রাজধানীর গুলশানে ইউনাইটেড হাসপাতালে অগ্নিকাণ্ডে করোনা ইউনিটের পাঁচ রোগীর মৃত্যু হয়েছে। গত বুধবার রাত পৌনে ১০টার দিকে গুলশান-২ নম্বরে অবস্থিত
বেসরকারি হাসপাতালটির আঙিনায় করোনাভাইরাসের রোগীদের জন্য অস্থায়ীভাবে নির্মিত আইসোলেশন ইউনিটে আগুন লাগে। ফায়ার সার্ভিস কর্র্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ২০ মিনিটের চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। এ ঘটনায় কেউ আহত হয়নি। হাসপাতালের মূল ভবন অক্ষত আছে ও চিকিৎসা কার্যক্রম চলছে।
এদিকে এ অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত কমিটি করছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিস কর্র্তৃপক্ষ ও পুলিশের গুলশান বিভাগ। এছাড়া গুলশান থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা করেছে হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ। পুলিশের গুলশান বিভাগের উপকমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী বলেন, নিহতদের সবাই হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অধ্যাপক ওমর ফারুকের অধীনে ভর্তি ছিলেন। তাদের মধ্যে তিনজনের করোনা পজিটিভ ও দুজনের নেগেটিভ ছিল। নিহতরা হলেন মোহাম্মদ মাহবুব (৫০), মো. মনির হোসেন (৭৫), ভারনন অ্যান্থনী পল (৭৪), রিয়াজ-উল-আলম (৪৫) ও খোদেজা বেগম (৭০)। তিনি আরও বলেন, বুধবার রাত ৯টা ৪৮ মিনিটে ৯৯৯-এ এক রোগীর স্বজন আগুন লাগার খবর দেন। পরে ভাটারা থানা পুলিশের মাধ্যমে ফায়ার সার্ভিসকে আগুনের সংবাদ দেওয়া হয়। তারা এসে দ্রুত আগুন নেভায়।
পুলিশ জানিয়েছে, মাহবুব, অ্যান্থনী পল ও খোদেজা বেগমকে গত ২৫ মে এবং রিয়াজ-উল-আলমকে ২৭ মে ও মনির হোসেনকে ১৬ মে ইউনাইটেডের আইসোলেশন ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। মাহবুব, মনির ও অ্যান্থনী পল করোনা পজিটিভ ছিলেন।
খোদেজার ছেলে আলমগীর হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, তার মায়ের দুবার করোনা পরীক্ষা করা হয়েছে। দুবারই তার করোনা নেগেটিভ আসে। তাকে সাধারণ কেবিনে দেওয়ার প্রস্তুতি চলছিল। তিনি আরও বলেন, ‘আমি দুপুরে আমার মাকে দেখে যাই। সন্ধ্যায় এসেও তার খোঁজ নিই। পরে আমি গাড়ি নিয়ে হাসপাতালের গ্যারেজে যাই। সেখানে গিয়ে গাড়িতে রেস্ট নিচ্ছিলাম। এর মধ্যে চিৎকার শুনে এসে দেখি সব শেষ।’
ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক (ডিজি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাজ্জাদ হোসাইন বলেন, মূল ভবনের বাইরে করোনা আইসোলেশন ইউনিটে (তাঁবু টানিয়ে স্থাপিত) আগুন মাত্র ২০ মিনিট স্থায়ী হলেও এতে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা গেছেন পাঁচজন। সেখান থেকে মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। ঘটনাস্থলটি হাসপাতালের মেইন ভবন সংলগ্ন। সেটিতে অগ্নিনির্বাপণের ব্যবস্থা পর্যাপ্ত ছিল না। সেখানে কয়েকটি ফায়ার এক্সটিংগুইশার ছাড়া অন্য কোনো সরঞ্জাম ছিল না।
ইউনাইটেড হাসপাতালের চেয়ারম্যান হাসান রাজা বুধবার রাতে বলেন, মাসখানেক আগে করোনা ওয়ার্ডটি চালু করা হয়। আগুনে ডাক্তার বা নার্স কেউ আহত হননি। নিহতদের সবাই লাইফ সাপোর্টে ছিলেন। এসি বিস্ফোরণ বা শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে। হাসপাতালের ওই অংশ তাঁবু দিয়ে তৈরি ছিল। এটা মূল ভবনের বাইরে আলাদা শেডে বসানো হয়।
ফায়ার সার্ভিসের ডিউটি অফিসার কামরুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে জানান, বুধবার রাত ৯টা ৫৫ মিনিটে আগুন লাগার খবর পাওয়ার পর বারিধারা ফায়ার স্টেশনের তিনটি ইউনিট আগুন নেভায়।
হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষের ভাষ্য : গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে ইউনাইটেড হাসপাতালের গেটে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন হাসপাতালের জনসংযোগ কর্মকর্তা ডা. সাগুপ্তা আনোয়ার। তিনি ঘটনাটিকে করোনাকালে চলমান দুর্যোগের মধ্যে আরেকটি ভয়াবহ দুর্ঘটনা উল্লেখ করে বলেন, ‘পাঁচজন রোগীই অক্সিজেনসহ লাইফ সাপোর্টে ছিল। আগুন মুহূর্তের মধ্যেই ছড়িয়ে পড়ায় দুর্ভাগ্যজনকভাবে কাউকে বের করা যায়নি। সেখানে অক্সিজেনের মতো উচ্চমাত্রায় দাহ্য পদার্থ থাকায় দ্রুত আগুন ছড়িয়ে পড়ে। লাইফ সাপোর্টে থাকায় এসব রোগীকে তাৎক্ষণিকভাবে বের করে নেওয়া সম্ভব ছিল না। নিহতদের মধ্যে বৃহস্পতিবার ভোর ৫টার দিকে চারজনের ও দুপুর ১টার দিকে একজনের লাশ স্বজনের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘হাসপাতালে ডায়ালাইসিস, কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপিসহ সব ধরনের চিকিৎসা স্বাভাবিকভাবে চালু আছে। হাসপাতালে এখন ১৪০ জনের মতো রোগী আছে। আমরা তাদের সবার সঙ্গে কথা বলেছি, তাদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলেছি। আমরা স্বজনহারা লোকজনকে অন্তরের অন্তস্তল থেকে সমবেদনা জ্ঞাপন করছি।’
থানায় অপমৃত্যুর মামলা : এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় বুধবার রাতে গুলশান থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা করেছে ইউনাইটেড হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ। গুলশান থানার উপপরিদর্শক (এসআই) সিনথিয়া আক্তার বলেন, রাত সাড়ে ১১টার দিকে ইউনাইটেড হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ মামলাটি করেছে। গতকাল সকালে সিআইডির ফরেনসিক টিম আলামত সংগ্রহ করেছে।
তিন তদন্ত কমিটি : ইউনাইটেডের করোনা আইসোলেশন ইউনিটে আগুনে পাঁচজনের মৃত্যুর ঘটনা তদন্ত করছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স কর্র্তৃপক্ষ ও পুলিশের গুলশান বিভাগ। এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা বলেন, তদন্ত কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে আগুন নেভানোর পর ফায়ার সার্ভিসের ডিজি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ সাজ্জাদ হোসাইন বলেন, অগ্নিকাণ্ডের কারণ নির্ণয়, ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ, অগ্নিকাণ্ড নির্বাপণের সরঞ্জাম ছিল কি না, এসব জানতে একটি তদন্ত কমিটি করেছেন তারা।
ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন্স অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স) লে. কর্নেল জিল্লুর রহমান জানান, অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধান ও ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে আগামী সাত কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক দেবাশীষ বর্ধনকে প্রধান করে গঠিত কমিটির সদস্যরা হলেন ফায়ার সার্ভিস ট্রেনিং স্কুলের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ বাবুল চক্রবর্তী, ঢাকা জোন-৫-এর উপসহকারী পরিচালক নিয়াজ আহমেদ ও সিনিয়ার স্টেশন অফিসার (বারিধারা) মোহাম্মদ আবুল কালাম।
এদিকে পুলিশের গুলশান বিভাগের উপকমিশনার সুদীপ চক্রবর্তী বলেন, অগ্নিকাণ্ডের কারণ জানা, ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের পাশাপাশি কর্র্তৃপক্ষের কোনো গাফিলতি ছিল কি না, তা জানতে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্তে কারও গাফিলতি পাওয়া গেলে কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ফায়ার সার্ভিসের তদন্ত কমিটির ঘটনাস্থল পরিদর্শন : গতকাল দুপুরে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ফায়ার সার্ভিস গঠিত তদন্ত কমিটি। পরে কমিটিপ্রধান ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক দেবাশীষ বর্ধন সাংবাদিকদের বলেন, ‘অস্থায়ীভাবে তৈরি ওই ইউনিটের পার্টিশনগুলো পারটেক্স জাতীয়, যা অতি দাহ্য। আগুন যখন লেগেছে তাৎক্ষণিকভাবে একসঙ্গে পুরোটায় লেগে যায়। এ কারণে একজন রোগীও বের হতে পারেননি। তাছাড়া করোনা রোগীর আশপাশে সাধারণত কেউ থাকেন না। ওখানে ওই পাঁচজন রোগীই চিকিৎসাধীন ছিলেন। তাদের কেউ বের করার চেষ্টা করেছে কি না, জানতে পারিনি।’ অগ্নিকাণ্ডের কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘হয়তো ইলেকট্রিক কোনো কারণে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটতে পারে। আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখছি।’
ঘটনাস্থলে ডিএনসিসি মেয়র আতিক : গতকাল দুপুরে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র আতিকুল ইসলাম ইউনাইটেড হাসপাতালে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। পরে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘চিকিৎসা নিতে হাসপাতালে আসা পাঁচ রোগীর এমন মৃত্যুর ঘটনা দুঃখজনক। এমন মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ দায় এড়াতে পারে না।’ মেয়র আতিক আরও বলেন, ‘আমি খোঁজখবর নিয়েছি। রোগীর স্বজন, হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষের সঙ্গে নিজে কথা বলেছি। পরিদর্শন করলাম। প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে, হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষের গাফিলতি ছিল। হাসপাতালের সম্প্রসারিত এ অংশে ফায়ার ফাইটার, ফায়ার ড্রিল এবং ফায়ার টিম ছিল না। ১১টি অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্রের মধ্যে মাত্র তিনটির মেয়াদ ছিল। অন্য আটটি অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্রের মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে যায়।’
তিনি আরও বলেন, ‘হাইড্রেন্ট কে চালাবে, কে কাজ করবে, কার দায়িত্ব এগুলো সুনির্দিষ্ট করা ছিল না। ফলে তাদের দায় থেকেই যাচ্ছে।’ মেয়র আরও বলেন, ‘ঘটনা তদন্তে ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহ করছে সিআইডির ফরেনসিক টিম। তদন্তে কাজ করছে গুলশান থানা পুলিশ। ফায়ার সার্ভিস থেকে আগুনের কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। সুষ্ঠু তদন্তে সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা প্রদান করা হবে।