এবার প্রশাসনের জন্য কভিড হাসপাতাল

পুলিশের পর এবার প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের করোনাভাইরাসের চিকিৎসার জন্য আলাদা হাসপাতাল করা হচ্ছে। রাজধানীর ফুলবাড়িয়ার সরকারি কর্মচারী হাসপাতালকে রূপান্তর করা হচ্ছে কভিড-১৯ হাসপাতালে। সেখানে আপাতত সাধারণ রোগীদের চিকিৎসা স্থগিত রেখে শুধু করোনায় আক্রান্তদের চিকিৎসা করা হবে। আগামী সপ্তাহে শুরু হবে রোগী ভর্তি।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব শেখ ইউসুফ হারুন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা সরকারি কর্মচারী হাসপাতালকে কভিড হাসপাতালে রূপান্তর করছি। এটি একটি ডেডিকেটেড হাসপাতাল হবে। ১৫ দিনের মধ্যে একটা পিসিআর মেশিন বসানো হবে। অন্যান্য প্রক্রিয়াও দ্রুত শেষ হবে।’

এর আগে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত পুলিশ সদস্যদের চিকিৎসার জন্য রাজধানীর তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকায় অবস্থিত বেসরকারি ইমপালস হাসপাতাল ভাড়া নেয় সরকার। ২৫০ শয্যার এ হাসপাতালে শুধু করোনায় আক্রান্ত পুলিশ সদস্যদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। সরকার যখন হাসপাতালটিকে কভিড-১৯ হাসপাতাল করার ঘোষণা দেয় তখনই কিছু নার্স চাকরি ছেড়ে চলে যান। কর্তৃপক্ষ নতুন করে ৪৮ জন নার্সকে নিয়োগ দিয়েছে। পুরনো-নতুন মিলিয়ে এখন সবাই ডিউটি করছেন বলে জানা গেছে। ২৫০ শয্যার রাজারবাগ কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালের ওপর চাপ কমাতে ইমপালস হাসপাতাল প্রাইভেট লিমিটেড প্রাথমিকভাবে আড়াই মাসের জন্য ভাড়া নেওয়া হয়েছে। এ চুক্তি বাড়ানো হবে কি না তা পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে।

গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত সারা দেশে আক্রান্ত পুলিশ সদস্যের সংখ্যা ১ হাজার ৯৪৩ জন। এর মধ্যে সুস্থ হয়েছেন ৩১০ জন; মারা গেছেন ৭ জন। প্রশাসনে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা এককভাবে জানে না কোনো মন্ত্রণালয়। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে কথা বলে জানা গেছে, তাদের আক্রান্তের সংখ্যাও কম নয়। তারা বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন।

রাজধানীর ফুলবাড়িয়ায় রেলওয়ে হাসপাতালটি ১৯৭৮ সালে সরকারি কর্মচারী হাসপাতালে রূপান্তর করা হয়। ২ দশমিক ০৩ একর জমির ওপর ১৫০ শয্যার এ হাসপাতালে বর্তমানে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। গত বছর ১২ মার্চ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একনেক সভায় সরকারি কর্মচারী হাসপাতালকে চার থেকে ১৬ তলা এবং ১৫০ থেকে ৫০০ শয্যায় উন্নীতকরণের প্রস্তাব অনুমোদন করেন।

সব হাসপাতাল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় পরিচালনা করলেও এ হাসপাতাল পরিচালনা করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিব হাসপাতালটির পরিচালক। বর্তমানে এ দায়িত্ব পালন করছেন অতিরিক্ত সচিব মুহ. মাহবুবুর রহমান। তিনি গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘করোনাভাইরাসের চিকিৎসা শুরু করতেই হবে। কারণ হাসপাতালেরই অনেক চিকিৎসক সাধারণ রোগীদের চিকিৎসাসেবা দিতে গিয়ে করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। সরকারের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। আমরা হাসপাতালটিকে কভিড-১৯ হাসপাতালে রূপান্তর করার কাজ শুরু করেছি।’

হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে, বর্তমানে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ১২ জন রোগী। তারা সাধারণ জ্বর, সর্দি-কাশি নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। নিজেরাও জানতেন না তারা কভিড-১৯-এ আক্রান্ত। তাদের চিকিৎসা দিতে গিয়ে এক ডজনেরও বেশি চিকিৎসক আক্রান্ত হয়েছেন।

সরকারি কর্মচারী হাসপাতালে ৭৬ জন চিকিৎসক রয়েছেন। তাদের সঙ্গে রয়েছেন ৪৯ জন নার্স। হাসপাতালটিতে ২৯টি কেবিন রয়েছে। ছয় শয্যাবিশিষ্ট আধুনিক আইসিইউসহ সাতটি অপারেশন থিয়েটার ও দুটি পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ড রয়েছে। দুটি অ্যাম্বুলেন্সও রয়েছে হাসপাতালটির। শনি থেকে বৃহস্পতিবার প্রতিদিন সাড়ে ৮টা থেকে দুপুর দেড়টা পর্যন্ত হাসপাতালের বহির্বিভাগ খোলা থাকে। জরুরি বিভাগ খোলা থাকে ২৪ ঘণ্টা। প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষার জন্য নমুনা সংগ্রহ করা হয় দুপুর ১২টা পর্যন্ত। নমুনার ফল দেওয়া হয় পরের দিন। সরকারি কর্মচারী ও তাদের পোষ্যদের বিনামূল্যে ওষুধ দেওয়া হয়। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ২৪ ঘণ্টা রোগী ভর্তি করা যায়। হাসপাতালটি পরিচালনার জন্য একটি ব্যবস্থাপনা কমিটি রয়েছে। ১৫ সদস্যের এ কমিটির প্রধান জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একজন মহাপরিচালক কমিটির সদস্য।

সরকারি কর্মচারী হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. মো. শাহ আলম গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকারি কর্মচারী হাসপাতালকে কভিড-১৯ হাসপাতাল করার জন্য ল্যাব তৈরি করছি। আইসিইউ, ভেন্টিলেশন ও অন্যান্য অনুষঙ্গিক কাজ শুরু হয়েছে।’

করোনাভাইরাসে আক্রান্তদের সেবা দিতে চিকিৎসক, নার্স থেকে শুরু করে মাঠপর্যায়ে যেসব সরকারি কর্মচারী কাজ করছেন, তাদের বীমা সুবিধার পরিবর্তে সরাসরি নগদ অর্থ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। সরকারি কর্মচারীদের গ্রেড এবং আক্রান্ত ও মৃত্যু অনুযায়ী আর্থিক সহায়তার পরিমাণ হবে ৫ থেকে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্প্রতি বিভিন্ন জেলার সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সে দেওয়া বক্তব্যে বলেন, ‘যেসব চিকিৎসক-স্বাস্থ্যকর্মী মানুষকে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন, তাদের পুরস্কৃত করতে চাই। তাদের একটা সম্মানীও দিতে চাই।’ চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকর্মীর পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালনকারী সরকারি কর্মচারী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য সবাইকে বিশেষ বীমা পলিসির আওতায় আনার ঘোষণা দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী।