মদিনার মসজিদে নববীর এক কোনায় 'দাক্কাতুল আগাওয়াত' বা 'আল সুফ্ফা' নামের এবাদতের জায়গাটির উপর একটা আর্টিকেল পড়ার পর, জায়গাটির ছবি দেখিয়ে আমার সিরীয় কলিগের সাথে আলাপ করছিলাম বাড়তি তথ্য পাওয়ার আশায়। রাসুল (সাঃ) এর অবিবাহিত সাথী মুহাজির যারা মক্কা থেকে হিজরত করে মদিনায় এসেছিলেন, যাদের মদিনায় বাড়ি বা আত্মীয় ছিল না, তারাই শুরুতে মসজিদে নববীর এক কোনায় খেজুর শাখায় নির্মিত ছাউনিতে থাকতেন। তাদের বলা হতো 'আসহাবে সুফফা'। সেখানে কোরআন ও সুন্নাহর শিক্ষা দিতেন রাসুল (সাঃ)। তারা খেজুর খেতেন আর মদিনার ধনী সাহাবিরাও খাবার দিতেন। ওখানে বিখ্যাত সাহাবি আবু হুরায়রা (রাঃ)-ও থাকতেন। তখন সেখানে ৩০০-৪০০ সাহাবি থাকতেন। উমাইয়া খলিফা আল-ওয়ালীদ ইবনে আবদুল মালিকের আমলে মসজিদে নববী সমপ্রসারণের সময় আল-সুফফাহর অবস্থান পরিবর্তন করা হয়। এখন জায়গাটি দাক্কাতুল আগাওয়াত নামে পরিচিত ও স্থানটি চিহ্নিত।
কলিগের সাথে কথা বলতে বলতে প্রসঙ্গত আলাপ চলে গেল সৌদি রাজতন্ত্রের দিকে। কলিগও বললেন, সৌদ কর্তৃক বর্তমান সৌদি আরব প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল আমেরিকা ও ব্রিটেনের সহায়তায়। সেই থেকে আব্দুল ওয়াহাব নজদির অনুসারি সৌদ ডাইনেস্টি টিকে আছে আমেরিকার নিরাপত্তা ব্যবস্থার মাধ্যমে। রাজতন্ত্র ইসলামে নাই, এ কথাও বললেন। আলাপ শেষ করে ফেইসবুকে ঢুকতেই দেখি, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম মুসলমানের কবি না হিন্দুর কবি, এ নিয়ে কথাবার্তা চলছে। কেউ কেউ বলছিলেন, নজরুল কোনো ধর্মে ছিলেন না। প্রমাণ দেখাচ্ছেন কবির লেখা ছোট প্রবন্ধ 'আমার ধর্ম'।
প্রশ্ন হলো, এ ছোট প্রবন্ধ কি টোটাল নজরুলকে প্রকাশ করে? এ প্রবন্ধটির একটা পার্টিকুলারিজম আছে। মানে, বিশেষ পরিপ্রেক্ষিতে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ওটা। পরাধীন জাতি, বাকরুদ্ধ জাতি, মরণাপন্ন জাতি, যে-জাতির মাঝে হিন্দু মুসলিম বৌদ্ধ খৃষ্টান আছে। তারা সবাই মিলে অভিন্ন জাতি। এদের বাঁচার তাগিদ সবকিছুর ঊর্ধ্বে। সেই পরিপ্রেক্ষিতেই জাতিকে তেজদীপ্ত করতে লিখেছেন— "অসহায় জাতি মরিছে ডুবিয়া জানে না সন্তরণ,/কান্ডারি! আজ দেখিব তোমার মাতৃ মুক্তিপণ।/হিন্দু না ওরা মুসলিম ওই জিজ্ঞাসে কোন্ জন?" (কান্ডারি হুঁশিয়ার)
সেই সময়ে উপমহাদেশের দুই ধর্মের মানুষ বড় সমস্যার দিকে মনোযোগ না দিয়ে অযথা পরস্পরের প্রতি বিদ্বেষ লালন করতো, মারামারি করতো। কাজী নজরুল ইসলাম সেই পরিপ্রেক্ষিতে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছিলেন 'আমার ধর্ম' প্রবন্ধে। সেই সময়খণ্ডের যারা ধর্ম নিয়ে ফ্যাসাদ করতো, খুনোখুনি করতো উপমহাদেশে, তারা ছিল তখনের পরাশক্তির ষড়যন্ত্রের শিকার। নজরুল তাদেরকে ক্রীড়নক না হওয়ার কথা বলতেন। বলতেন পরাধীনতার শৃংখলমুক্ত হওয়ার জন্যে সবাই ঐক্যবদ্ধ হওয়ার কথা। ধর্ম তো ভাষার মাধ্যমে পালন করতে হয়। ভাষা মানে কথা। তখন কথা কওয়া যেতো না মন ভরে। নির্যাতিত বঞ্চিত জাতিকে উদ্ধার করা জরুরি ছিল। সেই জরুরতের কথা বলতে গিয়ে 'আমার ধর্ম' শীর্ষক লেখা লিখেছিলেন। পরিস্থিতির শিকার হয়ে মানুষ ওই যে রাগে বলে— "আমরা কুত্তা বিলাইয়ের জিবন কাটাইতেছি।" এ তো রাগের প্রকাশ, আসলে তো কুত্তা বিলাই না। সাদ্দামকে হঠানোর পর, যুদ্ধবিধ্বস্ত ইরাকের তাঁবুগুলোতে মানবেতর জীবন যাপন করতে থাকা মানুষগুলো বলতো— "আমরা মোটেই মানুষ না, আমাদের দ্বীন-ধর্ম বাছ-বিচার কিছু নাই, হায়ওয়ানের জীবন এখন আমাদের।" গাদাগাদি শুয়ে থাকতো আশ্রয় শিবিরে অন্ধকারে। কে মা কে বোন খবর নাই। এই এরাই বছর দুই পরে স্বাভাবিক জীবনে আসলেন। তখন তাদের দ্বীন দিশা ঠিক। এখন তাদের ওই সময়খণ্ডের জীবন ও কথা তুলে ঢালাওভাবে বলা কি ঠিক হবে যে তাদের জীবনে ধর্ম নাই?
কাজী নজরুল ইসলামের জীবন নানাবিধ অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে গেছে। এই যাওয়াই তার নিয়তি বলা কি যায় না? তিনি শ্যামাসংগীত ভজন লিখেছেন। মন্দিরে গেছেন। মুর্শিদাবাদের বরদাচরণ মজুমদারকে গুরু মেনেছিলেন, কালীর প্রতিমা স্থাপন করে পূজাও করেছেন। রামকৃষ্ণ পরমহংস দেব মসজিদে বন্দেগি করেছিলেন। এসব হলো অনুসন্ধিৎসু মনের নানা ঘটনা প্রবাহের ভেতর দিয়ে যাওয়া। কোনো টুকরো ঘটনা বা কথা বা লেখাতে সমগ্র থাকে না।
চুরুলিয়ার দুখু মিয়া কাজী নজরুল ইসলাম নেহায়েত গরিব মানুষ কাজী ফকির আহমেদের ছেলে ছিলেন। এই দুখু মিয়ার সারাটা জীবন গভীরতর দুঃখভরা ছিল। এ দুখু মিয়া শতাব্দীর শীর্ষে উন্নত শিরে দাঁড়িয়ে থাকা বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম হওয়া সত্ত্বেও দুঃখ ভারাক্রান্ত জীবন যাপন করে গেছেন। ১৯৪২ থেকে ১৯৭৬ পর্যন্ত ৩৪ বছর নির্বাক অসুস্থ ছিলেন। এই নজরুল মসজিদের মুয়াজ্জিন ছিলেন, মক্তবের শিক্ষক ছিলেন, রুটির দোকানের সহকারী ছিলেন, রেলওয়ে গার্ডের ভৃত্য ছিলেন, দারোগার বাড়ির কাজের লোক ছিলেন। যাত্রা দল 'লেটোর দল' এর পালা লেখক গায়ক নর্তক ছিলেন। এ দুখু মিয়া বিশ্বযুদ্ধে গিয়েছিলেন। কিন্তু যুদ্ধ করেন নি। রিজার্ভ সৈন্য আকারে ছিলেন শিবিরে। শিবিরে সৈন্যদের নিয়মিত চর্চা-টর্চাতে মনোযোগ নাই। গান গাইতেন, লিখতেন। কবিতা গল্পও লিখতেন। সেনাশিবিরে বসেই লিখেন— 'শাতিল আরব' 'খেয়া পারের তরণী' 'মহররম' 'কোরবানি' ইত্যাদি।
কাজী নজরুল ইসলাম গোঁড়া হিন্দু গোঁড়া মুসলমানের সমালোচনা করতেন। গোঁড়া কারা? যারা ধর্মের ইনার স্পিরিট বোঝেন না। যাদের কাছে ধর্মের সারাৎসার নাই। কেবল অল্প উপরি-উপরি জ্ঞান নিয়ে হাঙ্গামা করে, বিদ্বেষ ছড়ায়। নজরুল সেইসব মোল্লাদের সমালোচনা করতেন যারা ইকবালের 'শিকওয়া' পড়ে ইকবালকে কাফের বলতেন। তাদের মেধাতে কুলায় না শিকওয়ার জবাব লেখা। ইকবালই পরে 'জওয়াব এ শিকওয়া' লিখেন, তখন ঐ মোল্লারা ইকবালকে খেতাব দেন আল্লামা। নজরুলকেও ওরা কাফের বলছিলেন। তাছাড়া যেসব নামাজি নামাজ পড়ে পাঁচ ওয়াক্ত, কিন্তু তাদের আমল আখলাক ভাল না, সততা নাই। মিথ্যা বলে, ফিৎনা লাগায়, মুনাফালোভী, সব ধরনের অন্যায় করে, অন্তর পরিচ্ছন্ন হয় না তাদের নামাজে, কাম ক্রোধ লোভ মোহে ডুবে থাকে, সেইসব নামাজির সমালোচনা করতেন নজরুল।
তিনি বিস্তর পড়াশোনা করতেন। তৎকালীন বিশ্বের সাহিত্যের ব্যাপারেও আপডেট ছিলেন। উর্দু ফারসিতে ইসলামের অন্তর্নিহিত বার্তা বুঝেছেন। কোরানের আটত্রিশটি সুরার অনুবাদ করে 'কাব্য আমপারা' প্রকাশ করেন। বইটি আলেমদের উদ্দেশে নিবেদন করে নিজেকে জানান 'খাদেমুল ইসলাম'।
তিনি লিখেছেন—
"দুনিয়াদারীর শেষে আমার নামাজ রোজার বদলাতে/চাই না বেহেশত খোদার কাছে নিত্য মোনাজাত ক'রে/খোদার প্রেমে শরাব পিয়ে বেহুঁশ হয়ে রই পড়ে.."
পারস্যের বিশাল ইলমে তাছাউফ বা ইসলামের আধ্যাত্মিক জ্ঞান সম্ভার পড়ে নজরুল বুঝেছিলেন— "আসলে এ সমুদয়ের মাঝে সবচেয়ে বড় হল আল্লাহর সন্তুষ্টি। (সুরা তাওবা, আয়াত ৭২) বুঝেছিলেন "And do not insult those whom they call upon besides Allah. Quran 6:108। মানে, তোমরা তাদেরকে মন্দ বলো না, যাদের তারা আরাধনা করে আল্লাহকে ছেড়ে। নজরুল বুঝেছিলেন, ইসলাম শান্তির ধর্ম, অন্তর পরিশুদ্ধ করবার ধর্ম। ইসলাম হিংসা বিদ্বেষমুক্ত হওয়ার পাঠ দেয়। তাই অছিয়ত করেছিলেন— "মসজিদেরই পাশে আমার কবর দিও ভাই"। তার প্রার্থনা কবুল হয়েছিল বলেই মসজিদের পাশেই তার কবর হয়। খেয়াল করার বিষয়, কেবল মসজিদের বলেন নি, বলেছেন 'মসজিদেরই'। ই প্রত্যয় যুক্ত করে বলার মানে কি? এমফাসিস দিয়ে বুঝিয়েছেন এই আমার ধর্মের এবাদতগাহ।
তার লেখা 'আমার ধর্ম' মিনি প্রবন্ধটির পার্টিকুলারিজম বিবেচনায় না নিয়ে ঢালাওভাবে নজরুল কোনো ধর্মে ছিলেন না বলা অন্যায্য, খণ্ডিত বিবেচনা হয়; মিথ্যারোপ হয় বাংলা সাহিত্য সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করে যাওয়া এ অসাধারণ মানুষটির ওপর।
প্রসঙ্গত এটাও উল্লেখযোগ্য যে, কাজী নজরুল ইসলাম হিন্দু মুসলিম ঐক্য গড়বার সুনির্দিষ্ট কারণও ছিল। এই কারণটাই ছিল পরাধীনতার শৃংখলমুক্ত হওয়ার প্রচেষ্টা। জগতে সবকিছুর পার্টিকুলারিটি আছে। এটা থাকার কারণেই মিলনের, ভালোবাসার, মায়ার কারণ সামনে আসে। এটাই পার্টিকুলারিজম। তোমার গুণে তুমি গুণী, আমার গুণে আমি গুণী, এসো আমরা মিলেমিশে ভালোবাসায় উদ্বুদ্ধ হই, সমস্যার সমাধান করি।
নজরুল বললেন, “আমি হিন্দু-মুসলমানের মিলনে পরিপূর্ণ বিশ্বাসী। তাই তাদের কুসংস্কারে আঘাত হানার জন্যই মুসলমানি শব্দ ব্যবহার করি, বা হিন্দু দেব-দেবীর নাম নিই। অবশ্য এর জন্য অনেক জায়গায় আমার সৌন্দর্যের হানি হয়েছে। তবু আমি জেনে শুনেই তা করেছি।” [শব্দ-ধানুকী নজরুল ইসলাম, শাহাবুদ্দিন আহমদ, পৃষ্ঠা ২৩৬,২৩৭]
এই মিলন প্রচেষ্টার পরিপ্রেক্ষিত না বুঝলে নজরুলকে কেউ সাম্প্রদায়িক বলতেই পারে।
দেখা গেল, ১৯২৯ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ ই ডিসেম্বর কলকাতা এ্যালবার্ট হলে বাংলার হিন্দু-মুসলমানের পক্ষ থেকে কবি কাজী নজরুল ইসলামকে বিপুল সমারোহ ও আন্তরিকতাসহকারে সংবর্ধনা দেয়া হয়। সেখানে তিনি বলেন, “কেউ বলেন, আমার বাণী যবন, কেউ বলেন, কাফের। আমি বলি ও দুটোর কিছুই নয়। আমি শুধুমাত্র হিন্দু-মুসলমানকে এক জায়গায় ধরে এনে হ্যান্ডশেক করাবার চেষ্টা করেছি, গালাগালিকে গলাগলিতে পরিণত করার চেষ্টা করেছি। [নজরুল রচনাবলী – ৮, পৃষ্ঠা ৩, ৫]
তার এই প্রচেষ্টা মূলত কালচারাল নয়, রাজনৈতিক অবস্থার ভয়ংকর পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে। তার এই প্রচেষ্টার ভেতর এটা নাই যে, এই দুই সম্প্রদায়ের আলাদা পরিচয়কে উৎখাত করতে চেয়েছেন, কিংবা এটাও না যে তিনি নিজেকে ধর্মের বাইরে রেখেছেন। এই বিভ্রান্তি আসতে পারে বলেই নজরুল নিজেই জবাব দিয়েছিলেন তার ‘আমার লীগ কংগ্রেস’ প্রবন্ধের ৬১ পৃষ্ঠায়—
“আমার আল্লাহ নিত্য-পূর্ণ-পরম-অভেদ, নিত্য পরম-প্রেমময়, নিত্য সর্ব দ্বন্দ্বাতীত। ‘ইসলাম’ ধর্ম এসেছে পৃথিবীতে পূর্ণ শান্তি সাম্য প্রতিষ্ঠা করতে – কোরান মজিদে এই মাহাবাণীই উত্থিত হয়েছে। ···এক আল্লাহ ছাড়া আমার কেউ প্রভু নাই। তার আদেশ পালন করাই আমার একমাত্র মানবধর্ম। আল্লাহ লা-শরিক, একমেবাদ্বিতীয়ম। আল্লাহ আমার প্রভু, রসূলের আমি উম্মত, আল-কোরআন আমার পথ-প্রদর্শক। আমার কবিতা যাঁরা পড়ছেন, তারাই সাক্ষী: আমি মুসলিমকে সংঘবদ্ধ করার জন্য তাদের জড়ত্ব, আলস্য, কর্মবিমূখতা, ক্লৈব্য, অবিশ্বাস দূর করার জন্য আজীবন চেষ্টা করেছি।”
লেখক: সারওয়ার চৌধুরী, কবি, অনুবাদক ও কলামিস্ট।