গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের দরবস্ত ইউনিয়নে সরকারের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির (ন্যায্যমূল্য) অন্তত ২০০ কার্ডধারীর প্রায় ২ হাজার ৪০০ মণ চাল আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। যার বাজারদর প্রায় ৩০ লাখ টাকা। সাড়ে তিন বছর ধরে ১ নম্বর ওয়ার্ডের ডিলার, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ট্যাগ অফিসার) এবং ইউপি চেয়ারম্যান এ চাল আত্মসাৎ করেছেন। এ নিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে (ইউএনও) লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন সুবিধাবঞ্চিত ওই কার্ডধারীরা।
অভিযোগে বলা হয়, ২০১৬ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর থেকে এ পর্যন্ত ১৬ দফায় দরবস্ত ইউনিয়নের অন্তত ২০০ কার্ডধারী পরিবারের প্রায় ২ হাজার ৪০০ মণ চাল আত্মসাৎ করেছেন ডিলার নজরুল ইসলাম ও ছামছুল আলম এবং ইউপি চেয়ারম্যান আবু রুশদ মো. শরিফুল ইসলাম জর্জ ও তার লোকজন। আত্মসাৎ করা এসব চালের বাজারদর প্রায় ৩০ লাখ টাকা। ঘটনাটি জানাজানি হলে গত ৯ মে গোবিন্দগঞ্জ প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেন সুবিধাবঞ্চিত কার্ডধারীরা। পরে ডিলার ও চেয়ারম্যান গোপনে কার্ডধারীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে কার্ডগুলো বিতরণ করেন। এ পরিস্থিতিতে গত ১২ মে উপজেলা খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির সভাপতি এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রামকৃষ্ণ বর্মণকে দুই ডিলার ও ইউপি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয় জমা দেওয়া ওই লিখিত অভিযোগে।
উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ভূমিহীন, কৃষি শ্রমিক, দিনমজুর ও ভিক্ষুকসহ দুস্থ প্রত্যেক কার্ডধারীকে সেপ্টেম্বর, অক্টোবর, নভেম্বর, মার্চ ও এপ্রিল মাসে ১০ টাকা কেজি দরে ৩০ কেজি করে চাল দেওয়া হয়। প্রতি ডিলার ৫০০ কার্ডধারীকে এ চাল দেন। ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে এ চাল দেওয়া শুরু হয়। ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে সরকারি গুদামে চাল সংকট হলে সরকার কর্মসূচিটি স্থগিত করে এবং ২০১৮ সালের মার্চ থেকে আবারও শুরু করে। সে হিসাবে দরবস্ত ইউনিয়নের ২০০ কার্ডধারী ১৬ মাস এ চাল পাননি বলে অভিযোগ করেছেন।
আখিরা ফতেহপুর ও হোসেনপুর গ্রামের অভিযোগকারী হানিফ মিয়া, দুলা মিয়া ও মমিরুল ইসলামসহ কয়েকজন দেশ রূপান্তরকে জানান, তারা কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। যে পাঁচ মাস কাজ থাকে না সেই সময়ের জন্য দেওয়া হলেও তারা আজ পর্যন্ত একবারও চাল পাননি। এমনকি তালিকায় যে নাম আছে সেটিই তারা জানতেন না।
তবে অভিযুক্ত ডিলার নজরুল ইসলাম ও ছামছুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, কার্ড নিয়ে রেখে চাল না দেওয়ার যে অভিযোগ উঠেছে তা মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। কার্ডধারীরা চাল না পাওয়ার কোনো নজির নেই। ডিলার নজরুল ইসলাম বলেন, ‘শুনেছি আমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। দেখি তদন্তে কী হয়।’
সংশ্লিষ্ট ট্যাগ অফিসার ও উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা (এসএএও) সুভাস চন্দ্র দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি এখানে তিন বছর ধরে দায়িত্বে আছি। কোনোভাবেই অনিয়মের প্রশ্ন ওঠে না। আমার বিরুদ্ধে যোগসাজশ করে চাল আত্মসাতের যে অভিযোগ আনা হয়েছে তা মিথ্যা। কার্ডধারী প্রত্যেককে চাল দেওয়া হয়েছে।’
একই বিষয়ে সংশ্লিষ্ট আরেক ট্যাগ অফিসার ও এসএএও মো. আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘গত বছর ডিসেম্বর থেকে আমি চাল বিতরণের সময় উপস্থিত ছিলাম। এ সময় ডিলারের কোনো অনিয়ম চোখে পড়েনি। নিয়ম মোতাবেকই সবাইকে চাল দেওয়া হয়েছে।’ অন্যদিকে অভিযুক্ত দরবস্ত ইউপি চেয়ারম্যান আবু রুশদ মো. শরিফুল ইসলাম জর্জ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অভিযোগটি সঠিক নয়। অনেক আগেই এসব চাল বিতরণ করা হয়েছে।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে গোবিন্দগঞ্জের ইউএনও রামকৃষ্ণ বর্মণ গতকাল দুপুরে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অভিযোগটি তদন্ত করতে উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক স্বপন কুমার দে’কে আহ্বায়ক করে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি করা হয়েছে। কমিটি তদন্ত করছে। তদন্ত প্রতিবেদনে অভিযোগের সত্যতা পেলে ডিলারসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
ইউএনও আরও বলেন, ‘ওই ইউনিয়নে সুবিধাভোগীদের তালিকা পুরনো। সেটিও সংশোধন করা হবে।’