ঘূর্ণিঝড় আম্পান মোকাবিলায় মাঠের অভিজ্ঞতা

বুধবার ঘূর্ণিঝড় আম্পানের আঘাতে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে কমপক্ষে ৮০ এবং বাংলাদেশে কমপক্ষে ২০ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এই প্রলয়ংকরী ঝড়ে আহত হয়েছেন বিপুলসংখ্যক মানুষ। 

২০০৯ সালের ‘আইলা’র পর গত এক দশকের মধ্যে আম্পান ছিল বাংলাদেশ এবং পূর্ব ভারতে আঘাত হানা সবচেয়ে শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়। ঝড়টি আক্রান্ত এলাকার বেশিরভাগ অংশেরই ফসল ধ্বংস করেছে এবং উপকূল রক্ষা বাঁধগুলোর ব্যাপক ক্ষতি করেছে। আম্পান বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের মধ্যে খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট জেলার ফসল ও বাধঁগুলোর ক্ষতি করেছে সবচেয়ে বেশি। তীব্র বাতাসের গতিতে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট, দেয়াল ধ্স, পানিতে ডুবে ও গাছ উপড়ে পড়ার কারণে অধিকাংশ মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার স্থানীয়দের কাছ থেকে কয়েক হাজার ঘরবাড়ি, ফসলি জমি, চিংড়ির ঘের, নদীর বাঁধ এবং গাছ ধ্বংস হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। 

জাতিসংঘের বাংলাদেশ অফিসের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে আনুমানিক ১ কোটি মানুষ আম্পানে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং অন্তত ৫ লাখ মানুষ তাদের ঘরবাড়ি হারিয়েছে। সাতক্ষীরা ও রাজশাহীতে আমের ফলনের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। কৃষকরা আম তুলতে শুরু করেছিলেন। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় দুই দিন কোনো মোবাইল নেটওয়ার্ক কাজ করেনি। উপড়ে পড়া গাছের কারণে সড়কে যোগাযোগ ব্যবস্থাও বন্ধ হয়ে যায় এবং সমগ্র গ্রামবাসীকে বিশুদ্ধ পানি ও বিদ্যুৎবিহীন থাকতে হয় দীর্ঘ সময়। 

প্রবল বৃষ্টিপাত এবং বাধঁ ভেঙে অধিকাংশ উপকূলীয় জেলার নিম্নাঞ্চল পানির নিচে তলিয়ে গেছে। তবে ঝড় আঘাত হানার আগেই কর্তৃপক্ষ স্থানীয় লোকজনকে নিরাপদে সরিয়ে আনার ফলে অনেক মানুষ প্রাণ বাঁচাতে সক্ষম হয়েছে।

তবে পর্যাপ্ত যাচাই শেষ হলে হতাহত এবং সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত তথ্য জানা যাবে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন প্রতিবারের মতো এবারও নিজের ব্যাপক ক্ষতি স্বীকার করে উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষদের জীবন বাঁচিয়েছে। আম্পানের গতি ৭০ কিলোমিটার কমিয়েছে সুন্দরবন। এর জলোচ্ছ্বাসের উচ্চতাও ৩ থেকে ৪ ফুট কমিয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় এই শ্বাসমূলীয় বনটি। ঝড়টি ঘণ্টায় ১৫৫ থেকে ১৬৫ কিলোমিটার গতিবেগে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে আঘাত করে। আর এটি বাংলাদেশের সাতক্ষীরায় আঘাত করে ঘণ্টায় ১৫১ কিলোমিটার গতিবেগে। কিন্তু তার আগেই সুন্দরবন এর শক্তি কমিয়ে দেয়। ফলে এই ঝড়ে যে পরিমাণে ক্ষতি হয়েছে তার চেয়ে বেশি ক্ষতির হাত থেকে উপকূলের মানুষ ও সম্পদ রক্ষা পেয়েছে।

বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে, ঘূর্ণিঝড়ের আগে প্রায় ২৪ লাখ মানুষ এবং ৫ লাখ পশু তাদের বাড়ি থেকে সরিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে আসা হয়েছিল। স্থানীয় প্রশাসনের নেতৃত্বে ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচি (সিপিপি), বিভিন্ন যুব সংঘ, বেসরকারি সংস্থা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এই মানুষগুলোকে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে উদ্বুদ্ধ ও সহযোগিতা করেছেন। করোনাভাইরাসের কারণে কর্তৃপক্ষ ভিড় কমাতে আশ্রয়স্থলের জায়গা বৃদ্ধি এবং মাস্ক পরে থাকতে বাধ্য করেছিলেন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পর্যাপ্ত সাবান সরবরাহের চেষ্টা করেছেন, তবে তা অপ্রতুল ছিল। কোথাও কোথাও আইসোলেশন কক্ষেরও ব্যবস্থা করা হয়েছিল। উপকূল জুড়ে থাকা নিয়মিত ৫০০ আশ্রয়কেন্দ্রের পাশাপাশি সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার লক্ষ্যে অতিরিক্ত ১২০০০ আশ্রয়কেন্দ্রের ব্যবস্থা রাখা হয়।

করোনাভাইরাসের ভয়ে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার বিষয়টি উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে ছিল বড় বাধা। অনেকেই ভাইরাস সংক্রমণের ভয়ে তাদের বাড়িঘর ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে রাজি ছিলেন না। ঘূর্ণিঝড়ের মধ্যে ঘরে অবস্থান করা অথবা করোনাভাইরাসের সংক্রমণের ঝুঁকি নিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়া-এ দুটির মধ্যে একটি বেছে নেয়া তাদের জন্যে ছিল কঠিন সিদ্ধান্ত। 
সামগ্রিকভাবে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বিশেষ করে ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় বাংলাদেশের সফল প্রস্তুতি দৃশ্যমান হয়েছে। ফলে অনুমিত ক্ষতির চেয়ে প্রকৃত ক্ষতি কম হয়েছে, বিশেষ করে প্রাণহানির ক্ষেত্রে। কিন্তু আদতে বিস্তীর্ণ তৃণমূলজুড়ে এরকম একটি ঝড় মোকাবিলা মোটেও সহজ ছিল না। ফলে প্রস্তুতির ক্ষেত্রে আমরা মাঠপর্যায়ে কিছু ঘাটতি দেখেছি।

ঝড় আসলেই শুধু আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত করা হয়: ঘূর্ণিঝড়ের প্রস্তুতির সবচেয়ে বড় নির্দেশক নিরাপদ আশ্রয়স্থল। দেশের ১৩ উপকূলীয় জেলায় প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত ক্ষয়ক্ষতি কমানোর লক্ষ্যে বিগত বছরগুলোতে প্রায় পাঁচ হাজার আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে। দূর্ভাগ্যবশত নিয়মিত পরিচর্যার অভাবে উল্লেখযোগ্য আশ্রয়কেন্দ্র এখন আর ব্যবহারের উপযোগী নয়। ফলে ২০০ জন ধারণ ক্ষমতার আশ্রয়কেন্দ্রে ২০০০ জন মানুষ আশ্রয় নিয়েছে। এ থেকে সহজেই বোঝা যায় আশ্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা পর্যাপ্ত ছিল না। অধিকাংশ আশ্রয়কেন্দ্রে পর্যাপ্ত খাবার পানির ব্যবস্থা নাই। এমনকি শিশু, বৃদ্ধ, নারী ও কিশোরীসহ অন্যান্য বিপদাপন্ন শ্রেণির মানুষের জন্যে কোনো আলাদা নিরাপদ জায়গার ব্যবস্থাও ছিল না। ঝড়ের সময় উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের বিরুদ্ধে একটা নিয়মিত অভিযোগ আছে যে, তারা তাদের বসতি এবং গবাদিপশু ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে চান না। এর বড় কারণ তাদের ঘর আর গবাদিপশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

কারণ সঙ্গে চুরি-ডাকাতির আশংকা তো আছেই। ফলে পরিবারের পুরুষ সদস্যরা আশ্রয়কেন্দ্রে না গিয়ে ঘরে থাকতে পছন্দ করেন। এসব কারণে প্রাণহানির সংখ্যা বাড়ে। ক্ষয়ক্ষতি কমাতে গবাদিপশুকে আশ্রয়কেন্দ্রের আশপাশে রাখার জন্য মাটি দিয়ে বানানো কিল্লার সংখ্যা বাড়ানোর বিকল্প নাই। এ ছাড়া জনগণের সহায়-সম্পত্তির পর্যাপ্ত নিরাপত্তা দিতে হবে। 

করোনার লক্ষণ যাদের আছে তাদের আলাদা রাখার প্রস্তুতি কোথাও কোথাও দেখা গেছে, কিন্তু সেটা পর্যাপ্ত ছিল না। ফলে লোকজন আশ্রয়কেন্দ্রে আসতে সাহস পায় নাই। আবার দুর্যোগের সময় নারী, বৃদ্ধ এবং প্রতিবন্ধীদের আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত প্রস্তুতির অভাব দেখা গেছে।

মান্ধাতা আমলের সতর্ক সংকেত ব্যবস্থা: ঘূর্নিঝড়ের ক্ষেত্রে সতর্ক সংকেত ব্যবস্থা একটি কার্যকরী উপায় বলে প্রমাণিত হয়ে আসছে। ফণী, বুলবুল এবং সর্বশেষ আম্পান আঘাত হানার আগে উপকূলবাসীকে সতর্ক করে দেওয়া হয়। ফণী ও বুলবুল উভয়ক্ষেত্রেই ১০ নম্বর মহা বিপদ সংকেত দেখানো হয়েছিল। যদিও এই দুটি ঝড়ের একটিও শেষ পর্যন্ত বড়সড় ঝড় হয়ে আঘাত করেনি। শুরু থেকেই আম্পান পশ্চিমবঙ্গমুখী, যা ভারত এবং অন্যান্য দেশের রাডারে পরিষ্কার ধরা পড়েছে। অথচ বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও মোংলা সমুদ্রবন্দরকে ১০ নম্বর মহা বিপদ সংকেত দেখানো হয়েছে। যা কোনোভাবেই যৌক্তিক না। যে ঝড় উড়িষ্যায় আঘাত হানবে, তার তীব্র প্রভাব কক্সবাজারে পড়ার কোনো কারণই নেই। এভাবে ক্রমাগত অযথার্থ সংকেত উপকূলবাসীকে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে নিরুৎসাহিত করে। 

বর্তমানে আমরা যে সতর্ক সংকেত ব্যবহার করি, সেটা ব্রিটিশদের তৈরি পদ্ধতি যা মূলত বন্দরকেন্দ্রীক ছিল। শতবর্ষ পরেও আমরা তা অনুসরণ করছি। আমাদের উচিত, অন্যান্য দেশের অনুকরণে জনবান্ধব সতর্ক সংকেত ব্যবস্থা প্রণয়ন করা। ঝড়ের সময় যদি এক লাফে ৪ নম্বার সংকেত থেকে ১০ নম্বরে উঠে যাই, আবার ৭ থেকে ১০ সংকেতের অর্থ যখন একই, তখন মাঝখানে বাকি সংকেতগুলো থাকার দরকার কি?  

বেড়িবাঁধ উপকূলের মানুষের কান্নার কারণ: আম্পানের পরদিন পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় একটি দ্রুত মূল্যায়ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, ১৩টি জেলাজুড়ে বেড়িবাঁধের বড় একটা অংশ ক্ষতি হয়। ৮৪টি পয়েন্টে ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধের দৈর্ঘ্য মোট ৭ কিলোমিটার। সেই ২০০৯ থেকেই আইলায় ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধগুলোকে মেরামত করার যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, সেটা আজ অব্দি শেষ হয় নাই। ঠিক সময়ে প্রকল্প শেষ করা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহীতার অভাব বড় প্রশ্ন হিসেবে সামনে আসে। এসব বাঁধ এমনভাবে নির্মাণ করা হয়, যেন বানানোই হয়েছে ভেসে যাওয়ার জন্য। তাহলে আবার বরাদ্দ আবার নতুন বাঁধ নির্মাণের চেষ্টা। এবার যেসব জায়গায় বাঁধ ভেঙেছে, বিশেষ করে সাতক্ষীরার শ্যামনগর, খুলনার কয়রা, স্থানীয় সরকার বিভাগ অনেক আগেই বাঁধের এসব দুর্বল স্থানগুলো খুঁজে বের করেছিল। সেগুলো সমাধানে কার্যত কোনো উদ্যোগই গ্রহণ করা হয়নি।  

সতর্কতা, উদ্ধার উপকরণ ও সমন্বয়: উপকূলীয় এলাকাজুড়ে ঝড়ের পূর্বসতর্কতা জারি, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং খোঁজ ও উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণের অভাব রয়েছে। দুর্যোগের আগে ও দুর্যোগকালীন সময় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটিসমূহ ও স্বেছাসেবী দলগুলোর মাঝে এসব উপকরণের পর্যাপ্ততা জানমালের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে পারে। নিরাপত্তা বাহিনীর কাছেও এসব উপকরণের অভাব দেখা গেছে। আবার দুর্যোগকালীন সময় সিপিপি স্বেছাসেবক, জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়নের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি সক্রিয় হলেও সারা বছর এদের খোঁজ থাকে না। ফলে সারা বছর প্রস্তুতি না নিয়ে শুধু ঝড় আসলে সামলে নেব নীতিতে আম্পানের মতো ঝড় মোকাবেলা করা যায় না। অন্য সময় এসব কমিটি নিয়মিত কোনো সভা করে না এবং অধিকাংশই যথাযথভাবে সনদপ্রাপ্ত নয়। ফলস্বরূপ দুর্যোগ পরবর্তী সময়েসমন্বয়ের ঘাটতি পরিলক্ষিত হয়। 

সবশেষে বলি, বাংলাদেশ ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতিতে খুব একটা খারাপ নয়। ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও বড় আকারে হ্রাস পেয়েছে। গত ২৫ বছরে বিভিন্ন দুর্যোগে আক্রান্ত হয়েছে ১৩ কোটি ৫০ লাখ মানুষ। তাদের মধ্যে প্রাণ হারিয়েছে ১৬ হাজার ৫১৩ জন। ২০০৭ সালে ঘূর্ণিঝড় সিডরে আক্রান্ত হয় উপকূলীয় সব জেলা এবং এতে প্রাণ হারায় প্রায় চার হাজার মানুষ। ২০০৯ সালে আঘাত হানা আইলায় নিহতের সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ৩০০ জনে। সরকারও বেসরকারি সংস্থাসমূহ, গণমাধ্যমের ইতিবাচক ভূমিকা ও কমিউনিটিভিত্তিক সংস্থা ও জনগণের যৌথ উদ্যোগের কারণেই তা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু যেসব কারণে মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে চয় না, বেড়িবাঁধের মতো অত্যাবশ্যকীয় প্রস্তুতির দিকে নজর দিলে ভবিষ্যতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন অব্যাহত রাখা সম্ভব হবে।

মোহাম্মদ নুরুল আলম রাজু ও ফাইমা রহমান: উন্নয়ন পেশজীবি। ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশে কর্মরত।