয় সরকার বিভাগের সিনিয়র সচিবের কাছে একটি চিঠি পাঠানো হয়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব নাজমুল হক ওই চিঠিতে বলেন, ‘বাংলাদেশে হলুদে লেডক্রোমেট মিশ্রণের ফলে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়টি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একটি সভায় উপস্থাপিত হয়। ইজিবাইকের ব্যাটারি যত্রতত্র ফেলার কারণে মাটি থেকে লেডমিশ্রণে হলুদসহ অন্যান্য কৃষিপণ্যে প্রবেশের আশঙ্কা রয়েছে। কৃষিজমি হতে কৃষিপণ্যে লেড প্রবেশের কারণে জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকিসহ বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্যে সরাসরি প্রভাব পড়ছে। তাই ইজিবাইকের পরিত্যক্ত ব্যাটারি অপসারণে পরিবেশবান্ধব ও বিজ্ঞানসম্মত ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন।’

সংশ্লিষ্টরা জানান, ইজিবাইকের পরিত্যক্ত ব্যাটারির ক্ষতিকর দিক তুলে ধরেছে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ। সংস্থাটির কর্মকর্তারা জানান, হলুদে অতিরিক্ত সিসার উপস্থিতি সম্পর্কে আইসিডিডিআর,বি এবং যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে জানা যায় যে, ইজিবাইকের পরিত্যক্ত ব্যাটারি যেখানে সেখানে ফেলার কারণে বিষাক্ত ক্যাডমিয়াম, ক্রোমিয়াম ও লেড সরাসরি ফসলি জমিতে মিশে যাচ্ছে। মাটিতে দূষণ ছড়াচ্ছে। শুধু হলুদ নয়, আমেরিকান কেমিক্যাল সোসাইটির (এসিএস) এক গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বের ১২টি দেশে উৎপাদিত চালে উচ্চমাত্রার ক্যাডমিয়াম শনাক্ত হয়েছে, যার মধ্যে বাংলাদেশ রয়েছে শীর্ষে। বিশেষ কয়েকটি এলাকায় উৎপাদিত চালে ক্যাডমিয়াম রয়েছে। ক্যাডমিয়াম বিষক্রিয়ায় ক্যানসার, হৃদরোগ ও কিডনি জটিলতা দেখা দিতে পারে। নিম্নমানের সার এবং শিল্পবর্জ্য থেকে ক্যাডমিয়াম চালে প্রবেশ করছে। এ শিল্পবর্জ্যরে প্রধান উপকরণ হচ্ছে ইজিবাইকের ব্যাটারি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্জ্য ব্যাটারিতে পারদ, ক্যাডমিয়াম, সিসা, দস্তা ও অন্যান্য ভারী ধাতব থাকে। পারদের বিষক্রিয়া কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি করে, যার প্রভাবে ৪০ ভাগ ক্ষেত্রে মৃত্যু ঘটে।