সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারে করোনায় আক্রান্ত হয়ে বন্দির মৃত্যুর পর নতুন করে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কারা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। কীভাবে ওই বন্দি করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন তার কারণ খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন তারা। এ ছাড়া কারাগারে যাতে কোনো অবস্থাতেই করোনা ভাইরাসের
বিস্তৃতি না ঘটে, সে লক্ষ্যে নানামুখী পদক্ষেপ নিয়েছেন কারা কর্মকর্তার। ওই বন্দি যে ওয়ার্ডে ছিলেন, সেই ওয়ার্ডের সব বন্দিকে আগেই আইসোলেশনে নেওয়া হয়েছে। গতকাল বুধবার তাদের সবার নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। পাশাপাশি দেশের সবগুলো কারাগারে করোনা প্রতিরোধে সর্বোচ্চ সতর্কতা নেওয়া হয়েছে।
কারা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (অতিরিক্ত আইজি প্রিজন্স) কর্নেল আবরার হোসেন গতকাল বুধবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কারাগারে ওই বন্দি কীভাবে সংক্রমিত হয়েছেন, আমরা কোনোভাবেই সেটা বের করতে পারছি না। এ বিষয়ে আমরা একটি সার্চ (অনুসন্ধান) কমিটিও করেছি। তাদের কারণ খুঁজে বের করতে বলেছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘কোনো না কোনো আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে না গেলে ওই বন্দি সংক্রমিত হওয়ার কথা নয়। তাই কারণ অনুসন্ধানকে আমরা সর্বাধিক গুরুত্ব দিচ্ছি। পাশাপাশি সিলেট কারাগারসহ অন্যান্য কারাগারেও করোনা প্রতিরোধে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছি।’
সিলেট কারাগার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার ৭ নম্বর দক্ষিণ বাণীগ্রাম ইউনিয়নের ঘড়াইগ্রামের বাসিন্দা আহমেদ হোসেন (৫৩) দুই মাস আগে একটি হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হন। তিনি কারাগারেই করোনা আক্রান্ত হয়েছেন বলে তার স্বজনরা অভিযোগ করছেন। আহমেদ হোসেনের ভাতিজা এনামুল হক জানান, তার চাচা কারাগারেই করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। গ্রামের নিরীহ আহমেদ হোসেনের আগে থেকে তেমন কোনো রোগ থাকার খবর দিতে পারেননি এনামুল।
সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার মো. আবদুল জলিল জানান, কারাগারের বন্দি আহমেদ হোসেনের কভিড-১৯ পজিটিভ আসায় তার সংস্পর্শে যাওয়া কারাগারের কর্মকর্তা-কর্মচারী, কারারক্ষী, বন্দি মিলে মোট ১২০ জনকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ৯ জন কারারক্ষীকে ৮ মে কোয়ারেন্টাইনে পাঠানো হয়েছে। হোসেন যে ওয়ার্ডে থাকতেন সেই ওয়ার্ডটি লকডাউন করা হয়েছে। বুধবার ওই ওয়ার্ডে থাকা প্রায় ৮৫ বন্দির নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। পরীক্ষার রিপোর্ট পাওয়া গেলে আরও কেউ সংক্রমিত কি না, নিশ্চিত হওয়া যাবে।
এদিকে কারাগারে গতকাল বুধবার সকাল পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ২৫। তাদের মধ্যে বন্দি ৪, কারারক্ষী ২০ ও কারাগারের চিকিৎসক একজন। ঢাকায় আক্রান্ত একজন বন্দি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় করোনায় আক্রান্ত হন। ওই বন্দিকে মুগদা জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।
ঢাকা (কেরানীগঞ্জ) কেন্দ্রীয় কারাগারের একজন কর্মকর্তা জানান, করোনা সংক্রমণের পর থেকেই কারাগারে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে। কারাগারে নিয়ে আসা নতুন আসামিদের জীবাণুনাশক ছিটিয়ে ও হাত ধোয়ানোর পর আলাদা রাখা হয়। তাদের ১৪ দিন আইসোলেশনে রাখা হয়। আইসোলেশনে শরীরের তাপমাত্রা পরিমাপের পর নির্ধারিত ওয়ার্ডে পাঠানো হয়।
ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের জেল সুপার মাহবুবুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, কোয়ারেন্টাইনে থাকা বন্দিদের কোনোভাবেই ওয়ার্ড থেকে বের করা হয় না। তাদের সার্বক্ষণিক খোঁজখবর রাখা হয়। তাদের খাবার, প্রয়োজনীয় ওষুধ সব ঠিকভাবে দেওয়া হয়। শুধু কারও সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয় না। কোয়ারেন্টাইন সময় শেষ হলে তারা সাধারণ বন্দিদের মতো স্বাস্থ্যবিধি মেনে কারাগারে থাকতে পারেন।
কারা কর্মকর্তারা জানান, কারাগারে করোনা সংক্রমণ রোধ ও বন্দিদের সুরক্ষায় দেশের সব কটি কারাগারে ‘ভাইরাস জিরো’ স্প্রে করা হচ্ছে। কোরিয়া থেকে আনা ভাইরাস নিরোধক ইতিমধ্যে দেশের সব কারাগারে পাঠানো হয়েছে এবং তার ব্যবহার শুরু হয়েছে।
অতিরিক্ত আইজি প্রিজন্স কর্নেল আবরার হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনার চেয়েও আমরা আরও কিছু বাড়তি প্রস্তুতি নিয়েছি। কারাগার ও বন্দিদের সুরক্ষায় নতুন করে ‘ভাইরাস জিরো’ নামে একটা ওষুধ এনেছি। সেটা দেশের সব কারাগারে পাঠানো হয়েছে। কারাগারে হ্যান্ডওয়াশ ও ক্লিনিংয়ের সব ব্যবস্থা করা হয়েছে উল্লেখ করে কর্নেল আবরার হোসেন বলেন, আমরা ৮টা করোনা সেন্টার স্থাপন করেছি। যেটাকে আইসোলেশন সেন্টার বলা হয়। ওগুলোতে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া আছে। যদি কখনো বড় আকারে রোগী বেড়ে যায়, আমরা তখন সেসব সেন্টারে স্থানান্তর করতে পারব।
এ ছাড়া কারা অধিদপ্তর কারাগারের স্থানাভাব দূর করতে বন্দির সংখ্যা কিছুটা কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তার অংশ হিসেবে ইতিমধ্যে প্রায় তিন হাজার বন্দিকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। আরও বন্দিকে মুক্তি দেওয়ার প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
কারা অধিদপ্তরের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সহকারী মহাপরিদর্শক দেশ রূপান্তরকে বলেন, দেশে ৬৮টি কারাগারে ৯০ হাজারের মতো বন্দি আছে; যা ধারণক্ষমতার দ্বিগুণের বেশি। করোনার প্রভাবে সারা দেশে আদালত বন্ধ থাকায় জামিন পাওয়া বন্দির সংখ্যা কমেছে বলে ওই কর্মকর্তা জানান।