জলোচ্ছ্বাস ঠেকাতে কোনো বাঁধই সক্ষম না

সারা দেশের ১৭ হাজার কিলোমিটার বাঁধের বেশিরভাগই গত শতকের ষাটের দশকের। এসব বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছিল জোয়ারের পানি ঠেকিয়ে কৃষিকাজ করার জন্য। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এসব বাঁধ নতুন করে নির্মাণ করা হয়নি। এমনকি যে ধারাবাহিক সংস্কার দরকার ছিল তা-ও করা হয়নি। কোনো বাঁধই ঘূর্ণিঝড়ের জলোচ্ছ্বাস ঠেকানোর উপযুক্ত না। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব বাঁধ নতুন করে নির্মাণ করা উচিত। লম্বায় বা দৈর্ঘ্যে বড় না করে বাঁধগুলো উঁচু করা দরকার। একই সঙ্গে দরকার নিয়মিত সংস্কার করা।

গত বুধবার ঘূর্ণিঝড় আম্পানে দেশের ১৩ জেলায় মোট ৮৪টি পয়েন্টে বাঁধ ভেঙেছে। যার দৈর্ঘ্য প্রায় সাড়ে সাত কিলোমিটার। ঝড়ে মোট ১৫০ কিলোমিটার বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে ৮ থেকে ১০ ফুট উচ্চতায় জলোচ্ছ্বাস হওয়ায় বিভিন্ন জেলার বেড়িবাঁধ বা তীররক্ষা বাঁধ কোথাও ভেঙে, কোথাও উপচে জোয়ারের পানি প্রবেশ করেছে। লোনা পানিতে তলিয়ে গেছে মাছের ঘের, ফসলি জমি ও সুপেয় পানির উৎস। এই ঘূর্ণিঝড়ে প্রাথমিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের প্রভাষক এনায়েত চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘উপকূলসহ বেশিরভাগ বাঁধই ষাটের দশকে নির্মিত। পাকিস্তান আমলে তৈরি করা হয়েছিল সেচের সুবিধার জন্য। এরপর এসব বাঁধের উপযুক্ত মেরামত হয়নি। যে পরিমাণ রক্ষণাবেক্ষণ করার কথা তা করা হয় না। পরে এসব বাঁধ উঁচু করার পরিবর্তে লম্বালম্বিভাবে বড় করা হয়েছে। এর ফলে ১০ থেকে ১৫ ফিট উঁচু জলোচ্ছ্বাস আটকানোর ক্ষমতা এসব বাঁধের নেই। ১০ থেকে ১৫ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস আটকানোর জন্য চাই কমপক্ষে ১৮ ফুট উঁচু বাঁধ। যে উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস তারচেয়ে বাঁধের উচ্চতা কমপক্ষে ৩ ফুট বেশি হতে হবে। আম্পানের জলোচ্ছ্বাস আটকানোর জন্য আমাদের ১৮ ফুট উচ্চতার বাঁধ দরকার ছিল।’

এই ঘূর্ণিঝড়ের সঙ্গে এত উঁচু জলোচ্ছ্বাসের কারণ জানতে চাইলে এই পানি গবেষক বলেন, ‘আম্পান যখন বাংলাদেশে আঘাত করেছে তখন সময় ছিল সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১১টা। যখন সাতক্ষীরা বা খুলনা এলাকায় আঘাত করেছে ওটা ছিল ভরা জোয়ারের সময়। নদী থেকে যে পরিমাণ পানি নামার কথা ছিল তা নামেনি। অমাবস্যার জোয়ারের পানির সঙ্গে যোগ হয়েছে জলোচ্ছ্বাসের পানি। সাতক্ষীরার খোলপেটুয়া নদীর কথা আমি নির্দিষ্ট করে বলতে পারি। ওই নদীতে জোয়ারের পানির সঙ্গে জলোচ্ছ্বাসের পানি যোগ হয়ে চারপাশ প্লাবিত হয়েছে।’ তিনি বলেন, এই ঘূর্ণিঝড়ের সঙ্গে সিডর বা আইলার মিল নেই। আম্পান হচ্ছে ১৯৭০ সালের ভোলা ঘূর্ণিঝড় ও ১৯৯১ সালের বাংলাদেশ ঘূর্ণিঝড়ের মতো। বিভিন্ন গবেষণায় এই দুটি ঘূর্ণিঝড়কে এই নামেই ডাকা হয়। ১৯৭০ সালের ঘূর্ণিঝড়ে ৫ লাখ এবং ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ে ১ লাখ ৪০ হাজার মানুষ মারা যায়। ওই দুটি ঘূর্ণিঝড়ও জোয়ারের সময় হয়েছিল। আম্পানও জোয়ারের সময় আঘাত করেছে।

পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বাংলাদেশের উপকূলীয় সাড়ে পাঁচ হাজার কিলোমিটার বেড়িবাঁধ বড় ধরনের ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলার জন্য উপযুক্ত নয়। বর্তমানে যে বাঁধগুলো রয়েছে সেগুলো নিয়মিত জোয়ার-ভাটা প্রতিরোধে সক্ষম। প্রতি অর্থবছরের বাজেটে বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার বাবদ যে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয় সেটা প্রয়োজনের দশ ভাগের এক ভাগ। সরকার প্রতিবছর যে বরাদ্দ দেয় সেটা মোট ১৭ হাজার কিলোমিটার বাঁধের উন্নয়নের জন্য। এর মধ্যে সাড়ে পাঁচ হাজার কিলোমিটার উপকূলীয় বাঁধ, ৮ হাজার কিলোমিটার অভ্যন্তরীণ নদী তীরবর্তী বাঁধ এবং আড়াই হাজার কিলোমিটার হাওর অঞ্চলের ডুবন্ত বাঁধ সংস্কারে সরকার এই অর্থ বরাদ্দ দেয়। যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।

তারা জানান, গত ১০-১২ বছর বাংলাদেশের উপকূলে বড় বড় ঘূর্ণিঝড় আঘাত হেনেছে। প্রায় প্রতিবছরই ঘূর্ণিঝড় হচ্ছে। পুরনো বাঁধগুলোর বেশিরভাগ নষ্ট হয়ে গেছে। এছাড়া এসব বাঁধে রেগুলেটর ও সøুইসগেটের মতো প্রায় ৯ হাজার অবকাঠামো রয়েছে, যেগুলো সংস্কার করা প্রয়োজন। এগুলো এখনো ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে চলছে, যা অটোমেশন অর্থাৎ মটোরাইজড পদ্ধতিতে আনতে হবে। যার জন্য প্রয়োজন প্রচুর সময়, জনবল ও বাজেট। সরকারের ডেল্টা পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ জুড়ে রয়েছে দেশের দুর্যোগপ্রবণ উপকূলীয় এলাকার বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার কাজ। কিন্তু প্রকল্প পরিকল্পনা, আবেদন, অনুমোদন সবশেষে বাস্তবায়নের দীর্ঘসূত্রতার কারণে বাঁধ সংস্কার প্রকল্পগুলো ফলপ্রসূ হচ্ছে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ঘূর্ণিঝড় আম্পানের তা-বে বাংলাদেশের সাতক্ষীরা, পটুয়াখালী, বরগুনা, ভোলাসহ ৯টি জেলার কয়েকশ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এসব জেলার পাশ দিয়ে যে নদীগুলো বয়ে গেছে সেগুলোর বেড়িবাঁধ ভেঙে যাওয়ায় মুহূর্তেই তলিয়ে গেছে বিস্তীর্ণ এলাকা। অথচ প্রতিবছর বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার বাবদ বাজেটে মোটা অঙ্কের বরাদ্দ দেওয়া হয়। স্থানীয়রা প্রায়ই অভিযোগ করেন, সেই বরাদ্দের বাস্তবায়ন তারা দেখেন না। যখন সরকারি কোনো চুক্তি হয়, তখন সেটার বরাদ্দকৃত অর্থ অনেকভাবেই ভাগাভাগি হয়ে যায় বলেও অভিযোগ রয়েছে।

পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব কবির বিন আনোয়ার বলেন, বাংলাদেশের উপকূলে পাঁচশ কিলোমিটার জুড়ে পাঁচ থেকে ছয় মিটার উঁচু বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা হাতে নেওয়া  হয়েছে। শক্তিশালী জলোচ্ছ্বাস প্রতিরোধ করার জন্য এ পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এজন্য কক্সবাজার থেকে সাতক্ষীরা পর্যন্ত বাঁধ নির্মাণে পাঁচটি দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প প্রস্তুত করা হয়েছে। যেগুলো এখন অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে। প্রকল্প পাস হলে চলতি বছরের শেষ নাগাদ কাজ শুরু হতে পারে এবং সম্পূর্ণ কাজ শেষ হতে তিন বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। তিনি বলেন, এখন মূলত চলছে সংস্কার কাজ। এই সংস্কার কাজে দুর্নীতির কোনো সুযোগ নেই। বরাদ্দ হয়েছে কিন্তু কাজ হয়নি, এটা এখন কোনোভাবেই সম্ভব না। কারণ এই প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করা হয় প্রকৌশলী, ঠিকাদার, সরকারের মনিটরিং টিম ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে।