কন্টেইনার ডেমারেজ চার্জ না নেওয়ার দাবি ডিসিসিআইর

করোনা পরিস্থিতিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ কন্টেইনার ডেমারেজ চার্জ মওকুফ করছে। কিন্তু এই সময় সরকারের নির্দেশনা অমান্য করে কন্টেইনার ডেমারেজ চার্জ আরোপ অব্যাহত রেখেছে শিপিং কোম্পানিগুলো। চলমান সংকটে এ ধরনের চার্জ নেওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ঢাকার ব্যবসায়ীদের সংগঠন ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই)। তাদের দাবি, বাড়তি চার্জে পণ্য উৎপাদন খরচ বাড়বে। ফলে রপ্তানি প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হবে। একই সঙ্গে স্থায়ী ভোক্তাদের জন্য আমদানি করা পণ্যের দামও বেড়ে যাবে। তাই এ পরিস্থিতিতে কন্টেইনার ডেমারেজ চার্জ না আরোপের পাশাপাশি নতুন বা অতিরিক্ত চার্জ আরোপ থেকেও বিরত থাকার দাবি তুলেছে সংগঠনটি।

গতকাল ডিসিসিআইর বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, করোনা মোকাবিলায় সরকার সারা দেশে গত ২৬ মার্চ থেকে সাধারণ ছুটি (কার্যত লকডাউন) ঘোষণা করেছে, যা আগামী ৩০ মে পর্যন্ত বর্ধিত করা হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে সরকার সমুদ্রবন্দরগুলোর স্বাভাবিক কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে কাজ করলেও অন্যান্য সেবা খাত বেশিরভাগই বন্ধ বা সীমিত থাকায় পণ্য বা কন্টেইনার খালাসে অনিচ্ছাকৃত দীর্ঘসূত্রতা হয়ে যাচ্ছে। এমনিতেই করোনার কারণে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে প্রভাব পড়েছে, ব্যবসা-বাণিজ্যও তার স্বাভাবিক গতিতে ফিরতে পারছে না। তার ওপর লকডাউন অবস্থায় কিছু বিদেশি শিপিং কোম্পানি বা এজেন্ট তৃতীয় পক্ষ আমদানিকারকদের ওপর তাদের মর্জিমতো অতিরিক্ত কন্টেইনার ডিটেনশন বা ডেমারেজ চার্জ আরোপ করছে। কোনো নির্দিষ্ট নীতিমালা না থাকায় শিপিং কোম্পানি বা এজেন্ট বা তাদের মনোনীত ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার্সরা এ অতিরিক্ত চার্জ আরোপ করতে পারছেন। শিপিং কোম্পানি অথবা তাদের মনোনীত এজেন্ট অনিয়ন্ত্রিত কন্টেইনার ডিটেনশন বা ডেমারেজ চার্জ আরোপের ফলে আমদানিকৃত উৎপাদনমুখী শিল্পের কাঁচামালের মূল্য বাড়ছে, যা আমাদের বিশ্ববাজারে রপ্তানি সক্ষমতাকে কমাচ্ছে। স্থানীয় ভোক্তাদের জন্য আমদানি করা পণ্যের মূল্যও এতে বাড়ছে।

ডিসিসিআই বলছে, এর মধ্যে নৌপরিবহন অধিদপ্তর গত ২৯ এপ্রিল এক বিজ্ঞপ্তিতে শিপিং লাইনস বা তাদের মনোনীত এজেন্টদের আমদানিকারকদের ওপর লকডাউন চলাকালে কোনো প্রকার ডেমারেজ চার্জ আরোপ না করতে নির্দেশনা দেয়। নৌ-পরিবহন অধিদপ্তর থেকে বিজ্ঞপ্তি জারি সত্ত্বেও শিপিং কোম্পানিগুলো কন্টেইনার ডেমারেজ চার্জ আরোপ অব্যাহত রেখেছে, যা এ কঠিন সময়ে আমদানিকারকদের ওপর বাড়তি বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

লকডাউন চলাকালে শিপিং লাইনস বা এজেন্টগুলোর কন্টেইনার ডেমারেজ চার্জ আরোপ না করার পাশাপাশি নতুন বা অতিরিক্ত চার্জ আরোপ থেকেও বিরত থাকার দাবি করে ডিসিসিআই। সংগঠনটি জানায়, ‘পোর্ট অর্ডিন্যান্স ১৯৭৬’ মোতাবেক চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে পারে। তাছাড়া বিদেশি শিপিং কোম্পানিগুলোর জন্য একটি অভিন্ন নীতিমালা থাকা উচিত। এতে আমদানি-রপ্তানি পণ্যের জাহাজীকরণের সময় যৌক্তিক ও যথোপযুক্ত হারে কন্টেইনার ডেমারেজ চার্জ নির্ধারিত হতে পারে।

‘জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ২০০৬ সালে জারিকৃত প্রজ্ঞাপন মোতাবেক যে লাইসেন্স আইনের অধীন শিপিং লাইনের এজেন্টগুলো বা ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার্সরা পরিচালিত হয়ে থাকে সেখানে স্পষ্ট করে বলা আছে, এজেন্টসমূহ বা ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার্সদের রাষ্ট্র প্রণীত বা যথাযথ কর্তৃপক্ষ প্রণীত আইন, নীতিমালা, বিধিসমূহ, নির্দেশনা, বিজ্ঞপ্তি বা নোটিস মেনে চলতে হবে অন্যথায় ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার্স বা শিপিং এজেন্ট লাইসেন্স বাতিল হতে পারে। যেহেতু এজেন্ট বা ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার্সরা মূল শিপিং লাইনসের হয়েই কাজ করেন তাই মূল শিপিং লাইনসগুলোকেও এই নির্দেশনা মেনে চলা উচিত। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতি আহ্বান জানানো যাচ্ছে যে নৌ-পরিবহন অধিদপ্তর জারিকৃত নির্দেশনাগুলোকে রাষ্ট্রীয় নির্দেশনা হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে যেন লকডাউন চলাকালে সংগৃহীত কন্টেইনার ডেমারেজ চার্জ শিপিং লাইনসের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আউটওয়ার্ড রেমিট্যান্স হিসেবে বিদেশি মুদ্রায় পরিশোধ না করা হয়।

সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সর্বোচ্চ কন্টেইনার ডেমারেজ চার্জ কত হতে পারে তার একটি সুনির্দিষ্ট সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করা প্রয়োজন। কারণ মাঝেমধ্যে দেখা যায়, কনসাইনমেন্ট বা চালানের মোট মূল্যের চেয়ে ক্রমবর্ধিত ডেমারেজ চার্জ বেশি নির্ধারিত হয়ে যায়। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ মার্চেন্ট শিপিং অর্ডিন্যান্স ১৯৮৩-এর ৭৬ অনুচ্ছেদ পুনর্বহাল করা যেতে পারে, এতে আমদানিকারকদের ওপর তাদের পূর্বানুমোদন ছাড়া শিপিং লাইনসগুলো মর্জিমতো ডেমারেজ চার্জ আরোপ করতে পারবে না। অন্যান্য দেশের উদাহরণ দিয়ে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ভারত, নিউজিল্যান্ড শিপিং লাইনসগুলোকে ইতিমধ্যে লকডাউন পরিস্থিতি বিবেচনায় তৃতীয় পক্ষ আমদানিকারদের ওপর ডেমারেজ চার্জ আরোপ না করতে অনুরোধ করেছে। ভারতের ও নিউজিল্যান্ডের শিপিং লাইনসগুলো তাদের দেশের নির্দেশনা মেনে আমদানিকারকদের চার্জ মওকুফ করে চিঠি দিয়েছে।