পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে যাত্রী পরিবহন

গাইবান্ধায় ট্রাক উল্টে প্রাণ গেল ১৩ শ্রমিকের

ঢাকা-রংপুর জাতীয় মহাসড়কে গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার দুবলাগাড়ী এলাকায় গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে রডবোঝাই একটি ট্রাক উল্টে তিন শিশুসহ ১৩ জন নিহত হয়েছেন। পুলিশ বলছে, তাদের বেশিরভাগই দিনমজুর ও পোশাকশ্রমিক। ধারণা করা হচ্ছে, করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে বাস বন্ধ থাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে তারা ঢাকা থেকে পলাশবাড়ী ও রংপুরে যাচ্ছিল। গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত নিহতদের মধ্যে সাতজনের পরিচয় পাওয়া গেছে। এদিকে গতকাল বিকেল ৩টার দিকে নাটোরের বড়াইগ্রামে বিআরটিসির একটি ট্রাকের চাপায় গোয়েন্দা পুলিশ কর্মকর্তা একরামুল ইসলাম (২৮) নিহত হয়েছেন। তিনি ছুটি শেষে মোটরসাইকেলে কর্মস্থল ঢাকায় ফিরছিলেন।

গোবিন্দগঞ্জ হাইওয়ে থানা পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয়রা জানায়, ঘূর্ণিঝড় আম্পানের প্রভাবে ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে গতকাল ভোরে ঢাকা থেকে রডবোঝাই ট্রাকটি রংপুরের দিকে যাচ্ছিল। সকাল পৌনে ৮টার দিকে পলাশবাড়ীর দুবলাগাড়ী এলাকায় ট্রাকটি উল্টে খাদে পড়ে যায়। এ সময় ট্রাকচালক ও হেলপার পালিয়ে যায়। স্থানীয়রা বিষয়টি টের পেয়ে জাতীয় জরুরি সেবা ‘৯৯৯’ নম্বরে কল দেয়। পরে গোবিন্দগঞ্জ হাইওয়ে থানা পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস, পলাশবাড়ী থানা পুলিশসহ স্থানীয়রা উদ্ধার কাজ শুরু করে।

নিহতদের মধ্যে পরিচয় নিশ্চিত হওয়া ৬ জন হলো পলাশবাড়ীর মহদিপুর ইউনিয়নের ছোট ভগবানপুর গ্রামের খলিলুর রহমানের ছেলে পোশাকশ্রমিক মহসিন মিয়া (১৮), রংপুরের পীরগঞ্জের বড় দরগাহ ইউনিয়নের ঢোড়াকান্দর গ্রামের মৃত আবদুস সামাদের ছেলে শামছুল আলম (৬০) ও তার নাতি সোয়াইব হাসান (৭), একই উপজেলার শানেরহাট ইউনিয়নের ধল্লাকান্দি গ্রামের ফুলমিয়ার ছেলে ইসহাক খান (২৫), একই গ্রামের ইশা খানের ছেলে আল আমিন (১৪), কাউনিয়া উপজেলার কুর্শা ইউনিয়নের রামচন্দ্রপুর গ্রামের আবদুল মতিনের ছেলে শরিফুল ইসলাম (৩৫) ও কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার করকুরা গ্রামের মহিউদ্দিনের ছেলে মিজানুর রহমান (২৭)। গোবিন্দগঞ্জ হাইওয়ে থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘সকাল ৮টার পরপরই ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধারকাজ শুরু করি। তখনো কেউ জানতাম না যে, ট্রাকের নিচে চাপা পড়ে আছে ১৩ জন মানুষ। রড সরানো শেষে একটি বাজারের ব্যাগ দেখতে পেয়ে সন্দেহ হয়। এরপর দ্রুত রড সরিয়ে ১৩টি মরদেহ পাওয়া যায়। তাদের মধ্যে তিনজন শিশু ও অন্যরা পুরুষ।’

তিনি আরও বলেন, ‘ট্রাকভর্তি লোহার রড ত্রিপল দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়। এরপর ত্রিপলের ওপর ১৩ জনকে বসানো হয় । পুলিশের চোখ ফাঁকি দিতে তাদেরও ত্রিপল দিয়ে ঢেকে রাখা হয়। ট্রাকের পেছনে ফলের কয়েকটি ফাঁকা খাঁচা বাঁধা ছিল। এভাবেই ঢাকা থেকে রংপুরের দিকে যাচ্ছিল ট্রাকটি।’

গোবিন্দগঞ্জ হাইওয়ে থানার ওসি আবদুল কাদের জিলানী বলেন, এ ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে গোবিন্দগঞ্জ হাইওয়ে থানায় মামলা করেছে। সাতজনের লাশ স্বজনরা নিয়ে গেছেন। অন্য ছয়জনের পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা চলছে। পলাতক ট্রাকচালক ও তার সহকারীকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

এদিকে ঘটনা শোনার পর গাইবান্ধার জেলা প্রশাসক মো. আবদুল মতিন, পুলিশ সুপার মুহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম, বগুড়া হাইওয়ে পুলিশ সুপার মো. শহীদ উল্লাহ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। এ সময় জেলা প্রশাসক বলেন, নিহতদের প্রত্যেক পরিবারকে ১০ হাজার টাকা করে দেওয়া হবে। পুলিশ সুপার মুহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম বলেন, ‘নিহতরা ঢাকায় দিনমজুর ও পোশাকশ্রমিকের কাজ করতেন। ঈদের ছুটিতে তারা বাড়ি ফিরছিলেন। ঘটনাটি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।’

এদিকে গতকাল বিকেল ৩টার দিকে বনপাড়া-হাটিকুমরুল-ঢাকা মহাসড়কের বড়াইগ্রাম থানা মোড় এলাকায় বিআরটিসির একটি ট্রাকের চাপায় পুলিশ কর্মকর্তা একরামুল ইসলাম (২৮) নিহত হন। তিনি ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা শাখায় (ডিবি) এএসআই হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

বনপাড়া হাইওয়ে থানার ওসি খন্দকার শফিকুল ইসলাম জানান, একরামুল ইসলাম মোটরসাইকেলে ঢাকায় যাচ্ছিলেন। পথে বড়াইগ্রাম থানার মোড় এলাকায় একটি ট্রাক তাকে চাপা দিয়ে পালিয়ে যায়। এতে তিনি ঘটনাস্থলেই মারা যান।