আম্পানে সুন্দরবনের ক্ষতি সোয়া ২ কোটি টাকা

সুপার সাইক্লোন আম্পানের তাণ্ডবে সুন্দরবনের ১২ হাজার ৩৫৮টি গাছ ভেঙে গেছে। জেটি, উডেন ট্রেইল, ওয়াচ টাওয়ারসহ বিভিন্ন স্থাপনা ও অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে, টাকার অঙ্কে যা প্রায় সোয়া দুই কোটি। এর আগে গত বছরের ১০ নভেম্বর ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের আঘাতে সুন্দরবনের ৪ হাজার ৫৮৯টি গাছ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ওই সময় বন বিভাগের অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ছিল ৬২ লাখ ৮৫ হাজার টাকা। গত রবিবার খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষকের কাছে জমা দেওয়া বন বিভাগের চারটি কমিটির প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। তবে এতে বন্যপ্রাণী হতাহতের কোনো খবর পাওয়া যায়নি।

প্রতিবেদনে বলা হয়, আম্পানের আঘাতে পশ্চিম সুন্দরবনের দুটি রেঞ্জ এলাকায় মোট ১২ হাজার ৩৩২টি গাছ ভেঙে গেছে, যার মূল্য প্রায় ১০ লাখ ১০ হাজার ৫৬০ টাকা। ক্ষতিগ্রস্ত গাছের মধ্যে গরানই বেশি। এসব এলাকায় জেটি, উডেন ট্রেইল, ওয়াচ টাওয়ারসহ বিভিন্ন স্থাপনা ও অবকাঠামোর ক্ষতির পরিমাণ প্রায় সাড়ে ৪৭ লাখ টাকা। তবে এই দুটি রেঞ্জে বাঘ, হরিণসহ অন্য কোনো বন্যপ্রাণীর ক্ষতি হয়নি। অন্যদিকে পূর্ব সুন্দরবনের দুটি রেঞ্জ এলাকায় মোট ২৬টি গাছ ভেঙে গেছে। আগে থেকে জব্দ করা বেশকিছু কাঠ জোয়ারের পানিতে ভেসে গেছে। সব মিলিয়ে আর্থিক ক্ষতি প্রায় ৭ লাখ ৬ হাজার ৮৩০ টাকা। আর পূর্ব বন বিভাগে ১ কোটি ৬০ লাখ টাকার অবকাঠামোগত ক্ষতি হয়েছে।

গত ২০ মে রাতে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে আঘাত হানে ঘূর্ণিঝড় আম্পান। এর মধ্যে সাতক্ষীরায় সবচেয়ে বেশি ১৫৬ কিলোমিটার বেগে আঘাত হানে। পরিবেশবাদী সংগঠন ‘জীবনযাত্রা ও পরিবেশ কর্মজোটের’ (ক্লিন) প্রধান নির্বাহী হাসান মেহেদী জানান, বরাবরের মতো সুন্দরবন প্রায় একাই বুক পেতে দিয়ে আম্পানের তাণ্ডব ঠেকিয়েছে। ফলে বনের গাছপালার ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

এ বিষয়ে সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. বশিরুল আল মামুন বলেন, ‘বর্তমানে সুন্দরবন থেকে সব ধরনের গাছ কাটা নিষিদ্ধ। এজন্য ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত গাছপালা ওভাবেই থাকবে। ধীরে ধীরে ছয় মাসের মধ্যে বন স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে। এখন অবকাঠামো মেরামত করতে হবে।’

খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক (সিএফ) মো. মঈনুদ্দিন খান বলেন, ‘সময় দিলে সিডর, আইলা ও বুলবুলের আঘাতের ক্ষয়ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার মতো করে সুন্দরবন আম্পানের ক্ষয়ক্ষতিও কাটিয়ে উঠবে।’

খুলনায় এলজিইডির ক্ষতি সাড়ে ৭৬ কোটি টাকা : ঘূর্ণিঝড় আম্পানের আঘাতে খুলনা জেলায় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) ১৩৮টি সড়ক, ৭৩টি সেতু ও ১৩১টি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা টাকার অঙ্কে প্রায় সাড়ে ৭৬ কোটি।

খুলনা এলজিইডির সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘জেলার ৯টি উপজেলায় ১৩৮টি সড়কে ৩৯ কোটি ৯০ লাখ, ৭৩টি সেতু ও কালভার্টে ২৫ কোটি ৪০ লাখ এবং ১৩১টি স্কুল, আশ্রয় কেন্দ্র, ইউনিয়ন ও উপজেলা ভবনে ১১ কোটি ২৬ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।’

এলজিইডি খুলনা কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ক্ষতিগ্রস্ত সড়কের  দৈর্ঘ্য ২৭১ দশমিক ৫০ কিলোমিটার, সেতু ও কালভার্টের দৈর্ঘ্য ৬২০ কিলোমিটার। এর মধ্যে দাকোপ উপজেলায় ১০টি সড়কে সাড়ে ৪ কিলোমিটার এলাকায় ৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা, বটিয়াঘাটায় ৮টি সড়কের ৪ কিলোমিটার এলাকায় ৩ কোটি ২০ লাখ টাকা, রূপসায় ২৫টি সড়কের ৪০ কিলোমিটার এলাকায় ৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা, তেরখাদায় ১৫টি সড়কের ৪৫ কিলোমিটার এলাকায় ৪ কোটি টাকা, দিঘলিয়ায় ৮টি সড়কের ১৫ কিলোমিটার এলাকায় ৪ কোটি টাকা, ফুলতলায় ৪টি সড়কের ২ কিলোমিটার এলাকায় ৬০ লাখ টাকা, ডুমুরিয়ায় ১৬টি সড়কের ৬৩ কিলোমিটার এলাকায় ৬ কোটি টাকা, পাইকগাছায় ২৫টি সড়কের ৬০ কিলোমিটার এলাকায় ৫ কোটি টাকা ও কয়রায় ২৭টি সড়কের ৩৮ কিলোমিটার এলাকায় ৯ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। পাশাপাশি দাকোপে ১০টি সেতু ও কালভার্টে দেড় কোটি টাকা, বটিয়াঘাটায় ৫টি সেতু ও কালভার্টে এক কোটি টাকা, রূপসায় ১২টি সেতু ও কালভার্টে দেড় কোটি টাকা, তেরখাদায় ১২টি সেতু ও কালভার্টে ৩ কোটি টাকা, দিঘলিয়ায় ৪টি সেতু ও কালভার্টে ৫০ লাখ টাকা, ফুলতলায় ৮টি সেতু ও কালভার্টে ৫০ লাখ টাকা, ডুমুরিয়ায় ৭টি সেতু ও কালভার্টে ৩ কোটি ৯০ লাখ টাকা, পাইকগাছায় ৫টি সেতু ও কালভার্টে ১ কোটি টাকা ও কয়রায় ১০টি সেতু ও কালভার্টে ১২ কোটি ৫০ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

স্কুল, আশ্রয়কেন্দ্র, ইউনিয়ন ও উপজেলা ভবনের মধ্যে দাকোপে ৮টিতে ৮০ লাখ টাকা, বটিয়াঘাটায় ৮টিতে ৪৫ লাখ টাকা, রূপসায় ১১টিতে ৮২ লাখ টাকা, তেরখাদায় ৪টিতে ৩০ লাখ টাকা, দিঘলিয়ায় ৩টিতে ২০ লাখ টাকা, ফুলতলায় ১৩টিতে ৮০ লাখ টাকা, ডুমুরিয়ায় ৩৪টিতে ৫ কোটি ৫৫ লাখ টাকা, পাইকগাছায় ১২টিতে ৮৪ লাখ টাকা ও কয়রায় ৩৮টিতে দেড় কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। এর মধ্যে কয়রা উপজেলা ২৩ কোটি টাকার সড়ক, সেতু ও কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ডুমুরিয়ায় ১৫ কোটি ৪৫ লাখ টাকার, তেরখাদায় ৭ কোটি ৩০ লাখ টাকার, রূপসায় ৬ কোটি ৮২ লাখ টাকার, দাকোপে ৫ কোটি ৯০ লাখ টাকার, পাইকগাছায় ৬ কোটি ৮৪ লাখ টাকার, দিঘলিয়ায় ৪ কোটি ৭০ লাখ টাকা, বটিয়াঘাটায় ৪ কোটি ৬৫ লাখ টাকার, ফুলতলায় ১ কোটি ৯০ লাখ টাকার সড়ক, সেতু ও কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।