পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সদস্য, জ্যেষ্ঠ সচিব ও একুশে পদকপ্রাপ্ত অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. শামসুল আলম মনে করছেন সাধারণ ছুটি আর না বাড়িয়ে সীমিত আকারে সরকারি-বেসরকারি অফিস খুলে দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্তই সঠিক। কেননা মানুষের জীবন ও জীবিকা দুটোই গুরুত্বপূর্ণ। তবে এ ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিধি যথাযথভাবে নিশ্চিত করতে হবে। এ অর্থনীতিবিদ মনে করেন, করোনায় দেশের স্বাস্থ্য খাতের দুর্বলতাগুলো স্পষ্ট হয়েছে। আগামী দিনের উন্নয়নচিন্তায় তাই স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও গণপরিবহন খাত তিনটিকে অন্যতম অগ্রাধিকার দিতে হবে। কভিড-১৯-পরবর্তী সময়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্বাভাবিক করা, মানুষকে কাজে ফেরানো ও আগামী বাজেটের পরিকল্পনায় অগ্রাধিকার খাত নির্ধারণ এবং আসন্ন চ্যালেঞ্জগুলো উত্তরণের কৌশল নিয়ে দেশ রূপান্তরের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেছেন ড. শামসুল আলম।সাক্ষাৎকার নিয়েছেন দেশ রূপান্তরের স্টাফ রিপোর্টার মামুন আব্দুল্লাহ
দেশ রূপান্তর : দেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ছে। এক দিনেই শনাক্তের সংখ্যা ২ হাজার ছাড়িয়েছে। সব মিলিয়ে করোনায় মোট আক্রান্ত শনাক্ত হয়েছেন ৪০ হাজারের বেশি। এ অবস্থায় সীমিত আকারে সবকিছু খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত কতটুকু সঠিক?
শামসুল আলম : মনে রাখতে হবে, জীবন ও জীবিকা অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। সব কর্মকান্ড বন্ধ রেখে লকডাউন অবস্থা ধরে রাখতে পারছে না অনেক উন্নত দেশ। সেখানে বাংলাদেশ পারবে কী করে? মানুষকে করোনাভাইরাস থেকে যেমন বাঁচাতে হবে তেমনি খাদ্যসংকট, আয়সংকট থেকে উদ্ধারে ব্যবস্থা নিতে হবে। এজন্য আগামীতে সাধারণ ছুটি আর না বাড়িয়ে সীমিত আকারে খুলে দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ সঠিক। কেননা একটাকে বাদ দিয়ে আরেকটাকে বাঁচানো যায় না। মানুষের জীবন বাঁচাতে হলে জীবিকাও দরকার আর জীবিকা না হলে জীবনও বাঁচবে না। লম্বা সময় ধরে লকডাউন বা কারফিউ চললে শুধু করোনায় নয়, ক্ষুধায় বহু লোক মরে যাবে। তবে লকডাউন শিথিলের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিধি যথাযথ নিশ্চিত করতে হবে। সবাইকে বিধি মেনে চলতে হবে, এর বিকল্প নেই।
দেশ রূপান্তর : তাহলে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়া ঠেকানো যাবে কীভাবে?
ড. শামসুল আলম : করোনাভাইরাস ঠেকাতে যত ধরনের সহযোগিতা সেটা সরকারকে দিতে হবে এবং দিচ্ছেও। জীবন রক্ষাকারী উপকরণ সরবরাহ ও প্রশিক্ষণ এবং হাসপাতাল ব্যবস্থাপনাকে আরও উন্নত কীভাবে করা যায় সেগুলোতে মনোযোগ দিতেই হবে। একটি জীবন হলেও তা বাঁচানোর সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা সরকারকে নিতে হবে।
দেশ রূপান্তর : জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞসহ অনেকেই এখনো লকডাউনের পক্ষে। এ ক্ষেত্রে তারা নানা যুক্তি দিচ্ছেন।
ড. শামসুল আলম : পূর্ণ লকডাউনের পক্ষে দেশের ধনিকশ্রেণি। তারাই লকডাউনের কথা বলে যাদের পর্যাপ্ত সঞ্চয় আছে, পেনশনের টাকা আছে কিংবা কাজ না করলেও লম্বা সময় চলতে পারবে তারা। তবে আমি লকডাউনকে অবমূল্যায়ন করছি না। সেটি হতে হবে স্থানভেদে। যেখানেই সংক্রমণ দেখা দেবে, সেখানটা আটকে ফেলা। একেবারে সারা দেশ লকডাউন দিয়ে বসে থাকার মতো আর্থসামাজিক অবস্থা বাংলাদেশের নেই বলে আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি। তবে আবারও বলছি, জীবন রক্ষায় লকডাউনকে অবমূল্যায়ন নয়, সংক্রমণ রোধে প্রচুর টেস্ট ও ট্রেসিং দরকার, আইসোলেশন দরকার, চিকিৎসা দরকার। যেখানে যেখানে সংক্রমণ হবে, সেখানেই স্থানিক লকডাউন কার্যকর করতে হবে কঠোরভাবে। তবে তা সারা দেশের জন্য প্রযোজ্য হতে পারে না।
দেশ রূপান্তর : স্থানভেদে বা আংশিক লকডাউন করে বাংলাদেশ কি কোনো সুফল পেয়েছে?
শামসুল আলম : আজকে আমরা পূর্ণ লকডাউন দিয়ে কৃষিতে যদি তা কার্যকর করতাম কী অবস্থা হতো একবার ভেবে দেখুন তো। এত ফসল আমরা কি কাটতে পারতাম, ২২ লাখ টন ধান সংগ্রহ করতে পারতাম। এই যে ঢাকা শহরেও কোনো পণ্যেও যে অভাব হয়নি, এর কারণ কী। কারণ সরবরাহ সিস্টেমটা স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হয়েছিল এবং এ সিদ্ধান্তই ছিল সঠিক। যদি কড়া লকডাউন দিয়ে দেওয়া হতো, ঢাকা শহরের কী উপায় হতো। এজন্য ধনিকশ্রেণির কথা শুনলেই শুধু হবে না, যারা কর্ম হারিয়েছে, যারা বস্তিবাসী, দরিদ্র তারা কী চায় সেটাও বিবেচনায় নিতে হবে। যদি আমাদের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি বিশ্বাস ও শ্রদ্ধা থাকে, তাহলে সবার মতামতকে এ জাতীয় সংকটেও মূল্য দিতে হবে।
দেশ রূপান্তর : বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক কর্মকান্ড অস্বাভাবিক, এ অবস্থায় দেশের কর্মহীনদের কর্মসংস্থান হবে কীভাবে?
শামসুল আলম : ঢাকায় শুধু রিকশা চালু যদি থাকে তাহলে এক কোটি লোকের আয়ের ব্যবস্থা হয়ে যায়। এটা সোজা বিষয় নয়, এক কোটি লোকের জীবন চলার মতো আয়ের ব্যবস্থা করা। এজন্য কোনো কিছুই হেলাফেলা করা যাবে না।
দেশ রূপান্তর : অনেকে ইউরোপ-আমেরিকার মতো গণসংক্রমণের আশঙ্কার কথা বলছেন...
শামসুল আলম : গণসংক্রমণের নজির এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কী হয়েছে। সেখানে তো লাখ লাখ লোকের জনসমাগম হয়েছিল, দুবার করে লাখ লাখ শ্রমিক কীভাবে ঢাকায় এলো কীভাবে গেল, এবারের ঈদেও লাখ লাখ মানুষ ঢাকা ছেড়েছে। সাড়ে তিন লাখ কৃষিশ্রমিক স্থানান্তরিত হয়েছে। কোথাও কি গণসংক্রমণের খবর পাওয়া গেছে? তবে এসব আমি ছোট করে দেখছি না। কিন্তু যেভাবে আমরা সংক্রমণ নিয়ে ভয়ে ছিলাম, সেরকম হয়নি। আমার ধারণা বাংলাদেশের মানুষের ইমিউনিটি (রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা) অনেক বেশি। সেটা উন্নত দেশের মানুষের চাইতেও। এটা প্রমাণিত বলা যায়। আমি অনেক ঘটনার কথা বললাম এর বাইরে ঢাকার লাখ লাখ বস্তিবাসী জড়াজড়ি করে বাস করছে। আমরা গণহারে সংক্রমিত হতে দেখিনি। এজন্য আমরা শঙ্কিত, ঠিক আছে, কিন্তু যেভাবে একটি শ্রেণি ভীত হয়ে ‘হায় হায় সব গেল’ বলে প্রচার করছে, সেটা মনে হয় ঠিক নয়।
দেশ রূপান্তর : কেন ঠিক নয়?
শামসুল আলম : ঢাকা শহরে বস্তিতে থাকে লাখ লাখ মানুষ। ঘিঞ্জি পরিবেশ, একটা টয়লেট ২০-২৫ জন শেয়ার করে। কিন্তু কোনো বস্তিতে আল্লাহর রহমতে গণসংক্রমণের খবর আসেনি। এজন্য বলতে চাই, এর মূল কারণ হলো পাশ্চাত্যের মানুষদের তুলনায় আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি, এটা আল্লাহর বিশেষ রহমত অবশ্যই। পাশ্চাত্যে সরকারের সিদ্ধান্তের প্রতি মানুষ যেভাবে সহযোগিতা করছে, আমাদের দেশে সেভাবে করেনি। তারপরও আমরা যতটুকু সম্ভব সতর্ক থেকে ব্যবস্থা নিয়েছি। গত তিন মাসে প্রমাণিত হয়েছে, আমাদের ইমিউনিটি অনেক ভালো। সংকটের এটা ইতিবাচক দিক অবশ্যই।
দেশ রূপান্তর : করোনার এ দুর্যোগের সময় সরকারের সার্বিক কর্মকান্ডকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
শামসুল আলম : এবার করোনার দুর্যোগে দেশের প্রশাসন তথা আমলাতন্ত্র যথেষ্ট সক্রিয়তার পরিচয় দিয়েছে। যেটা অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা ব্যাপক শ্রম দিয়েছে, মানুষের জন্য কাজ করেছে। অন্যদিকে বহু অর্থনীতিবিদ ও থিংক ট্যাংকের পরামর্শের অনেক আগেই সরকার অনেকগুলো পদক্ষেপ নিয়ে ফেলেছে। শুধু ঘোষণাই দেয়নি, তার যথাযথ বাস্তবায়ন করেছে। কোটি মানুষকে খাদ্য ও নগদ সহায়তা প্রদান, ব্যবসা-বাণিজ্য স্বাভাবিক করতে প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা সবই হয়েছে ত্বরিতগতিতে। এজন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গতিশীল নেতৃত্ব ও প্রশাসন তথা আমলাতন্ত্রের আন্তরিক প্রচেষ্টা বড় ভূমিকা রেখেছে। এতে সরকারের প্রতি মানুষ আস্থা ও বিশ্বাস বেড়েছে। মানুষ আশান্বিত হয়েছে যে, সরকার তাদের পাশে আছে।
দেশ রূপান্তর : দেশব্যাপী মহামারীর এ দুর্যোগে মানুষের চিকিৎসা তথা স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ভঙ্গুরতার বিষয়টি কীভাবে দেখছেন...
শামসুল আলম : এটা স্পষ্ট হয়েছে যে, একটি দুর্বল স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে আমরা যাচ্ছিলাম। যেখানে বেসরকারি খাত একটি ভালো বিকশিত অবস্থায় ছিল বলে বলা হচ্ছিল। কিন্তু এ করোনায় তাদের তেমন সহযোগিতা পাওয়া যায়নি। তারা যেহেতু সরকারের অতটা নিয়ন্ত্রণে ছিল না, ফলে কোনো প্রকার চাপও দেওয়া যায়নি। তবে এখন সময় এসেছে, স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে পুনর্বিন্যাস করে ঢেলে সাজানোর। করোনার এ অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে নিশ্চয়ই সরকার এ উদ্যোগ নেবে। এ উদ্যোগ সফল করতে বেসরকারি খাতকে সঙ্গে নিতে হবে, কারণ এত বড় জনগোষ্ঠীর চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা সরকারের একার পক্ষে দুরূহ ব্যাপার। বেসরকারি স্বাস্থ্য খাতেরও এজন্য সরকারকে সহযোগিতা করা উচিত, কারণ গত দু-তিন দশকে তারা বেশ ভালো আয় করেছে।
দেশ রূপান্তর : এখন বাজেট প্রসঙ্গে আসি। আসন্ন বাজেটে কোন বিষয়গুলোকে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে?
শামসুল আলম : করোনার এক অস্বাভাবিক অবস্থার মধ্যে এবার বাজেট ঘোষণা করতে হচ্ছে। এবারের বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন, শিক্ষার মান ও পরিবহন ব্যবস্থার বিষয়টি অধিক গুরুত্ব দেওয়া হবে। একই সঙ্গে সামাজিক সুরক্ষা ও কৃষি খাতের গুরুত্ব বেশি থাকবে। রাজস্ব আয় কম হওয়ার আশঙ্কাকে মাথায় রেখে বৈদেশিক সাহায্যের সর্বোচ্চ ব্যবহার, সরকারি বিলাসী ব্যয় কিছুটা সংকোচন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পায় এমন প্রকল্প নেওয়া হবে।
দেশ রূপান্তর : আগামীর পরিকল্পনা প্রণয়নে সরকার করোনার সময়ে সামনে আসা অভিজ্ঞতা ও ইস্যুগুলোতে কতটুকু গুরুত্ব দেবে বলে মনে করেন?
শামসুল আলম : এখন দেশের অর্থনীতি একটি দুর্যোগপূর্ণ সময় অতিক্রম করছে। সব ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকান্ড বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের বহু মানুষ বেকার হয়ে পড়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক খাতেও ছুটি চলছে। জরুরি সেবাদান ছাড়া অন্যসব প্রতিষ্ঠান বন্ধ। এর প্রভাব অর্থনীতিতে পড়ছে। শুধু বাংলাদেশ নয়, সারা পৃথিবীর অর্থনীতিই ক্ষতির মুখে। এ অবস্থায় তিন মাসের তথ্য-উপাত্ত হাতে নিয়ে আগামী অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হবে। আগামী জুন নাগাদ এর খসড়া চূড়ান্ত করার চিন্তা রয়েছে। ইতিমধ্যে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলোর কাছ থেকে প্রস্তাব পাওয়া গেছে। এখন অর্থনীতিবিদ ও স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে করোনার বিষয়গুলো পরিকল্পনায় যুক্ত করা হবে।