বকেয়া বেতন ও শতভাগ বোনাসের দাবিতে শ্রমিকদের বিক্ষোভে উত্তাল আশুলিয়া, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন শিল্পকারখানা। গতকাল বৃহস্পতিবারও এসব সড়ক অবরোধ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে শ্রমিকরা। তারা সড়কে গাছ ফেলে ও টায়ার জ্বালিয়ে ব্যারিকেড সৃষ্টি করে। এতে অনেক কারখানায় অচলাবস্থা দেখা দেয়। তৈরি পোশাক কারখানা ছাড়াও প্লাস্টিক, কেমিক্যাল, সিরামিক, কেব্ল, ফ্যান, স্টিল ও রি-রোলিং মিলসহ অন্যান্য শিল্পকারখানায়ও বকেয়া বেতন-বোনাসের দাবিতে বিক্ষোভ করেছে শ্রমিকরা।
শিল্পপুলিশের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, গতকাল বৃহস্পতিবার গাজীপুর এলাকায় কমপক্ষে ২০টি কারখানায় দিনভর বিক্ষোভ করেছে শ্রমিকরা। যেসব কারখানায় বিক্ষোভ হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে গাজীপুরের গাছা এলাকার ফ্লোরেন্ট লিমিডেট, টঙ্গীর ক্লাসিক ফ্যাশন কনসেপ্ট, টঙ্গী বিসিকের ন্যাশনাল ফ্যান লিমিটেড, মাস্টারবাড়ি এলাকায় গোল্ডেন ট্রেড, কাশিমপুরে ডেল্টা নিট কম্পোজিট, চন্দ্রা এলাকার হৃদি অ্যাসোসিয়েশন, পূবাইলের অনুপম ফ্যাশন, টঙ্গী সাতাইশ এলাকার ভেলা টেক্স লিমিটেড, টঙ্গীর ইউনিটেক অ্যাটাচ লিমিটেড, কোনাবাড়ীর কেয়া নিট কম্পোজিট, শ্রীপুরের মাওনা এলাকায় এএসআর স্যুয়েটার লিমিটেড, টঙ্গীর আবিদ অ্যাপারেলস, গাছা মালেকের বাড়ি এলাকার টেক্সটাইল লিমিডেট, গাজীপুরের ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট সংলগ্ন ইন্টারমেক্স গ্রুপ, গাজীপুর সাতাইশ এলাকার প্রচেষ্টা নিট অ্যান্ড টেক্সটাইল ও কাশিমপুরের ডেল্টা গ্রুপ। এর মধ্যে কয়েকটি কারখানার শ্রমিকরা ঢাকা-ময়মনসিংহ ও ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করে। কয়েকটি কারখানায় বোনাস ছাড়াও মার্চ ও এপ্রিল মাসের বেতনও দেওয়া হয়নি।
শিল্পপুলিশ আরও জানায়, আশুলিয়ার ঘোষবাগ এলাকায় বিক্ষোভ করে তুষার লাইন নামক শিল্পকারখানার শ্রমিকরা। তাদের বলা হয়েছিল ব্যাংকের সমস্যার কারণে বিকেল ৫টার পর বোনাস দেওয়া হবে। কিন্তু তারা সেটা না মেনে কারখানার গেটে বিক্ষোভ শুরু করে। সাভারের নাজিমনগর এলাকায় বসুন্ধরা গার্মেন্টসের শ্রমিকরা কাজ বন্ধ রেখে বিক্ষোভ করে। আশুলিয়ার কাঠগড়া এলাকায় কম্বাইন টেক্স নামের কারখানার শ্রমিকরা বেতন-বোনাসের দাবিতে বিক্ষোভ করে। বেতন-ভাতা না দিয়ে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক লাপাত্তা হয়ে যান। চারাবাগ এলাকায় নিউ এশিয়া কারখানার শ্রমিকরা বিক্ষোভ করে। আশুলিয়ার গাজীরচটে ফৌজিয়া ও ফাহিম ফ্যাশন, সাভারের ভাগলপুরে বেঙ্গল সিরামিক, সাভারে মারহাবার স্পিনিং মিলের শ্রমিকরা গতকাল বিক্ষোভ করে।
এছাড়া নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুরে বিক্ষোভ করে সিনহা গ্রুপের প্রায় ৮ হাজার শ্রমিক। তারা ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক অবরোধের চেষ্টা করে। সিদ্ধিরগঞ্জের নিউ সিসিলি স্কিন প্রিন্ট, ফতুল্লার পঞ্চবটি এলাকায় মনোয়ারা মার্ক ড্রেসেস ও কর্টন পাওয়ার লিমিটেডের শ্রমিকরা বিক্ষোভ করে। একপর্যায়ে তারা চাষাঢ়া শহীদ মিনারে গিয়ে জমায়েত হয় এবং বিক্ষোভ করতে থাকে। কর্টন পাওয়ারের শ্রমিকরা মার্চ ও এপ্রিলের বেতন পায়নি জানিয়ে বিক্ষোভ করছিল।
চট্টগ্রাম ইপিজেডে এপ্রিল মাসের বেতন ও শতভাগ বোনাসের দাবিতে এটিএস পাল লিমিটেড ও শতভাগ বোনাসের দাবিতে আনোয়ারা মেক ড্রেসেস কারখানার শ্রমিকরা বিক্ষোভ করে।
শিল্পপুলিশ সদর দপ্তরের সর্বশেষ (বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টা) হিসাবে, দেশের ৬টি শিল্পাঞ্চলে ৭ হাজার ৬০২টি কারখানার মধ্যে এপ্রিল মাসের বেতন দেওয়া হয়েছে ৪ হাজার ৬০৭টি কারখানায়। ২ হাজার ৯৯৫টি কারখানায় গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত এপ্রিল মাসের বেতন পরিশোধ করা হয়নি। মার্চের বেতনও হয়নি তিন শতাধিক কারখানায়। ৭ হাজার ৬০২টি শিল্পকারখানার মধ্যে বোনাস দেওয়া হয়েছে মাত্র ১ হাজার ৭৭৭টিতে। গত সন্ধ্যা পর্যন্ত বোনাস দেওয়া হয়নি ৫ হাজার ৮২৫টি শিল্পকারখানায়। এর মধ্যে বিজিএমইএ সদস্যভুক্ত ১৮৪২ কারখানার মধ্যে বোনাস দেওয়া হয়েছে ৩৬৮টিতে। বোনাস হয়নি ১৫১৪টি কারখানায়। যদিও তারা বলছে, আজ ও শনিবার বোনাস দেওয়া হবে। বিকেএমইএর ১১০১টি কারখানার মধ্যে বোনাস দেওয়া হয়েছে ১১৮টিতে, দেওয়া হয়নি ৯৮৩টিতে। বিটিএমইএর সদস্যভুক্ত ৩৮৯ কারখানার মধ্যে বোনাস হয়নি ৩৩৩টিতে। বেপজার ৩৬৪ কারখানার মধ্যে বোনাস দেওয়া হয়নি ৭৪টিতে। অন্যান্য ৩৮৬৬ কারখানার মধ্যে বোনাস দেওয়া হয়েছে মাত্র ৯৪৫টিতে। বোনাস পরিশোধ করা হয়নি ২৯৪১টিতে। তৈরি পোশাক বাদে অন্যান্য শিল্পের ৩৮৬৬ কারখানার মধ্যে এপ্রিলের বেতন হয়েছে ২১১৪টিতে ও এপ্রিলের বেতন দেওয়া হয়নি ১৭৫২টি কারখানায়।
শিল্পকারখানায় চলমান বিক্ষোভ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে শিল্পপুলিশ সদর দপ্তরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আমজাদ হোসাইন গতকাল সন্ধ্যায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আজও (বৃহস্পতিবার) বিক্ষোভ চলাকালে কিছু কারখানার মালিক কর্র্তৃপক্ষকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। তারা পুলিশের ফোনও রিসিভ করেনি। তারপরও শিল্পপুলিশ সদস্যরা নানা কৌশলে দক্ষতার সঙ্গে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।’