মানিকগঞ্জের বাসিন্দা ইদি আমিনের ১০ বছর বয়সী সন্তানের কিডনিতে ক্যানসার। দুই বছর আগে তার একটি কিডনি অপসারণ করা হয়। পরে সেখানে টিউমার ধরা পড়লে আবারও অস্ত্রোপচার করা হয়। রাজধানীর মহাখালীর ক্যানসার হাসপাতালে নিয়মিত কেমোথেরাপি নিতে হয় শিশুটিকে। গত বৃহস্পতিবার ছেলেকে থেরাপি দিতে এসে চরম বিড়ম্বনায় পড়েছেন ইদি আমিন। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত নয়, তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত শিশুকে ঢুকতে দেওয়া হবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ। ফলে অসহায় পিতা সন্তানের করোনা শনাক্তের পরীক্ষার জন্য দুই রাত ধরে অপেক্ষা করছেন কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভিনিউয়ের বেতার ভবনের সামনে।
গতকাল সোমবার ভোর ৪টায় ইদি আমিনের সঙ্গে কথা হয়। ফুটপাতে পত্রিকা বিছিয়ে বেতার ভবনের দেয়ালে হেলান দিয়ে বসেছিলেন তিনি। কান্নাজড়িত কণ্ঠে ইদি আমিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পোলাটার অবস্থা খুব খারাপ। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব থেরাপি দিতে হবে। কিন্তু করোনা টেস্ট করাতেই পারছি না। দুই রাত ধইরা অপেক্ষা করতাছি সিরিয়াল পাইতাছি না। আইজক্যা না পাইলে পোলাটার আমার কী হইবো আল্লায় জানে!’
ইদি আমিনের মতোই দুই রাত ধরে সেখানে আছেন সিরাজগঞ্জের আলামিন মিয়া। তিনিও গত বৃহস্পতিবার ক্যানসার আক্রান্ত স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য ঢাকায় এসেছেন। করোনা আক্রান্ত কি না, তা নিশ্চিত না হওয়ায় তার স্ত্রীকেও হাসপাতালে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। দুই রাত ধরে স্ত্রীকে নিয়ে ফুটপাতে অপেক্ষা করছেন আলামিন। তিনি বলেন, ‘শনিবার রাত ১১টায় আসি। সারা রাত থাকার পর সকালে স্লিপ দিছে। আমি পাই নাই। আইজকা ইফতারের আগে আইছি। এখন রাইত চাইরটা। সকালে স্লিপ দিবে। ক্যানসারের রুগী কী কষ্ট করতাছে কইয়া শ্যাষ করার পারুম না।’
গতকাল রাতে রাজধানীর মুগদা জেনারেল হাসপাতাল ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, করোনাভাইরাস শনাক্তের পরীক্ষার জন্য ফুটপাতে অপেক্ষা করছেন শত শত মানুষ। করোনা আক্রান্তের পর সুস্থ বোধ করা ব্যক্তিও এসেছেন দ্বিতীয়বার পরীক্ষা করতে। শাহবাগ মোড় থেকে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের ফটক পর্যন্ত ফুটপাতে দু-তিন ফুট দূরত্বে পত্রিকা বিছিয়ে বসে আছেন সবাই। অধিকাংশেরই টানা দু-তিন রাত নির্ঘুম কেটেছে। ক্লান্ত শরীরে কেউ কেউ ঘুমাচ্ছেন। বসে বসে ঝিমাচ্ছেন অনেকেই। করোনার উপসর্গ য, সর্দি, মাথাব্যথা নিয়ে যারা এসেছেন তাদের অবস্থা খুবই করুণ। ঠিকমতো বসতেও পারছেন না অনেকেই। যাদের সঙ্গে কোনো স্বজন আসেনি তৃষ্ণায় কাতরালেও তাদের পানিও দিচ্ছে না কেউ! আশপাশের সব মানুষই ভোগান্তিতে পরিশ্রান্ত।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, করোনাভাইরাস (কভিড-১৯) শনাক্তে বিএসএমএমইউ কর্র্তৃপক্ষ হাসপাতালের বিপরীতে বেতার ভবনের দোতলায় ল্যাব চালু করে গত ১ এপ্রিল। অফিস চলাকালে প্রতিদিন সকাল সাড়ে ৮টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত এ কার্যক্রম চলছে। এজন্য কোনো খরচ নেওয়া হয় না। দৈনিক এ ল্যাবে ২০০টি পরীক্ষা করা হয়। তবে প্রতিরাতেই পরীক্ষার জন্য আসেন কমপক্ষে চার শতাধিক ব্যক্তি। সকালে বারডেম হাসপাতালের সামনে থেকে অপেক্ষমাণ ব্যক্তিদের সিøপ দেওয়া শুরু হয়। হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের দিকে যেতে যেতে যেখানে শেষ হয় সেখানেই বন্ধ করা হয় ওই দিনের স্লিপ বিতরণ কার্যক্রম। যারা পান না তারা ক্লান্ত শরীরে ঘরে ফিরে যান। আগেভাগে জায়গা দখল করতে কেউ কেউ আবার সেদিন বিকেলেই চলে আসেন। অনেকে আবার সেখানেই থেকে যান। কারণ করোনা আক্রান্ত সন্দেহে বাড়ির মালিক-প্রতিবেশী তাদের বাসায় প্রবেশ করতে দেন না বলেও অভিযোগ করেছেন অনেকে।
এমনই একজন মনিরুল ইসলাম। পেশায় অ্যাম্বুলেন্সচালক ওই ব্যক্তি থাকেন ঢাকার দোলাইরপাড় এলাকায়। মনিরুল জানান, অ্যাম্বুলেন্সে রোগী আনা-নেওয়া করায় এলাকার কয়েকজন বাড়িওয়ালা তাকে বাসায় যেতে দিচ্ছেন না। তাদের দাবি, তিনি করোনায় আক্রান্ত। তারা জোর করে তাকে করোনা পরীক্ষার জন্য পাঠিয়েছেন। তবে গত তিন দিন ঘুরেও তিনি সিরিয়াল (স্লিপ) পাননি। প্রথম দিন বাসায় ফেরত গেলেও তাকে ঢুকতে দেননি ওই বাড়িওয়ালারা। গতকাল যখন কথা হয়, তখন মনিরুল ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের সামনের ফুটপাতে একটি ট্রলিতে শুয়ে ছিলেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে আরও বলেন, ‘আমার বাড়িওয়ালা কিচ্ছু বলেন না। কিন্তু আশপাশের বাড়িওয়ালারা এলাকায় ঢুকতে দেন না, বলে আমি করোনা রোগী টানি এজন্য আমিও আক্রান্ত। কিন্তু আমার শরীরে কোনো সমস্যা নেই। আইজক্যাও সিরিয়াল না পাইলে বাসায় ফিরতে পারুম না!’
করোনা শনাক্তের পর চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ বোধ করায় দ্বিতীয়বার পরীক্ষা করাতে আসা ব্যক্তিরাও অপেক্ষা করছেন ফুটপাতে। মুখে মাস্ক ছাড়া তেমন সুরক্ষা পোশাক নেই কারও। গত ৪ মে পরীক্ষায় মগবাজারের তরুণ সুমনের করোনা ধরা পড়ে। বাসায় থেকে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়েছেন তিনি। আবারও পরীক্ষা করাতে আসা সুমন বলেন, ‘অনলাইনে দেখে দেখে চিকিৎসা নিয়েছি। ডাক্তারদের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছি। তারা যা পরামর্শ দিয়েছেন সেটা করে সুস্থ হয়েছি। করোনার পরীক্ষা করাতে এলে দিনের পর দিন অপেক্ষা ভোগান্তিতে অনেকে করোনায় আক্তান্ত হচ্ছে।’
পরীক্ষা করতে আসা ব্যক্তিদের অনেকে অভিযোগ করেন, রাত জেগে যারা অপেক্ষা করেন তাদের মধ্যে সব স্লিপ দেওয়া হয় না। প্রভাবশালীরা ফোন করে সিরিয়াল নিয়ে নেন। এছাড়া দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করায় যাদের শরীরে করোনাভাইরাস নেই তারাও ‘আক্রান্ত ব্যক্তিদের’ সংস্পর্শে আসায় ঝুঁকির মুখে রয়েছেন। সঙ্গে আসা স্বজনরাও ঝুঁকিতে পড়ছেন। মিরপুরের ইকরামুল হক বলেন, ‘আমি দুদিন ঘুরতাছি। আমার স্ত্রী আইতাছে সাথে। হ্যায় তো রোগীদের কাছে আইতাছে তারেও তো করোনা ধরব।’ এসব অভিযোগের বিষয়ে বিএসএমএমইউ কর্র্তৃপক্ষের কোনো বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
এ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য অধিকার আন্দোলন সম্পর্কিত জাতীয় কমিটির চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশিদ-ই-মাহবুব দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘করোনাভাইরাস বৈশ্বিক সমস্যা। কিন্তু সরকার এটা এককভাবে তাদের সমস্যা মনে করছে। এর পরীক্ষা-চিকিৎসা সব নিজেদের মধ্যে রেখে দিয়েছে। এ রোগ মোকাবিলায় সর্বাত্মক স্বাস্থ্য প্রস্তুতি দরকার ছিল। কিন্তু প্রাইভেট স্বাস্থ্য খাত এখনো এর বাইরে আছে। ফলে মানুষ সহজলভ্য সুবিধা পাচ্ছে না। জনগণের কাছে করোনা চিকিৎসা যাতে সহজলভ্য করা যায় সেজন্য অতি জরুরি পদক্ষেপ দরকার।’