স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের পরিচালক পদে পদায়ন নিয়ে টানাহেঁচড়া শুরু হয়েছে। এ পদে প্রশাসন ক্যাডারের একজন অতিরিক্ত সচিবকে প্রেষণে নিয়োগ দেওয়া হলেও তাকে কাজে যোগ দিতে দেওয়া হচ্ছে না। অপরদিকে চিকিৎসকদের সংগঠনগুলো এ পদে সরকারের চিকিৎসক কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেওয়ার দাবি জানিয়েছে। করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের এই সময় কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের পরিচালক পদ নিয়ে টানাটানিকে অশনিসংকেত হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
২২ মে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের (সিএমএসডি) পরিচালক হিসেবে অতিরিক্ত সচিব আবু হেনা মোরশেদ জামানকে প্রেষণে নিয়োগ দেয় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। চলমান করোনা পরিস্থিতিতে বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে পরদিন অর্থাৎ ২৩ মে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে যোগদান করেন এই কর্মকর্তা। কিন্তু আজ পর্যন্ত দায়িত্ব বুঝে নিতে পারেননি। কারণ হিসেবে জানা যায়, বর্তমান পরিচালক দায়িত্ব বুঝিয়ে দিতে কিছুদিন সময় নিয়েছেন।
সিএমএসডির পরিচালক পদে বদলি করার সময় আবু হেনা মোরশেদ জামান বাংলাদেশ জাতীয় ইউনেসকো কমিশনের ডেপুটি সেক্রেটারি পদে কর্মরত ছিলেন। তাকে বদলি করার দিনই বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) ও স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ (স্বাচিপ) এ পদে প্রশাসন ক্যাডারের একজন কর্মকর্তাকে নিয়োগ দেওয়ার বিরোধিতা করে এবং আদেশ প্রতাহারের দাবি জানায়। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর করা এ আবেদন স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিবকেও অনুলিপি দেওয়া হয়েছে।
চিকিৎসকদের দুই সংগঠনের যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে প্রশাসন ক্যাডারের একজন অতিরিক্ত সচিবকে কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের পরিচালক পদে প্রেষণে নিয়োগ করার বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগের। কারণ প্রশাসন ক্যাডারের একজন কর্মকর্তা স্বাস্থ্যব্যবস্থার যাবতীয় চিকিৎসাসামগ্রী ক্রয়ের সঙ্গে কোনোভাবেই সম্পৃক্ত নন। আজ পর্যন্ত ওই পদে চিকিৎসক কর্মকর্তা ছাড়া কাউকে পদায়িত করা হয়নি। দেশের ক্রান্তিলগ্নে প্রশাসন ক্যাডারের একজন কর্মকর্তাকে এ পদে নিয়োগ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এই নিয়োগকে তারা অশনিসংকেতের ইঙ্গিত বলে উল্লেখ করেছেন।
বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছেন বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন ও মহাসচিব ডা. মো. ইহতেশামুল হক চৌধুরী। একই বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছেন স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের সভাপতি ডা. এম ইকবাল আর্সলান ও মহাসচিব ডা. এম এ আজিজ।
আবু হেনা মোরশেদ জামান বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের ১১তম ব্যাচের মেধাতালিকায় প্রথম স্থানে রয়েছেন। চাকরিজীবনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিচালক, ফরিদপুর ও নরসিংদীর জেলা প্রশাসক, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর সচিব পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। রাজধানীর মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের গভর্নিং বডির সভাপতির দায়িত্ব নিয়ে এই কর্মকর্তা প্রতিষ্ঠানটির বেশ কিছু কার্যক্রমে ইতিবাচক পরিবর্তন এনে প্রশংসা কুড়িয়েছেন।
আবু হেনা মোরশেদ জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হিসেবে সরকার আমাকে যে দায়িত্ব দেবে তা পালন করতে আমি প্রস্তুত আছি।’
বিএমএ ও স্বাচিপের মতো বিসিএস হেলথ ক্যাডার অ্যাসোসিয়েশনও এ নিয়োগের বিরোধিতা করছে। সংগঠনটির নেতারা জানিয়েছেন এ পদ কোনোভাবেই প্রশাসন ক্যাডার পেতে পারে না। তাদের ক্যাডার শিডিউলে এ পদ নেই। তারা সুযোগ পেলেই ভিন্ন ক্যাডারের পদ দখল করে। একবার একটি পদে বসতে পারলে, সেই পদ আর ছাড়ে না। তা ছাড়া কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের পরিচালক পদটি টেকনিক্যাল পদ। চিকিৎসাব্যবস্থা সম্পর্কে ধারণা না থাকলে এ পদে যোগ দিয়ে কাজ করা সম্ভব নয় বলে তারা মনে করছেন। বিসিএস হেলথ ক্যাডার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ডা. সেলিম রেজা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কোনো পদে পদায়ন করার সময় সংশ্লিষ্ট বিধিবিধান অনুসরণ করা উচিত। প্রতিটি ক্যাডারের নির্দিষ্ট শিডিউল আছে। সেখানে বলা আছে কোন পদ কোন ক্যাডারের। সেই বিধি অনুসরণ করে পদায়ন করা উচিত।’
তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হেলথ ক্যাডার শিডিউলে সাপ্লাই অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পদ থাকলেও কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের পরিচালক বলে কোনো পদ নেই। এই পদের পদায়ন নিয়ে বিধিগত কিছু জটিলতা রয়েছে। সেই সুযোগটিই কাজে লাগাতে চাচ্ছে প্রশাসন ক্যাডার। কিন্তু বৈশি^ক করোনাভাইরাস বাংলাদেশেও ছড়িয়ে পড়লে কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের গুরুত্ব বেড়ে যায়। এই ঔষধাগার থেকেই সব সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাসামগ্রী সরবরাহ করা হয়। এসব চিকিৎসাসামগ্রীর প্রায় পুরোটাই বেসরকারি চিকিৎসাসামগ্রী প্রস্তুতকারকদের কাছ থেকে কেনা হয়। এমনি এক চিকিৎসাসামগ্রী এন৯৫ মাস্ক নিয়ে সম্প্রতি হইচই পড়ে যায়। সব দিক মিলিয়ে সরকার এ পদে পরিবর্তন আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় আদেশ জারি করেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।