করোনার ভ্যাকসিন : হানৌজ দিল্লি দূর অস্ত!

বিশ্বের এক নম্বর পরাশক্তি আমেরিকা করোনাভাইরাসের ওষুধ পেতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। কোনো ওষুধের মধ্যে ন্যূনতম সম্ভাবনা দেখা দিলেই ঝাঁপিয়ে পড়ছে সেটা কুক্ষিগত করতে। গিলেড সায়েন্সেস-এর তৈরি রেমডিসিভির-এর পরীক্ষামূলক ধাপে থাকা অবস্থাতেই আমেরিকা একে অত্যন্ত কার্যকর বলে দাবি করে। যদিও সেটা পরবর্তী ধাপে গিয়ে কার্যকর বলে প্রমাণ হয়নি। এখন তারা ব্রিটিশ আস্ট্রাজেনেকা কোম্পানির সম্ভাব্য এক করোনা ভ্যাকসিন ‘এজেডডি-১২২’ পেতেও দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছে। পরীক্ষামূলক পর্যায়ে থাকা এই ভ্যাকসিনের প্রথম দফার ১০০ কোটি ডোজের প্রায় এক- তৃতীয়াংশ পেতে কোম্পানিটিকে ১২০ কোটি ডলার দেওয়ার চুক্তিও করে ফেলেছে। করোনার ওষুধ কবে মিলবে, আদৌ মিলবে কি না, সে প্রশ্নের জবাব কেউ দিতে পারছে না। যদিও পত্রপত্রিকায় নিত্যনতুন ওষুধ তৈরির খবর দিয়ে যাচ্ছে। 

ভাইরাসের ওষুধ তৈরি সহজ নয়। এর পদ্ধতিগত অনেক জটিলতা আছে। নতুন ওষুধ বানানো ও বাজারে আনা মানে একটা মহাযজ্ঞ। মেধা, সময় আর প্রচুর অর্থের দরকার হয়। সাফল্য থেকে ব্যর্থতাই ঢের বেশি। গত পাঁচ দশকের ভ্যাকসিন তৈরির উদ্যোগগুলো যদি আমরা খেয়াল করি, তাহলে হতাশাব্যঞ্জক চিত্রই দেখতে পাই। জিকা ভাইরাস প্রথম শনাক্ত হয় ১৯৪৭ সালে। ৭৩ বছর গড়িয়ে গেলেও গবেষকরা এখনো কোনো ভ্যাকসিন তৈরি করতে পারেননি। চিকেনপক্স প্রথম শনাক্ত হয় ১৯৫৩ সালে। এর ভ্যাকসিন উদ্ভাবন হয় ৪২ বছর গবেষণার পর, ১৯৯৫ সালে। হেপাটাইটিস-বি ভাইরাস প্রথম শনাক্ত হয় ১৯৬৫ সালে। ভ্যাকসিন তৈরি হয় ১৯৮১ সালে। সময় লাগে ১৬ বছর। ইবোলা ভাইরাস প্রথম শনাক্ত হয় ১৯৭৬ সালে। ৪৩ বছর পর ২০১৯ সালে ভ্যাকসিন তৈরি হয়। এইচআইভি (এইডস) প্রথম শনাক্ত হয় ১৯৮১ সালে। ৩৯ বছর ধরে গবেষণা চললেও এখনো ফলাফল শূন্য। সার্স ভাইরাস প্রথম শনাক্ত হয় ২০০৩ সালে। ১৭ বছর পর ভ্যাকসিন তৈরি হলেও তা বাতিল করা হয়েছে। মার্স ভাইরাস প্রথম শনাক্ত হয় ২০১২ সালে। এরপর ৮ বছর গড়িয়েছে, কিন্তু এখনো গবেষণার ফল শূন্য। কভিড-১৯ প্রথম শনাক্ত হয়েছে ২০১৯-এর ডিসেম্বরে। পৃথিবী সৃষ্টির পর থেকে আজ পর্যন্ত যত ভাইরাস আক্রমণ করেছে তার মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর এই কভিড-১৯ বা করোনাভাইরাস। এর ভ্যাকসিন কবে মিলবে তা সহজেই অনুমেয়!

একটা ওষুধ বাজারে আনতে সময় লাগে প্রায় ১০ বছর; যদি কিনা আমরা ওষুধের আবিষ্কার থেকে প্রাণীদেহে, মানুষে পরীক্ষার সময়টা হিসাবে ধরি। এর পেছনে ব্যয় হয় ৮০ থেকে ১০০ কোটি ডলার। মানুষের শরীরে ১০০টি ওষুধের পরীক্ষা হলে মাত্র গড়ে ১৩টি ব্যবহারযোগ্য ওষুধ হিসেবে অনুমোদন পায়। ১০০ কোটি ডলার ব্যয় করার পর ওষুধ কোম্পানিগুলো মাত্র পাঁচ বছর হাতে পায় এই অর্থ তুলে মুনাফা করার।

তা ছাড়া মানবদেহে পরীক্ষার মাঝপথে এসে তা বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনাও প্রায়ই ঘটে। কারণ, হয় ওষুধের কার্যকারিতা নিয়ে যে ধারণা করা হয়েছিল সেটির দেখা মেলে না, নতুবা অতিমাত্রায় পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যায়। উল্লেখ্য, ২০০৯-১০ সালে সোয়াইন ফ্লুর সময় প্রায় ষাট লাখ মানুষকে গ্লাক্সোস্মিথক্লেইনের পানডেমরিক্স ভ্যাকসিন দেওয়া হয়েছে। পরে এমন কিছু সমস্যার জন্য বিপুল পরিমাণ ভ্যাকসিন বাজার থেকে উঠিয়ে নেওয়া হয়েছিল। কারণ ভ্যাকসিনটি নেওয়ার পর একজন মানুষ দিনে অনেক বার ঘুমিয়ে পড়ত অর্থাৎ সিøপিং ডিজঅর্ডার সমস্যায় আক্রান্ত হতো।

মানুষের শরীরে পরীক্ষার আগে অধিকাংশ ক্ষেত্রে এক বা একাধিক প্রাণীর শরীরে ওষুধটি পরীক্ষা করা হয়। উদ্দেশ্য হলো ওষুধের কার্যকর মাত্রা বা ডোজ ঠিক করা। পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা। তারপর প্রথম পর্যায়ের পরীক্ষা মানবশরীরে। ২০ থেকে ১০০ জন রোগহীন মানুষের শরীরে পরীক্ষা করা হয়। উদ্দেশ্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া পুনরায় দেখা এবং নতুন এই ওষুধ সর্বোচ্চ কী পরিমাণে মানবশরীর নিতে পারে তা দেখা। দেখতে হয়, ওষুধের প্রতিক্রিয়া কতটা সময় থাকে মানবশরীরে। ফলাফল আশাব্যঞ্জক হলে পরীক্ষার পরবর্তী ধাপ শুরু হয়। এরপর পরীক্ষা করা হয় রোগীদের শরীরে। রোগভেদে রোগীর সংখ্যা ৫০ থেকে ১০০। সংখ্যা এর বেশিও হতে পারে। রোগ নিরাময়ক্ষমতা দেখা হয় এই ধাপে, সেই সঙ্গে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া।

শেষ ধাপ বা ফেইজ-থ্রি। এখানে রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় হাজারে। একাধিক দেশে চালানো হয় এই পরীক্ষা। ফলাফল আশানুরূপ হলে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে নতুন ওষুধ বাজারজাত করার আবেদন করা হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই আবেদন প্রথম করা হয় আমেরিকায়। তারপর ইউরোপ, জাপান, চীন ও অস্ট্রেলিয়ায়। আবেদন করা হলেই যে অনুমোদন দেওয়া হবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।

অনুমোদন পেতে জমা দিতে হয় হাজার হাজার পাতার গবেষণা প্রতিবেদন। শতকোটি ডলার খরচ করার পর ওষুধের দাম নিয়ে বিভিন্ন দেশের সরকারের সঙ্গে বোঝাপড়া করতে হয়। অধিকাংশ ওষুধের খরচ ওঠানো আর মুনাফার জন্য আমেরিকা, ইউরোপ, জাপান আর চীনের বাজারকে দেখা হয়। পাঁচ বছর পর অধিকাংশ ওষুধ যেকোনো কোম্পানি কপি করতে পারে। জেনেরিক নামে পরিচিত এই ওষুধগুলো দামে আসল ওষুধের চেয়ে অনেক কম হয়।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফডিএ) ওষুধ বাজারজাতকরণের অনুমতি দিয়ে থাকে। তবে শুধু ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা নয়, প্রাণীর ওপর পরীক্ষা, সীমিতসংখ্যক ‘স্বেচ্ছাপ্রণোদিত’ রোগীর ওপর প্রয়োগ এবং সবশেষে ‘পোস্ট মার্কেটিং সার্ভিল্যান্সের’ স্তর পেরিয়ে এই সংস্থা নতুন ওষুধ বাজারজাত করার অনুমতি দেয়। এই প্রক্রিয়ায় নতুন ওষুধ বাজারজাত করতে কয়েক বছর সময় লেগে যায়। সেই ধারাবাহিকতায় করোনার যথাযথ ওষুধ আবিষ্কার এবং বাজারে আসতে যে দীর্ঘ সময় লেগে যাবে, এটি দিব্যি বোঝা যাচ্ছে।

সংক্রমণজনিত রোগের ভ্যাকসিন আবিষ্কার খুবই জটিল এক প্রক্রিয়া। অনেক সময় শুধু সংক্রমণের সময় ভ্যাকসিনটি পরীক্ষা করার মতো পর্যাপ্ত রোগী পাওয়া যায় না। ভ্যাকসিন উৎপাদনে আরেকটি চ্যালেঞ্জ হলো একইভাবে সব ভ্যাকসিন উৎপাদন করা। অনেক ক্ষেত্রে অন্য কোম্পানির ওষুধ আগে বাজারে চলে আসার ফলে পরীক্ষা বন্ধ করে দিতে হয়। কারণ, সংশ্লিষ্ট কোম্পানির ওষুধ তৈরির পরীক্ষা সফল হওয়ার নিশ্চয়তা নেই। পরীক্ষা আপাতদৃষ্টে সফল হলেও বাজারে আগে আসা ওষুধের চেয়ে নতুন ওষুধ অধিক কার্যকর না হলে মুনাফার আশা নেই।

উল্লিখিত সমস্যাগুলোকে আমলে নিয়ে ২০১৭ সালে বিভিন্ন দেশ এবং বেসরকারি সংস্থার সমন্বয়ে অসলোভিত্তিক ‘দ্য কোয়ালিশন ফর প্রিপেয়ার্ডনেস ইনোভেশনস’ নামের একটি সংস্থার জন্ম হয়। যুক্তরাজ্য, জার্মানি, নরওয়ে, জাপান, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, ভারতের মতো দেশের সঙ্গে আছে বিল ও মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন; আছে কিছু ওষুধ কোম্পানি। উদ্দেশ্য সংক্রমণজনিত রোগের ভ্যাকসিন তৈরির প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অবশ্য এই উদ্যোগের সঙ্গে নেই।

বিশ্বের নানা দেশের নানা উদ্যোগ কভিড-১৯ নিরাময়ে ২০ হাজার যৌগ আর ১৩৩ রকম চিকিৎসা পদ্ধতি বর্তমানে এফডিএ-এর দরজায় মাথা খুঁড়ছে। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘রেমডিসিভির’ ও ‘ইআইডিডি-২৮০১’। দু’টিরই নিশানা নভেলকরোনার প্রাণভোমরা এনএসপিএ-১২। লাভের পরিবর্তে দুটিরই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় রোগী আরও সংকটাপন্ন হয়ে পড়ছেন। অ্যাজিথ্রোমাইসিন বা ‘এইচসিকিউ’ কোনো আশার আলো জ্বালাতে পারেনি। ভেন্টিলেটরও বহু ক্ষেত্রে ‘এআরডিএস’ বা ‘সারিতে’ প্রাণসংশয়ী হয়ে উঠছে। হঠাৎই হার্ট অ্যাটাক/রেনাল ফেইলিওর/এনসেফেলাইটিসের ধাক্কাকেও কিছুতেই সামলানো যাচ্ছে না। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক ‘চ্যাডক্স১ এনকোভ-১৯’ নামে একটি ভ্যাকসিন তৈরি করে সাড়া ফেলেছিল। প্রাথমিক পরীক্ষায় ব্যাপক সাফল্য পাওয়ায় এই ভ্যাকসিনটি নিয়ে আশাবাদ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সম্প্রতি বানরের দেহে এই ভ্যাকসিনটির পরীক্ষা সফল হয়নি। ফলে এটা নিয়েও সৃষ্টি হয়েছে হতাশা!

কাজেই গণমাধ্যমে বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানির স্বার্থে করোনার ওষুধ তৈরির খবর যতই প্রচার করা হোক, বাস্তবে এর দেখা কবে মিলবে, আদৌ মিলবে কি না, তা বলা কঠিন। আর করোনাভাইরাসের কার্যকর ভ্যাকসিন বা ওষুধ তৈরি হলেই তো শুধু হবে না। এর বাইরে আছে আরও নানা হিসাব-নিকাশ। আছে ব্যবসা বা মুনাফার অংক। অনেকে তো রোগ বিস্তারকে বাজার দখলের কৌশলও মনে করে থাকেন। যদি পর্যাপ্ত পরিমাণ রোগী তৈরি না হয়, রোগ গবেষণার পেছনে যে বিশাল পরিমাণ অর্থ লগ্নি করা হয়েছে, সেটা উঠে আসবে না। সহজ করে বললে, ওষুধ বাণিজ্যের জন্য প্রথমে দরকার রোগের বাজারজাতকরণ, এবং পরে নিরাময়ের ব্যবস্থা। রোগ শুধু রোগ না, বর্তমান নব্য-উদারনৈতিক অর্থনৈতিক বাজারে রোগকে একটি বাজারের পণ্যের মতো করেই বুঝতে হবে। মানবতার জন্য এই সময়ে বড় ওষুধ কোম্পানিগুলো বা হাসপাতালগুলো কাজ করে না, দিন শেষে তারা ‘ব্যবসায়ী’, যে কারণে, বাঁচার জন্য আমরা প্রতিনিয়ত ‘সেবা’ ক্রয় করি!

লেখক
লেখক ও কলামনিস্ট
chiros234@gmail.com