চাল চুরি আর তেল মজুদের পর এবার দুর্বৃত্ত চক্র আয়েশ করে বসেছিল নিম্নআয়ের মানুষদের জন্য নগদ সহায়তার টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ধান্দায়। সরকারের ত্বরিত সাড়ার কারণে তারা আপাতত সফল হতে পারেনি। খবর পেয়েই তালিকা সংশোধনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। গতকাল রবিবার রাতে সংশোধিত পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরির কাজ শেষ হয়েছে।
তথ্য ও যোগাযোগ বিভাগের (আইসিটি) সচিব এন এম জিয়াউল আলম গতকাল রবিবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সব ডেটা কালেকশন হয়েছে। ইনপুট দেওয়া হয়েছে। এখন যাস্ট প্রিন্ট হবে। তারপরই অর্থ বিভাগকে হ্যান্ডওভার করা হবে।’
সরকারের এত বড় কাজে ১৫ শতাংশ তথ্য ভুল কীভাবে থাকে জানতে চাইলে আইসিটি বিভাগের সচিব বলেন, ‘ভুল থাকতেই পারে। আগে নিয়ম ছিল একটা নম্বর হলেই হবে। পরে স্বচ্ছতার জন্য নিয়ম করা হলো যার নাম তারই মোবাইল নম্বর হতে হবে। এই জায়গা থেকেই ভুলটা হয়েছে। সেটা সংশোধন করা হয়েছে।’
আইসিটি সচিব জানান, একটা নম্বরে একবারই টাকা ঢুকবে। একই নম্বরে দ্বিতীয়বার টাকা ঢুকবে না। স্বচ্ছতার জন্য এই নিয়মটিও করা হয়েছে।
রিকশা বা ভ্যানচালক, দিনমজুর, ফেরিওয়ালাসহ যারা দিন আনে দিন খায় এমন ব্যক্তি, যারা করোনাভাইরাস সংকটে আয়-উপার্জন হারিয়ে দুর্দশায় পড়েছেন তাদের নগদ অর্থ সহায়তা দেওয়ার জন্য সরকার ৫০ লাখ পরিবারকে বাছাই করেছে। এই তালিকায় যাদের নাম থাকবে তারা সরকারের অন্যান্য সুবিধাভোগী হতে পারবেন না। মূলত প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে করা এই তালিকা তৈরিতে স্থানীয় সংসদ সদস্যদের উল্লেখযোগ্য কোনো ভূমিকাই নেই। সেই তালিকায় ভুলের খবরে রাজনৈতিক মহলে এমনকি প্রশাসনেও তোলপাড় চলছে। এই তালিকায় তৃণমূল পর্যায়ের ওয়ার্ড কমিশনার বা মেম্বারদের যুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু অনেক কমিশনার বা মেম্বার দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন তারা তালিকা তৈরির উদ্দেশ্যই জানতেন না। তাদের বলা হয়েছে ত্রাণের তালিকা করতে। এ কারণে অনেক জায়গায় প্রকৃত সহায়তা প্রত্যাশীরা অন্তর্ভুক্ত হতে পারেননি।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব শাহ কামাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নগদ সহায়তা কর্মসূচিতে কোনো ধরনের অনিয়ম হলে সরকার মানবে না। যারা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত থাকবেন তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এই তালিকাভুক্তদের সহায়তা শুরু হয়েছে কি-না জানতে চাইলে শাহ কামাল বলেন, ‘কর্মসূচিটি উদ্বোধন হয়েছে। পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরির পর অর্থ বিতরণের কাজটি করবে অর্থ বিভাগ।’
প্রতি জেলার পাঁচজন সুবিধাভোগীর মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্টে আড়াই হাজার করে টাকা পাঠিয়ে গত বৃহস্পতিবার এই কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর কোনো কোনো ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ও সদস্যের মোবাইল নম্বর ২০ থেকে ৩০ জন বা তারও বেশি উপকারভোগীর নামের পাশে থাকার বিষয়টি প্রকাশিত হয়। এমনকি একই মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে ২০০ কার্ড করার অভিযোগও উঠেছে। এ নিয়ে গত কয়েক দিন ধরে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা চলছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের ত্রাণ শাখার উপসচিব আবুল খায়ের মো. মারুফ হাসান জানান, উদ্বোধনের সময় প্রধানমন্ত্রী যে কয়েকজনের মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠিয়েছিলেন তার বাইরে এখনো অন্য সুবিধাভোগীদের অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠানো হয়নি। তালিকা মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধিরা করলেও বিষয়টি সমন্বয় করছে আইসিটি ডিভিশন।
ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা জানান, ক্ষতিগ্রস্ত ৫০ লাখ পরিবারকে নগদ সহায়তা দিতে যে তালিকা করা হয়েছিল, তার ১৫ শতাংশে একই মোবাইল নম্বর একাধিকবার ব্যবহার করা রয়েছে। কিছু কার্ডে এনআইডি সংক্রান্ত জটিলতাও রয়েছে। তালিকা করার সময় যাদের মোবাইল নম্বর পাওয়া যায়নি তাদের নামের পাশে যারা তালিকা করেছেন তাদের মোবাইল নম্বর বারবার বসিয়ে দেওয়া হয়েছে।
এর আগে এই করোনাভাইরাস সংকটের মধ্যেই ত্রাণের চাল আত্মসাতের অভিযোগে গ্রেপ্তার ও সাময়িকভাবে বরখাস্ত হয়েছেন বেশ কয়েকজন জনপ্রতিনিধি। অনেক চেয়ারম্যান ও মেম্বারের বিরুদ্ধে গরিবের চাল আত্মসাতের মামলা হয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশনে।
নিয়ম অনুসারে ওয়ার্ড পর্যায়ে কাউন্সিলরকে প্রধান করে গঠিত কমিটির নাম তালিকা যায় উপজেলা নির্বাহী অফিসার বা ইউএনও অফিসে। সেটা যাচাই বাছাই করে জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠানো হয়। জেলা প্রশাসক সেই তালিকা তথ্য ও যোগাযেগ প্রযুক্তি বিভাগে পাঠান।
বিভিন্ন জায়গায় প্রশাসনের হস্তক্ষেপে সচ্ছলদের তালিকায় যুক্ত করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে শেরপুর ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এসব জেলায় ওয়ার্ড সদস্যরা প্রধানমন্ত্রীর নগদ অর্থ সহায়তার বিষয়টি অবগত ছিলেন না। তারা ওএমএসের চাল দেওয়ার তালিকা তৈরি করার নির্দেশনা পান বলে অভিযোগ করেছেন। এ দুই জেলার একাধিক ওয়ার্ড কাউন্সিলর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। ফলে মোবাইল নম্বরের ব্যাপারে তারা খুব বেশি সচেতন ছিলেন না।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে শেরপুর জেলা প্রশাসক আনার কলি মাহবুব দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শেরপুর জেলায় ৫২ হাজার মানুষের তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে। প্রথম থেকেই এটি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পাঠানোর নির্দেশনা মেনেই করা হয়েছিল, এজন্য খুব বেশি ত্রুটি ছিল না। তবে নাম ও মোবাইল সংক্রান্ত কিছু ত্রুটি সংশোধন করে আমরা সার্ভারে আপলোড করে দিয়েছি।’
এক প্রশ্নের জবাবে আনার কলি মাহবুব বলেন, ‘কোনো ওয়ার্ড সদস্য যদি নগদ অর্থ সহায়তায় ব্যাপারে না জেনে থাকেন সেটা তার ব্যর্থতা। আমরা মাঠ প্রশাসনকে যথাযথ নির্দেশনা দিয়েই তালিকা করেছি। ফলে এক নাম বা মোবাইল নম্বর একাধিক বার যায়নি।’
একই কথা জানান জামালপুর জেলা প্রশাসক এনামুল হক। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জামালপুর জেলায় ১ লাখ লোকের তালিকা করা হয়েছে। এর আগে ওয়ার্ড পর্যায়ে কমিটি করা হয়েছিল। তাদের সুপারিশ অনুসারেই তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে।’
তবে অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই তালিকা করার ব্যাপারটি প্রায় পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করেছে স্থানীয় প্রশাসন। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক নেতা, মন্ত্রী বা এমপিরা খুব বেশি প্রভাব ফেলতে পারেননি। মূলত প্রশাসনের করা তালিকায় ১৫ শতাংশ ত্রুটি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয় প্রশাসন কোনোভাবেই দায় এড়াতে পারে না বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।