কভিড-১৯ ও জাতীয় উন্নয়ন ধারাবাহিকতায় আশু করণীয়

আমাদের জাতীয় উন্নয়ন ধারাবাহিকতায় কভিড-১৯ একটি বড় ধাক্কা। অন্তত কিছুদিন আগেও উন্নয়নের জিডিপি তত্ত্বের সঙ্গে মিলিয়ে নিজেদের সম্পর্কে উচ্চ আশাবাদ ব্যক্ত করতাম। করোনা যেমন এই তত্ত্বের কার্যকারিতা নিয়ে একটি বড় ধাক্কা, পাশাপাশি জিডিপির উচ্চহার সত্ত্বেও আমাদের স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে দূরাবস্থার কারণ অনুসন্ধানের সুযোগ তৈরি করে দেয়।

আজকে দেখতে পাচ্ছি আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা কতটা দুর্বল ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে ছিল। যদিও দাঁড়িয়ে ছিল বলা ভুল হচ্ছে— বরঞ্চ বলা যেতে পারে একরকমে টিকে ছিল। একথা সত্য যে, এর আগে অনেক দিন আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এ রকম বড় ঝুঁকির মুখোমুখি হয়নি বা স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে এভাবে কোন সংক্রমণ মোকাবিলা করতে হয়নি। আমরা ছোটবেলায় কলেরা প্রাদুর্ভাব দেখেছি যা আস্তে আস্তে অনেকটাই প্রশমিত হয়েছে। এ রকম অনেক কথাই বলা যেতে পারে, কিন্তু একথাও ভাবতে হবে তাহলে এতদিন আমরা কী করলাম, নব্বইয়ের পর আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নের যে গতি, যদিও অনেকে একে মিথ বলে থাকেন— তাকে কেন স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মতো একটি মৌলিক বিষয়ের ওপর বিনিয়োগ করা যায়নি।

কভিড-১৯ বা করোনা আমাদের রাষ্ট্র ব্যবস্থার মৌলিক কিছু দুর্বলতা যেমন হাজির করেছে, একইসঙ্গে এইসব বিষয় ঠিক করে নেওয়ারও সুযোগ সৃষ্টি করেছে। যার মধ্যে স্বাস্থ্যখাত অন্যতম। বেশ কিছুদিন ধরেই আলোচিত হচ্ছিল আমাদের উন্নয়ন প্রক্রিয়া ন্যায্যতা ভিত্তিক হচ্ছে না। উন্নয়নের সুফল অল্প কিছু মানুষ ভোগ করছে। আর এর অন্যতম প্রমাণ হচ্ছে স্বাস্থ্যখাতের এই বেহাল অবস্থা।

এই অবস্থার পেছনে যে শুধু সরকার দায়ী, সে কথা বলছি না। সামগ্রিক উন্নয়ন মানসিকতার গাঁথুনিতে পরিবর্তন আনতে হবে। স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় আরও বেশি বিনিয়োগ ও এর গুণগত ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনতে হবে। সবকিছুতেই সংখ্যার প্রতি আমাদের ভালোবাসা আছে, সংখ্যা দিয়ে আমরা প্রমাণ করতে চাই কত কী করেছি। গুণগত মান অর্জনের ক্ষেত্রে প্রায় সবক্ষেত্রেই আমাদের অবহেলা রীতিমত নিয়মে পরিণত হয়েছে। গত কয়েক বছরে অর্থনীতির আকার বড় হলেও স্বাস্থ্যখাতে বিনিয়োগ এখন পর্যন্ত জিডিপির এক শতাংশে পর্যন্ত পৌঁছায়নি। তাই স্বাস্থ্যখাতে বিনিয়োগ যেমন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো দরকার, একইসঙ্গে গুণগত মান অর্জন, জবাবদিহি অর্থাৎ সুশাসন নিশ্চিত করা অবশ্যই দরকার। তা না হলে সুফল কখনোই সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাবে না। আমরা দেখতেই থাকবো কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ হলেও বিভিন্ন মেডিকেল কলেজে বা হাসপাতালে জীবনরক্ষাকারী সরঞ্জামসমূহ প্যাকেটে থাকতে থাকতেই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে বা অবকাঠামো ও জনসম্পদকে সঠিকভাবে কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

স্বাস্থ্যখাতের পাশাপাশি আরেকটি বিষয়ের ওপর আমাদের গুরুত্বারোপ করা দরকার, আর তা হলো বহুমুখী জাতীয় তথ্য ভাণ্ডার তৈরি করা। এর বিশেষ প্রয়োজনীয়তা হিসেবে দেখা দিয়েছে। আমার ধারণা সক্ষমতা থাকলেও কর্তা ব্যক্তিদের অনেকেই এটি করতে চান না। এই না চাওয়ার পেছনে হয়তো অনেকগুলো কারণ থাকতে পারে— যার কিছুটা যৌক্তিক কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ব্যক্তিগত স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট।

আমরা দেখছি বিশ্বের বিভিন্ন দেশ করোনা আক্রান্তের পরে কত মানুষ আয়-উপার্জন হারিয়েছে তার সপ্তাহিক পরিসংখ্যান উপস্থাপন করছে। ভারতে একটি মন্ত্রণালয় আছে জাতীয় পরিসংখ্যান ও কর্মসূচি বাস্তবায়ন নামে। কিন্তু আমাদের দেশে কেউ সুনির্দিষ্টভাবে বলতে পারছে না কোথায় কতজন কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, কত মানুষ দুস্থ ও অসহায় অবস্থায় আছে।

করোনাকালে সরকার বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি গ্রহণ ও জোরদার করছে। বিভিন্ন সূত্র মতে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে— এ পর্যন্ত সাত কোটি মানুষের কাছে খাদ্য সাহায্য পৌঁছানো হয়েছে। অনেক বেসরকারি সংগঠন, প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি পর্যায়ে বিভিন্ন স্থানে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে এবং সম্প্রতি সরকার ৫০ লাখ পরিবারের কাছে আর্থিক সহযোগিতা সহযোগিতা পৌছে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে। অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের জন্য প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা বরাদ্দের কথা বলছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এসব উদ্যোগ কতটুকু সফলভাবে জনগণের কাছে পৌঁছাচ্ছে বা পৌঁছবে।

পত্রিকার মারফত বিভিন্ন স্থানে ত্রাণ বিতরণের ক্ষেত্রে অনিয়মের কথা শুনতে পাচ্ছি। প্রায় ৫০ জনপ্রতিনিধিকে সাময়িক বরখাস্তের কথা শুনছি এবং অনেক ডিলারের ডিলারশিপ বাতিলের কথা শুনেছি। সাময়িক ব্যবস্থা হিসেবে হলেও এই পদক্ষেপ ত্রাণ কার্যক্রমে আগের তুলনায় কিছুটা স্বচ্ছতা আনবে। কিন্তু সামগ্রিক ব্যবস্থাপনার গোড়াতে হাত না দেওয়া গেলে সামাজিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার কর্মসূচিতে পুরোপরি স্বচ্ছতা কখনোই নিশ্চিত করা যাবে না।

তথ্য-প্রযুক্তি ক্ষেত্রে আমাদের দেশের অনেক অগ্রগতি হয়েছে। সত্য যে, কিছু কিছু ক্ষেত্রে তথ্য-প্রযুক্তির সেবা একেবারে গ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। যদিও ডিজিটাল প্রযুক্তিতে প্রান্তিক-দরিদ্র জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ ও প্রবেশাধিকার নিয়ে এখনও অনেক কিছু করার আছে এবং বাস্তবমুখী আরও উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। তারপরও যতটুকু অগ্রগতি সাধিত হয়েছে তার আলোকে সমগ্র জনগোষ্ঠীর একটি তথ্য ভাণ্ডার তৈরি করতে হবে যাতে জনগণ তথ্য ভাণ্ডারকে ব্যবহার করেই সরকারি সেবা ও উদ্যোগের সুবিধা দাবী করতে পারে ও ভোগ করতে পারে। এই সামগ্রিক অথচ মৌলিক ব্যবস্থাপনাটুকু ঠিক করা না গেলে উন্নয়নের গোলাক ধাঁধার উত্তর কখনোই পাওয়া যাবে না।

উন্নয়নের অগ্রযাত্রাকে মজবুত করার জন্য কখনো কখনো একটু পেছনে ফিরে তাকাতে হয়। করোনা আমাদের সেই সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে যদি এক পা পেছনে ফিরে উন্নয়নের মৌলিক ভিত্তিসমূহকে ঠিক করে নিতে পারি তার সুফল পাবে দেশের মানুষ, দেশ ও রাষ্ট্র, বিশেষ করে যারা প্রান্তিক, দরিদ্র ও অবহেলিত।   

লেখক: একটি উন্নয়ন সংস্থায় কর্মরত।