সর্দি, জ্বর, কাশি ও শ্বাসকষ্টে গত বুধবার ও গতকাল বৃহস্পতিবার দেশের বিভিন্ন স্থানে আটজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ডে এক পুলিশ কনস্টেবল; নাটোরের নলডাঙ্গায় ঢাকাফেরত পোশাককর্মী; মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে এক বৃদ্ধ; সিরাজগঞ্জে মুক্তিযোদ্ধা ও জুটমিলশ্রমিক; ফরিদপুরে এক যুবক; শরীয়তপুর সদর উপজেলায় আরেক ব্যক্তি এবং গাজীপুরের কালীগঞ্জে এক বৃদ্ধার মৃত্যু হয়েছে। দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী সর্দি, কাশি, জ্বর ও শ্বাসকষ্টে এ নিয়ে ২০২ জন মারা গেছেন।
বরিশাল : বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ডে জ¦র, কাশি ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে সোহেল মাহমুদ (৩৫) নামে এক পুলিশ সদস্যের মৃত্যু হয়েছে। গত বুধবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে তার মৃত্যু হয়। তিনি বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রেনিং অ্যান্ড ওয়েলফেয়ারে কনস্টেবল পদে কর্মরত ছিলেন। তার বাড়ি পটুয়াখালীর দুমকি উপজেলার পাংগাশিয়া গ্রামে। হাসপাতালের পরিচালক ডা. বাকির হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, বুধবার রাত ৯টার দিকে সোহেলকে হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। দ্রুত ট্রায়া সেন্টারে পরীক্ষার পর করোনা ওয়ার্ডে ভর্তি করে তাকে ভেন্টিলেশনে পাঠানো হয়। মৃত্যুর পর তার নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে।
গাজীপুর : সর্দি, কাশি, জ্বর ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে গাজীপুরের কালীগঞ্জে সাহিদা বেগম (৭০) নামে এক বৃদ্ধার মৃত্যু হয়েছে। গত বুধবার রাত ১টার দিকে কালীগঞ্জ পৌর এলাকার বড়নগর গ্রামের নিজ বাড়িতে তার মৃত্যু হয়। সাহিদার নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে বলে জানান উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ ছাদেকুর রহমান আকন্দ।
কমলগঞ্জ (মৌলভীবাজার) : কমলগঞ্জ উপজেলার উজিরপুর গ্রামের কৃষক বাবুল মিয়া (৬০) শ্বাসকষ্ট নিয়ে মারা যান। বুধবার রাত ৯টায় নিজ বাড়িতে মারা যাওয়ার পর তার নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে বলে জানান উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মাহবুবুল আলম ভূঁইয়া।
সিরাজগঞ্জ : কাজিপুর উপজেলার বয়ড়াবাড়ি গ্রামের আবুল কালাম আজাদ (৬০) জ¦র, কাশি, সর্দি ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে বৃহস্পতিবার ভোরে মারা যান। তিনি চট্টগ্রামের আমিন জুটমিলের শ্রমিক ছিলেন। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোমেনা পারভীন পারুল বলেন, আজাদের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। এদিকে সদর উপজেলার পৌর এলাকার মাছুমপুর মহল্লার বাসিন্দা মুক্তিযোদ্ধা মোয়াজ্জেম হোসেন (৬৯) বৃহস্পতিবার ভোরে নিজ বাড়িতে মারা গেছেন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে হৃদরোগে ভুগছিলেন। দুদিন ধরে তার জ¦র ও শ^াসকষ্ট শুরু হয়। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. জাহিদুল ইসলাম হীরা বলেন, মুক্তিযোদ্ধা মোয়াজ্জেম হোসেনের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে।
নাটোর : নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলায় জ¦র, সর্দি, কাশি ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে সাদ্দাম হোসেন (৪৪) নামে ঢাকাফেরত এক পোশাকশ্রমিক মারা গেছেন। তিনি উপজেলার খাজুরা লাহিড়ীপাড়া এলাকার আবদুর রহমানের ছেলে। স্থানীয়রা জানান, ঈদের দুদিন আগে সাদ্দাম বাড়িতে আসেন। আগেই তিনি অসুস্থ ছিলেন। বুধবার থেকে সর্দি, কাশি, জ্বর ও শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়। বৃহস্পতিবার সকালে অবস্থার অবনতি হলে নাটোর সদর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথে সাদ্দাম মারা যান।
ফরিদপুর : বুধবার বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে ফরিদপুর শহরের আলীপুরের আলাউদ্দিন খাঁ সড়কের নিজ বাড়িতে রায়হান ফকির (৩২) নামে এক যুবক মারা যান। তিনি এলপি গ্যাসের ব্যবসা করতেন। ফরিদপুরের সিভিল সার্জন ডা. মো. সিদ্দিকুর রহমান জানান, কয়েক দিন ধরে রায়হান জ¦র, গলাব্যথা ও পাতলা পায়খানাজনিত সমস্যায় ভুগছিলেন। তার নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে।
শরীয়তপুর : বৃহস্পতিবার সকালে জ্বর, শ্বাসকষ্ট ও গলাব্যথা নিয়ে নড়িয়া উপজেলার সুরেশ^র এলাকার এক ব্যক্তি (৫৫) মারা গেছেন। তার নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মুনীর আহমেদ খান জানান, হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডে ওই ব্যক্তি মারা যান।৮
শ্রমিকদের আন্দোলন, সরকারের নির্দেশনার পরও অনেক পোশাক কারখানা শ্রমিকদের গত এপ্রিলের বেতন পরিশোধ করেনি। ঈদ বোনাস দেয়নি কয়েকশো কারখানা। তবে ঈদের ছুটির পর ফের অনেক কারখানা খুলতে শুরু করেছে। যেসব কারখানায় তেমন কাজ নেই সেগুলো খুলতে দেরি করছে। এদিকে বেতন-বোনাস না পেয়ে শ্রমিকদের মধ্যে ক্ষোভ-উত্তেজনা বিরাজ করছে।
দেশে মোট পোশাক কারখানার সংখ্যা ৩ হাজার ১০৭টি। এর মধ্যে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সদস্যভুক্ত ২ হাজার ২৭৪টি কারখানার মধ্যে বর্তমানে চালু আছে ১ হাজার ৮৭৮টি। এর মধ্যে এপ্রিলের বেতন বকেয়া আছে ৪৮টির। ঈদ বোনাস বকেয়া রয়েছে ৪২৯টি কারখানার। আর বাংলাদেশ নিটওয়্যার পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সদস্যভুক্ত ৮৩৩টি কারখানার মধ্যে কতটির বেতন-বোনাস বকেয়া আছে তার সঠিক হিসাব জানা যায়নি। তবে এর সংখ্যা শতাধিক হবে বলে একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে। এসব কারখানার শ্রমিকদের বেতন-বোনাসের দাবিতে ঈদের ছুটির দিন পর্যন্ত আন্দোলন করেও কোনো লাভ হয়নি।
বাংলাদেশ শ্রম আইন অনুযায়ী শ্রমিকের মাসিক বেতন পরবর্তী মাসের প্রথম ৭ কর্মদিবসের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে। আর যেসব শ্রমিক কারখানায় এক বছর ধরে কাজ করছেন সেসব শ্রমিক সর্বোচ্চ মূল বেতনের সমান দুটি উৎসব ভাতা পাবেন। করোনাভাইরাসের কারণে এপ্রিলজুড়ে কারখানা বন্ধ থাকায় মালিক-শ্রমিকের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে কারখানাগুলোকে এপ্রিলে বন্ধ থাকা দিনগুলোর জন্য ৬৫ শতাংশ ও বাকি দিনগুলোর জন্য শতভাগ বেতন দেওয়ার নির্দেশনা দেয় শ্রম মন্ত্রণালয়। এছাড়া গত বছর কারখানাগুলো যে হারে ঈদ বোনাস দিয়েছে সেই হারেই
পৃষ্ঠা ১১ কলাম ৩ >
এখনো বকেয়া শ্রমিকদের বেতন-বোনাস ঈদ বোনাস দিতে নির্দেশ দেয়। তবে বোনাসের অর্ধেক ঈদের আগে এবং বাকিটা ঈদের পরে সর্বোচ্চ ৬ মাসের মধ্যে পরিশোধের নির্দেশ দেয়। যদিও শুরু থেকেই এ বছর ঈদ বোনাস দেওয়ার বিপক্ষে ছিলেন মালিকরা।
এদিকে সরকারের নির্দেশনা ও টানা আন্দোলনের পরেও ঈদ বোনাস ও বেতন না পাওয়ায় ক্ষুব্ধ শ্রমিকরা। ঈদ বোনাস না পাওয়া গাজীপুরের এক পোশাকশ্রমিক বলেন, ‘প্রতি বছর যে পরিমাণ বোনাস দিত এবার তার অর্ধেক দেওয়ার কথা। মালিক আশা দিয়েও ছুটির আগের দিন জানিয়ে দিয়েছে ঈদের পর ছাড়া বোনাস দিতে পারবে না। কেউ আন্দোলন করলে তাকে চাকরি থেকে বের করে দেওয়া হবে।’ বেতন তো এখন তার নিজের টাকা দিয়ে দিতে হয়নি। তাহলে বোনাস দেবে না কেন? প্রশ্ন রাখেন ওই শ্রমিক।
এ বিষয়ে বিজিএমইএর জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ফয়সাল সামাদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কারখানাগুলোর সক্ষমতা ছিল না। এজন্য তারা ঈদ বোনাস দিতে পারেনি। এখন তো ঈদ চলেই গেছে।’ বেতন বকেয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘কোন কোন কারখানার বেতন বকেয়া তা আমি নিশ্চিত না। তাই এ বিষয়ে আমি মন্তব্য করতে রাজি না।’
তবে বিজিএমইএর এক শীর্ষ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘যেসব কারখানা বেতন দিতে পারেনি এরা সরকারের ঋণ সহায়তা পায়নি। আবার ব্যাংকও তাদের ঋণ দেয়নি। ক্রেতারা অর্ডার বাতিল করেছে। এজন্য তারা বেতন দিতে পারেনি। আর প্রতি বছরই কিছু না কিছু কারখানায় একটু সমস্যা হয়। আমরা বিষয়টি দেখছি। যত দ্রুত সম্ভব সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করব।’ তিনি আরও বলেন, ‘যেসব শ্রমিক বাড়িতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন আমরা কিন্তু তাদের বেতন দিচ্ছি। আর বোনাসের জন্য আমাদের সরকার কোনো সহায়তা দেয়নি। কাজ বন্ধ থাকার পরও নিজেদের অর্থে বোনাস দিতে হচ্ছে। তাই যাদের সক্ষমতা কম তারা দিতে পারেনি।’
খুলতে শুরু করেছে পোশাক কারখানা : ঈদের ছুটির পর ফের খুলতে শুরু করেছে পোশাক কারখানা। করোনাভাইরাসের বিস্তার রোধে শ্রমিকদের বাড়ি যাওয়া ঠেকাতে এ বছর ঈদের ছুটি তিন দিন করে বেশিরভাগ পোশাক কারখানা। গত ২৭ মে থেকেই কারখানাগুলো খুলতে শুরু করেছে। তবে অনেক কারখানা শ্রমিকের অনুরোধে ৪ ও ৫ দিন পর্যন্ত ঈদের ছুটি ঘোষণা করে। বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ সূত্র জানায়, বেশিরভাগ পোশাক কারখানা গতকাল বৃহস্পতিবারই খুলেছে। তবে যেসব কারখানা এখনো খোলেনি সেগুলো আগামীকাল শনিবার খুলবে।