রেফার কনটেইনার নিয়ে বিপাকে চট্টগ্রাম বন্দর

পচনশীল আমদানি পণ্যভর্তি রেফার (রেফ্রিজারেটেড) কনটেইনার নিয়ে বিপাকে পড়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। দফায় দফায় স্টোর রেন্ট মওকুফের পরও এসব কনটেইনার ডেলিভারিতে আসেনি আশানুরূপ গতি। ফলে বর্তমানে বন্দরে রেফার কনটেইনার ধারণক্ষমতা ছাড়িয়ে গেছে। এসব কনটেইনারে বৈদ্যুতিক সংযোগ দিতে প্লাগ পয়েন্ট সংকটে পড়েছে বন্দর। এ অবস্থায় আগামী রবিবার থেকে রেফ্রিজারেটেড কনটেইনারে নির্দিষ্ট ভাড়ার চারগুণ হারে পেনাল আরোপের ঘোষণা দিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব মো. ওমর ফারুক দেশ রূপান্তরকে বলেন, কভিড-১৯ মোকাবিলায় দেশব্যাপী সাধারণ ছুটি ঘোষণার পর জমে থাকা কনটেইনার ডেলিভারিতে গতি আনতে আগামী শনিবার পর্যন্ত সব ধরনের পণ্যের ওপর শতভাগ স্টোর রেন্ট মওকুফ ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। কিন্তু দেখা গেছে, এ সুযোগ দেওয়ার পর অন্যান্য কনটেইনার ডেলিভারির পরিমাণ কিছুটা বাড়লেও রেফার কনটেইনার ডেলিভারিতে মোটেও গতি আসেনি। এ ধরনের কনটেইনারে বিদ্যুৎ সংযোগ দিতে এখন প্লাগ পয়েন্ট সংকট সৃষ্টি হয়েছে। পরিস্থিতি উত্তরণে এ ধরনের কনটেইনারের ক্ষেত্রে আগামী শনিবারের পর থেকে নির্ধারিত স্টোর রেন্টের চারগুণ পেনাল রেন্ট আরোপের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, কমলা, আপেল, আঙুর, ডালিম, মাছ, রসুন, পেঁয়াজ, আদা, কাঁচামরিচসহ বিভিন্ন পচনশীল পণ্য আমদানি করা হয় রেফার কনটেইনারে। আমদানি পণ্যবাহী প্রত্যেকটি জাহাজে নির্দিষ্ট পরিমাণ রেফার কনটেইনার থাকে। জাহাজ থেকে নামানোর পর যতদিন কনটেইনারগুলো খালাস হবে না ততদিন বন্দরকে বিদ্যুৎ সংযোগ দিয়ে রাখতে হবে। চট্টগ্রাম বন্দরে আগে রেফার কনটেইনারে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ার জন্য প্লাগ পয়েন্টের সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৬০০টি। পরবর্তী সময়ে আরও এক হাজার প্লাগ বাড়ানোয় তার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৬০০টিতে। গতকাল বুধবারের হিসাবে দেখা গেছে, বন্দরে রেফার কনটেইনার জমা রয়েছে ২ হাজার ৬০০টি।

বন্দর সূত্র জানায়, করোনা পরিস্থিতিতে সাধারণ ছুটি ও বিভিন্ন স্থানে লকডাউনের কারণে বন্দর থেকে পণ্য ডেলিভারি কমে যায়। ফলে প্রায় এক মাস ধরে নজিরবিহীন কনটেইনার জটের সৃষ্টি হয় বন্দরে। এ সময় ইয়ার্ডে স্থান সংকট হয়ে পড়ায় জাহাজ থেকে কনটেইনার নামানো স্থবির হয়ে পড়ে। বহির্নোঙরে সৃষ্টি হয় জাহাজজট। সংকট উত্তরণে অফডকগুলোতে নির্ধারিত ৩৮ ধরনের পণ্য নিয়ে সীমাবদ্ধতা তুলে দিয়ে সব ধরনের পণ্য বন্দর থেকে অফডকে নেওয়ার আদেশ আসে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকে। এছাড়া সাধারণ ছুটির সময় অর্থাৎ গত ২৬ মার্চ থেকে যেসব কনটেইনার জাহাজ থেকে বন্দরে নেমেছে সেগুলোর ওপর আগামী ১৬ মে পর্যন্ত শতভাগ স্টোর রেন্ট মওকুফ করে বন্দর কর্তৃপক্ষ। এ সিদ্ধান্তের পর গত দেড় সপ্তাহে বেশকিছু কনটেইনার ডেলিভারি হলেও রেফার কনটেইনার ডেলিভারির হার একেবারে নগণ্য। যে কারণে এসব বন্দরের ধারণক্ষমতা ছাড়িয়ে যায়। এ অবস্থায় জাহাজ থেকে রেফার কনটেইনার নামানোর গতি শ্লথ হয়ে পড়ে। ফলে জাহাজের টার্ন অ্যারাউন্ড টাইম বেড়ে যাচ্ছে।

বন্দর সচিব মো. ওমর ফারুক জানান, গত ১২ মে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের জারি করা বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে দ্রুত এসব কনটেইনার ডেলিভারি নিতে আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের অনুরোধ জানানো হয়েছে। ১৬ মে পর্যন্ত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের পর ১৭ মে থেকে আমদানি পণ্যের রেফার কনটেইনারের ওপর ‘রেগুলেশন ফর ওয়ার্কিং চিটাগাং পোর্ট (কার্গো অ্যান্ড কনটেইনার) ২০০১’-এর ১৬০ ধারার আওতায় স্বাভাবিক ভাড়ার ওপর চারগুণ হারে পেনাল রেন্ট আরোপে বন্দর কর্তৃপক্ষ বাধ্য হবে বলে ওই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বন্দরের শতভাগ স্টোর রেন্ট মওকুফের সুযোগ নিয়ে কিছু ব্যবসায়ী বন্দর ইয়ার্ডকে গোডাউন হিসেবে ব্যবহার করছে। বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির মাধ্যমে পণ্যের দাম বাড়িয়ে অতিরিক্ত মুনাফা করতে এ ধরনের কৌশল নিয়ে থাকেন তারা। এদিকে আমদানিকারকদের যথাসময়ে রেফার কনটেইনার ডেলিভারি না নেওয়ার কারণে একদিকে স্থান সংকটে পড়ছে বন্দর, অন্যদিকে কনটেইনারগুলোর বিদ্যুৎ বিল বাবদ বিপুল অঙ্কের অর্থ খরচ হচ্ছে শিপিং লাইনগুলোর।

বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক খায়রুল আলম সুজন দেশ রূপান্তরকে বলেন, অনেক ক্ষেত্রে নানা কারণে আমদানিকারক রেফার কনটেইনারের পণ্য ডেলিভারি নেয় না। এসব পণ্য কাস্টমস নিলামে না ওঠানো পর্যন্ত সেখানে বিদ্যুৎ সংযোগ রাখতে হয় এবং বিদ্যুৎ বিল শিপিং লাইনকে পরিশোধ করতে হয়। এ ক্ষেত্রে শিপিং লাইনগুলোর বড় ধরনের আর্থিক লোকসান হয়ে থাকে।