হাসপাতালে ফেলে যাওয়া করোনা আক্রান্ত বাবার মৃত্যু

করোনা আক্রান্ত আমিনুর রহমান প্রধানকে (৬৫) আশঙ্কাজনক অবস্থায় গত রবিবার গভীর রাতে রংপুর মেডিকেল কলেজের কভিড ডেডিকেটেড হাসপাতালে রেখে বাড়িতে চলে যায় দুই ছেলে। কিডনির রোগে ভোগা আমিনুরের নিয়মিত ডায়ালাইসিস প্রয়োজন হতো। রংপুরের ওই হাসপাতালে করোনার চিকিৎসা থাকলেও ডায়ালাইসিসের কোনো ব্যবস্থা ছিল না। যে কারণে চিকিৎসকরা তাকে ঢাকায় নিয়ে যেতে বারবার অনুরোধ করলেও সন্তানদের রাজি করাতে পারেননি। পরে গতকাল মঙ্গলবার সকাল ৯টার দিকে রংপুর মেডিকেল কলেজের কভিড ডেডিকেটেড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান আমিনুর রহমান প্রধান। হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক এস এম নূরুন নবী দেশ রূপান্তরকে এসব তথ্য জানিয়েছেন।

সন্তানদের অবহেলার কারণেই সাবেক এই ইউপি চেয়ারম্যানের মৃত্যু হয়েছে বলেও দাবি করছে হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ। মারা যাওয়া আমিনুরের বাড়ি পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার সাকোয়া ইউনিয়নের প্রধানপাড়া গ্রামে। তিনি সাকোয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন। চিকিৎসক   এবং আমিনুরকে হাসপাতালে নেওয়া অ্যাম্বুলেন্সের চালকের দেওয়া তথ্য থেকে জানা গেছে, করোনা আক্রান্তের আগে থেকেই আমিনুর রহমান প্রধান কিডনি সমস্যায় ভুগছিলেন। ঢাকায় তার ছোট ছেলে আরিফ প্রধানের বাসায় থেকে তিনি চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। নিয়মিত ডায়ালাইসিস করতেন। কয়েকদিন আগে ঢাকায় মারা যাওয়া স্ত্রীর লাশ নিয়ে তিনি পরিবারসহ নিজ বাড়িতে ফেরেন। তখন ওই বাড়ি লকডাউন করাসহ পরিবারের সবাইকে কোয়ারেন্টাইনে রাখে স্থানীয় প্রশাসন। গত ১৫ মে ওই পরিবারের চার জনের শরীর থেকে নমুনা সংগ্রহ করে দিনাজপুর এম আব্দুর রহিম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পিসিআর ল্যাবে পাঠানো হয়। গত রবিবার আমিনুরের করোনা পজিটিভ রিপোর্ট আসে। তবে পরিবারের অন্য সদস্যদের রিপোর্ট নেগেটিভ ছিল। করোনা শনাক্ত হওয়ার রিপোর্ট পাওয়ার পরপরই করোনা আক্রান্ত আমিনুরের বাড়ির আশপাশের কয়েকটি বাড়িও বাড়তি সতর্কতার জন্য লকডাউন করে রাখা হয় বলে বোদা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. সোলায়মান আলী জানান। অবস্থার অবনতি হলে সিভিল সার্জন ওই দিন রাতেই বিশেষ ব্যবস্থায় অ্যাম্বুলেন্সে করে আমিনুরকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। কিন্তু তার সন্তানরা অ্যাম্বুলেন্সের চালককে জোর করে রংপুর মেডিকেল কলেজের কভিড ডেডিকেটেড হাসপাতালে নিতে বাধ্য করেন। সেখানে রাত দেড়টার দিকে আমিনুরকে হাসপাতালে ভর্তি করে দিয়ে দুই সন্তান বাড়িতে চলে যান। কিন্তু ওই হাসপাতালে ডায়ালাইসিসের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় চিকিৎসকরা তাকে ঢাকায় নিয়ে যেতে বারবার অনুরোধ করলেও সন্তানদের রাজি করাতে পারেননি বলে রংপুর মেডিকেল কলেজের কভিড ডেডিকেটেড হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক এস এম নূরুন নবী জানান।

অ্যাম্বুলেন্সের চালক মো. রনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘করোনা আক্রান্ত ওই রোগীকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার সন্তানরা রংপুরে কভিড হাসপাতালে নিতে বাধ্য করেন। বাধ্য হয়ে সেখানে নামিয়ে দিই। হাসপাতালে ভর্তি করে দিয়েই তার সন্তানরা বাড়িতে চলে যান।’

জেলার সিভিল সার্জন ডা. ফজলুর রহমান বলেন, ‘যেহেতু করোনা আক্রান্ত ওই রোগী কিডনি রোগে ভুগছিলেন এবং নিয়মিত ডায়ালাইসিস করতেন। তাই তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। কিন্তু সন্তানরা অ্যাম্বুলেন্স চালককে রংপুরে নামিয়ে দিতে বাধ্য করেন।’

অভিযোগ উঠেছে আমিনুরকে তার দুই সন্তান হাসপাতালে রেখে পালিয়ে গেছেন। তবে তা অস্বীকার করে ছোট ছেলে আরিফ প্রধান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার ঢাকার বাসাতেই মায়ের মৃত্যু হয়। ওই বাসাতে রেখেই বাবার চিকিৎসা চলছিল। মা মারা গেলে মায়ের লাশ নিয়ে আমরা সবাই গ্রামের বাড়িতে আসি। রবিবার বাবার করোনা শনাক্ত হয়। রাতেই বাবাকে ঢাকায় নিচ্ছিলাম। কিন্তু শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে রাতে ওই হাসপাতালে ভর্তি করে দিই। যেহেতু বাবা-মায়ের সঙ্গে ছিলাম। তাই প্রশাসন থেকে ১৬ দিন কোয়ারেন্টাইনে থাকার পরামর্শ দিয়েছে। তাই বাড়িতে চলে আসি। কাজেই বাবাকে ফেলে পালিয়ে গেছি, এটা ঠিক না।’