করোনার মহামারী যখন প্রবল বেগে সারা দেশকে পর্যুদস্ত করে দিচ্ছে তখনই বঙ্গোপসাগরে ধেয়ে আসছে সুপার সাইক্লোন আম্পান। বৈশ্বিক আবহাওয়াবিদরা ইতিমধ্যেই সতর্ক করে দিয়েছেন যে, একুশ শতকে বঙ্গোপসাগরের প্রথম সুপার সাইক্লোন আম্পান। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ টাইফুন সতর্কতা কেন্দ্রের বরাত দিয়ে সিএনএন জানিয়েছে, বঙ্গোপসাগরে রেকর্ড করা ঝড়গুলোর মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় আম্পান, যার বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ২৭০ কিলোমিটার। আম্পানকে আটলান্টিক মহাসাগরের হ্যারিকেন ক্যাটাগরি-৪ এবং পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের সুপার টাইফুনের সঙ্গে তুলনা করছেন তারা। এ থেকে আম্পানের ভয়াবহতা সম্পর্কে অনুমান করা যেতে পারে। বঙ্গোপসাগরের আগের সুপার সাইক্লোনে ১৯৯৯ সালে প্রায় ১৫ হাজার গ্রাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ১০ হাজারেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারায়। তবে সেবার সুপার সাইক্লোনটি ভারতের ওড়িশা রাজ্যের পারাদ্বীপে আঘাত হানায় বাংলদেশে তার খুব একটা আঁচ লাগেনি। এবার ইতিমধ্যেই আম্পানের গতিবেগ পরিবর্তনে আশঙ্কা করা হচ্ছে এটা প্রবল বেগে ধাবিত হয়ে বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় আঘাত হানতে যাচ্ছে। আম্পান বাংলাদেশকে দ্বিমুখি সংকটে ফেলে দিয়েছে। একদিকে মারাত্মক শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় সামলিয়ে জানমালের ক্ষয়ক্ষতি কমানোর প্রস্তুতি, আরেকদিকে করোনার স্বাস্থ্যগত বিপর্যয় ঠেকানোর চিন্তা। দুই দিক সামলানোর চ্যালেঞ্জ বেশ জটিল তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
আবহাওয়া দপ্তর জানিয়েছে, ঘূর্ণিঝড় আম্পান আরও উত্তর-উত্তরপূর্ব দিকে অগ্রসর হয়ে মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে বুধবার সন্ধ্যার মধ্যে খুলনা ও চট্টগ্রামের মধ্যবর্তী অঞ্চল দিয়ে বাংলাদেশের উপকূল অতিক্রম করতে পারে। ঘূর্ণিঝড় আম্পানের কারণে উপকূলীয় অঞ্চল স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে ৫ থেকে ১০ ফুটের বেশি উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হতে পারে। অবশ্য ইতিমধ্যেই মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরে ৭ নম্বর মহাবিপদ সংকেত এবং চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে ৬ নম্বর বিপদ সংকেত জারি করে প্রয়োজনীয় অনেক সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় চট্টগ্রাম বন্দরের জেটি থেকে সব জাহাজ নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং বন্দর থেকে কনটেইনার সরবরাহ চালু থাকলেও সব ধরনের পণ্য খালাস বন্ধ রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, বরগুনা, পটুয়াখালী, বরিশাল, ভোলা, লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর এবং এসব জেলার অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরগুলোও ৭ নম্বর মহাবিপদ সংকেতের আওতায় থাকবে। এসব অঞ্চলে ১৪০ থেকে ১৬০ মিটার বেগে ঝোড়ো বাতাস আঘাত হানতে পারে। প্রবল জলোচ্ছ্বাসের সঙ্গে এসব এলাকায় ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে অতি ভারী বৃষ্টিরও আশঙ্কা রয়েছে। প্রবল ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ শেষ পর্যন্ত কী রূপ নেয় সেটা অনিশ্চিত থাকায় এসব সতর্কতার কোনো বিকল্প নেই।
বিগত কয়েক দশকে একের পর এক সাইক্লোন, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস সামাল দিতে গিয়ে এ ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশের সামর্থ্য আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে সন্দেহ নেই। তবে, এটা মনে রাখতে হবে এবারের পরিস্থিতি অনেকটাই ভিন্ন। ঘূর্ণিঝড়ের প্রাথমিক ধাক্কা সামাল দেওয়ার সময় এবং ঘূর্ণিঝড় পরবর্তী উদ্ধার ও ত্রাণ তৎপরতায় বিশেষভাবে নজর রাখতে হবে করোনাকালের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ক্ষেত্রে। উপকূলীয় এলাকার মানুষজনকে আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে সরিয়ে নেওয়ার সময় থেকেই এই বিষয়ে বিশেষ মনোযোগ দিতে হবে। সোমবারই দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী এনামুর রহমান জানিয়েছেন, এবার আশ্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা আগের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ করা হয়েছে। প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, উপকূলীয় এলাকার ৫১ লাখ ৯০ হাজার মানুষের জন্য ১২ হাজার ৭৮টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত করা হয়েছে। এসব কেন্দ্রে আশ্রয় নেওয়া মানুষের জন্য ৩ হাজার ১০০ টন চাল, ৫০ লাখ নগদ টাকা, শিশুখাদ্য কিনতে ৩১ লাখ টাকা, গোখাদ্য কিনতে ২৮ লাখ টাকা এবং ৪ হাজার ২০০ প্যাকেট শুকনা খাবারও ইতিমধ্যেই সেসব এলাকায় পাঠানো হয়েছে। প্রয়োজনীয় ওষুধসহ চিকিৎসক ও স্বেচ্ছাসেবীদের দলগুলোও প্রস্তুত রয়েছে। সুপেয় পানির ব্যবস্থা করা হয়েছে। বিদ্যুৎ গেলে বিকল্প ব্যবস্থা এবং ওই অঞ্চলে জরুরিভিত্তিতে সড়ক ও সেতু মেরামতেরও প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। এ অবস্থায় স্থানীয় জেলা প্রশাসন এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় কমিটিগুলোর যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করাটাই সবচেয়ে জরুরি।
বরাবরের মতোই যেকোনে ঘূর্ণিঝড়ের আগে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো স্থানীয় জনসাধারণকে যথাসময়ে আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নেওয়া। করোনাভাইরাসের মহামারীর মধ্যে আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে বাধ্য করার প্রচেষ্টায় বিশেষ জোর দিতে হবে স্থানীয় প্রশাসনকে। গর্ভবতী নারী, নারী, প্রতিবন্ধী ও শিশুদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নিতে হবে। আন্তরিকতার সঙ্গে দুর্গত এলাকার মানুষদের বোঝাতে হবে করোনাকালের এই বিশেষ সতর্কতার কথা। একইসঙ্গে দুর্যোগ-পরবর্তী ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রেও করোনার স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার চর্চায় সতর্ক থাকতে হবে। ভুলে গেলে চলবে না দেশে এখন পর্যন্ত করোনার রোগী ২৫ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। উপকূলীয় এলাকায় এখনো করোনার সংক্রমণ তুলনামূলকভাবে কম থাকলেও ঘূর্ণিঝড় আম্পানের দুর্যোগে এর বিস্তার হলে সেটা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।