বিশ্বখ্যাত ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবনের প্রধান আকর্ষণ রয়েল বেঙ্গল টাইগার, চিত্রল হরিণ ও সুন্দরী গাছ। আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর নজরদারিতে সম্প্রতি সুন্দরবনের বাঘ ও হরিণের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। হ্রাসও পেয়েছিল সুন্দরী গাছ পাচার। কিন্তু চলমান করোনাভাইরাসের কারনে ‘লকডাউন’ পরিস্থিতিতে নদ-নদী ও রাস্তাঘাট অনেকটা ফাঁকা থাকার সুযোগ কাজে লাগিয়ে অসাধু লোকজন ও চোরা শিকারিরা মেতে উঠেছে হরিণ শিকার এবং গাছ পাচারে।
সংঘবদ্ধ চোরা শিকারি চক্র হরিণ শিকার করে তার মাংস ও চামড়া বিক্রিসহ জ্যান্ত হরিণ পাচার করছে বলে খবর পাওয়া গেছে। আবার ক্ষেত্র বিশেষে কার্যসিদ্ধির জন্য ভিআইপিদের টিপস হিসেবে এসব চক্র হরিণের মাংস, শিং ও চামড়া উপহার পাঠানোর অভিযোগও পাওয়া যাচ্ছে।
চোরা শিকারিদের দমন করা না গেলে বিরল প্রজাতির এই হরিণ অস্তিত্ব সংকটে পড়তে পারে। শুধু বন্যপ্রাণীই নয় বনের সুন্দরী, পশুর গাছ নিধনসহ লকডাউনে বিষ দিয়ে মাছ শিকারের মহা উৎসব চলছে বনের অভ্যন্তরের নদী-খালে। সংঘবদ্ধ গাছ চোর, বিষ প্রয়োগকারী দুর্বৃত্ত ও চোরা শিকারিদের তৎপরতা বৃদ্ধি পাওয়ায় সুন্দরবনে রেড এলার্ট জারি করে টহল জোরদার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে বন বিভাগ।
সুন্দরবনকে প্রশাসনিক সুবিধার জন্য দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে। বাগেরহাট জেলার শরণখোলা রেঞ্জ ও চাঁদপাই রেঞ্জ নিয়ে পূর্ব সুন্দরবন বিভাগ। আর পশ্চিম সুন্দরবন বিভাগে রয়েছে খুলনা ও সাতক্ষীরা রেঞ্জ এলাকা। এর মধ্যে বাগেরহাটের পূর্ব সুন্দরবন বিভাগে মাত্র ৩৬ দিনের ব্যবধানে পুলিশ ও বন রক্ষীরা অভিযানে চালিয়ে চোরা শিকারিদের কবল থেকে ২৪টি জীবিত হরিণ, ৭৯ কেজি হরিণের মাংস, নাইলনের দড়ি দিয়ে তৈরি ৬ হাজার ৬ শ ফুট হরিণ ধরার ফাঁদ উদ্ধার করেছে। এ সময়ে ৭ জন চোরা শিকারিকে আটকসহ তাদের শিকার কাজে ব্যবহৃত ৪ টি ট্রলার ও দুইটি নৌকা জব্দ করা হয়েছে।
সুন্দরবন বিভাগ জানায়, গত ৫ মে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে টিয়ারচর থেকে ভোর রাতে হরিণ শিকারকালে তিন চোরা শিকারিকে আটক করে বন বিভাগ। সুন্দরবনে পাথরঘাটার চরদোয়ানী এলাকার শীর্ষ তালিকাভুক্ত চোরা শিকারি মালেক গোমস্তার লোক বলে জানা যায়।
এ সময় শিকারিদের বনের ভেতর পেতে রাখা হরিণ শিকারের ফাঁদে আটকে থাকা জীবিত ২২টি চিত্রল হরিণ উদ্ধার করা হয়। জব্দ করা হয় ৩০ কেজি হরিণের মাংস, ৭০০ ফুট হরিণ শিকারের ফাঁদ, ৩ টি ট্রলার ও ১ টি নৌকা। পরে উদ্ধারকৃত হরিণগুলো সুন্দরবনে অবমুক্ত করা হয়।
গত ২ মে শরণখোলা রেঞ্জের ডিমের চর থেকে দুপুরে হরিণ শিকারের প্রস্তুতিকালে দুই চোরা শিকারিকে আটক করে বন বিভাগ। এ সময় হরিণ শিকারের জন্য বনের ভেতর পেতে রাখা ১৫শ ফুট নাইলনের দড়ির ফাঁদ উদ্ধার ও একটি ট্রলার আটক করা হয়।
গত ২৭ এপ্রিল চাঁদপাই রেঞ্জের ঢাংমারি স্টেশনের বন রক্ষীরা গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে ঢাংমারি থেকে ৩ কেজি হরিণের মাংসসহ এক চোরা শিকারিকে আটক করে। গত ২৫ এপ্রিল চাঁদপাই রেঞ্জের বাদামতলা খাল এলাকায় অভিযান চালিয়ে ২ হাজার ৭০০ ফুট নাইলনের দড়ির হরিণ ধরা ফাঁদ উদ্ধার করে বন বিভাগ। এ সময়ে কোন চোরা শিকারিকে আটক করতে পারেনি বন বিভাগ। গত ২৪ এপ্রিল ভোরে সুন্দরবন সংলগ্ন সোনাখালী গ্রামের বাদল মোল্লার পুকুর পাড় থেকে এলাকাবাসী একটি হরিণ ধরে মঠবাড়িয়া থানায় নিয়ে যায়। পুলিশ বনবিভাগকে খবর দিলে তারা মাদি হরিণটি উদ্ধার করে ওই দিন বিকেলে পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জ সংলগ্ন বনে অবমুক্ত করে।
এ দিকে গত ২৩ এপ্রিল দুপুরে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে শরণখোলা স্টেশন অফিসের বন রক্ষীরা শরণখোলা উপজেলার সোনাতলা গ্রামের জাহাঙ্গীর হোসেনের বাড়ি সংলগ্ন মাঠে কর্কশীটে রাখা পাচারের অপেক্ষায় থাকা ১০ কেজি হরিণের মাংস উদ্ধার করে। তবে কোন পাচারকারীকে আটক করতে পারেনি। গত ২২ এপ্রিল একই উপজেলার শাপল বাজার ইউনিয়নের বলেশ্বর নদীর পার হয়ে লোকালয়ে আসার সময় সুন্দরবনের প্রায় বিলুপ্ত প্রজাতির মায়া হরিণ উদ্ধার করে দুলাল নামের এক জেলে। বনবিভাগ ওই হরিণটি বিকালে শরণখোলা রেঞ্জ সংলগ্ন বনে অবমুক্ত করে। অপরদিকে গত ১৭ এপ্রিল শরণখোলা রেঞ্জের চান্দেশ্বর এলাকায় বন রক্ষীরা অভিযান চালিয়ে ৭’শ ফুট, ১০ এপ্রিল কচিখালী এলাকায় ৫’শ ফুট এবং গত ২৮ মার্চ একই রেঞ্জের চরখালী এলাকা থেকে ৫’শ ফুট হরিণ ধরার ফাঁদ জব্দ করে। তবে কোন চোরা শিকারিকে আটক করতে পারেনি।
৩০ মার্চ সুন্দরবন বিভাগ এবং পুলিশ যৌথভাবে অভিযান চালিয়ে সুন্দরবন থেকে শিকার করে নৌকা যোগে লোকালয়ে ফেরার সময় চাঁদপাই রেঞ্জের সুন্দরবন সংলগ্ন চটেরহাট এলাকার নিত্তিখালী খাল থেকে ৩৬ কেজি হরিণের মাংসসহ এক শিকারিকে আটক করে। এ সময় একটি নৌকা জব্দ করা হয়।
সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকার মৎস্যজীবী ও বনজীবীরা জানায়, চোরা শিকারিদের সংঘবদ্ধ চক্র সুন্দরবনের গভীর অরণ্যের হরিণের আবাসস্থল এলাকায় অবস্থান নেয়। কখনো ট্রলারে, কখনও নৌকায় আবার কখনো বনের গাছে মাচা বেঁধে হরিণের গতিবিধি লক্ষ্য করে তারা। শিকারিরা রাতে বিশেষ করে কৃষ্ণ পক্ষের রাতে জঙ্গলে বেশি হানা দেয়। সুন্দরবনে যে অঞ্চলে কেওড়া গাছ বেশি জন্মে, হরিণের আনাগোনা সেখানে সবচেয়ে বেশি থাকে। ভোরে অথবা পড়ন্ত বিকেলে কিংবা চাঁদনি রাতে হরিণ চরাঞ্চলে ঘাস খায়। শিকারিরাও সুযোগ বুঝে গুলি করে কিংবা ফাঁদ পেতে হরিণ শিকার করে। হরিণ শিকারের পর গোপন আস্তানায় বসে মাংস, চামড়া ও শিং আলাদা করে। পরে তা বিক্রি করা হয় সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকাগুলোতে। এক কেজি হরিণের মাংস ৭০০ থেকে ৮০০ টাকায় বিক্রি হয়। সুন্দরবন সংলগ্ন মোংলা, দাকোপ, রায়েন্দা, তাফালবাড়ীয়া, পাথরঘাটা, মঠবাড়ীয়াসহ বনের আশপাশ এলাকায় হরিণের মাংস বিক্রি হয় সবচেয়ে বেশি। এছাড়া শিকারিরা জাল দেয়া বা বরফ দেয়া মাংস, জ্যান্ত হরিণ ও হরিণের চামড়া ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাচার করে থাকে।
কাজ হাসিলের জন্য টিপস হিসাবেও হরিণের মাংস বা চামড়ার রয়েছে বহুল ব্যবহার। অনেকে আবার ড্রয়িংরুমের শোভাবর্ধন করেন হরিণের চামড়া দিয়ে।
বাগেরহাটের পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. বেলায়েত হোসেন বলেন, সুন্দরবন বিভাগসহ প্রশাসনের কঠোর নজরদারির কারণে ইতিমধ্যে সুন্দরবন থেকে বেশ কিছু হরিণ ও হরিণ ধরার ফাঁদ ও মাংস উদ্ধার করা হয়েছে। এসব ঘটনায় বন আইনে মামলাও করা হয়েছে। করোনা পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে শিকারিদের তৎপরতা বৃদ্ধি পাওয়ায় সুন্দরবনে রেড এলার্ট জারি করে বন বিভাগের টহল জোরদার করা হয়েছে। করোনাভাইরাসের সংক্রমণের মধ্যেও বন রক্ষীরা বনজ সম্পদ ও বন্যপ্রাণী রক্ষায় নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি।